মা ইলিশ রক্ষায় চলা অভয়াশ্রম কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকারে নামছে অনেক জেলে। শুধু যে নিজেরা নামছে তাই নয়, জেল-জরিমানার আওতায় না থাকায় সঙ্গে করে মাঝ নদীতে নিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের। এতে ঝুঁকিতে পড়ছে ইলিশ শিকারে যাওয়া শিশুরা। বিশেষ করে জীবন সংশয়ে পড়ছে সাঁতার না জানা শিশুরা।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোন অবস্থাতেই নদীতে নামা ঠিক নয় জেলেদের। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপদে রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান তাদের।
গত ৭ অক্টোবর থেকে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনায় চলছে ২২ দিনব্যাপাী মা ইলিশ রক্ষায় অভয়াশ্রম কর্মসূচি। এই সময়ে মা ইলিশকে ডিম ছাড়তে দেওয়ার জন্য বিস্তৃর্ণ নদীতে দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিদিনই নদী থেকে অসাধু জেলেদের আটক করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এসব জেলেরা নিচ্ছেন এক ভয়ংকর কৌঁশল। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা জেল-জরিমানার আওতায় না থাকায় তাদেরকে মাছ শিকারে পাঠানো হচ্ছে। সাঁতার না জানা এসব শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে ছোট ছোট নৌকায় চড়ে মাঝ নদীতে ইলিশ শিকারে নামছে অনেক জেলে। এতে করে যে কোন সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
সম্প্রতি চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর এলাকার জেলে ইসমাইল গাজী তার ৮ বছরের শিশু আরিফ হোসেনকে নিয়ে মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করতে নেমে নৌ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পরে তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দিয়ে আদালতে প্রেরণ করে পুলিশ। আর শিশু হওয়ায় তার ছেলে আরিফকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেয়।
শিশু আরিফ বলেন, আমি আব্বার লগে ইলিশ মাছ দরতে গাঙ্গ যাই। পরে পুলিশ আমগো দইরা থানায় লইয়া আহে। সাঁতার জানা নেই জানিয়ে আরিফ বলেন, গাঙ্গ বান-তুফানে নৌকা ডুইব্বা গেলে আব্বায় আমারে বাঁচাইতো।
আরিফের বাবা জেলে ইসমাইল গাজী বলেন, এই বছরই আমি গাঙ নামছিলাম মাছ ধরতে। অন্য কান কাজ না থাহনে পেডের দায়ে আমার ছোট্ট শিশুরে লইয়্যা গাঙ যাই। তয় এই কাজ করা আমার ঠিক অয়নাই।
একই এলাকার আরেক শিশু রুবেল হোসেন বলেন, আমি আমার দাদার সঙ্গে মাছ ধরতে জাউল্যাগ লগে গাঙ্গ যাই। পরে পুলিশে বেক্তেরে দইরা লইয়্যা আগে। গাঙ্গ যেই ঢেউ, নৌকা ডুইব্যা যাওনের ডর লাগদে আছিল।
নাম প্রকাশে বেশ কয়েকজন জেলে বলেন, ইলিশ ধরতে গিয়া ধরা পড়লে জেলেদেরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। নয়তো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়। তবে শিশুদের কোন শাস্তি দেওয়া হয় না। তাই তারা শিশুদেরকে ইলিশ শিকারে পাঠায়। তবে এই কাজটি শিশুদের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ বলে স্বীকার করেন তারা।
চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজরাজেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাসুদ পারভেজ রনি বলেন, শিশুদের তো দূরে থাক, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে কোন জেলেরই নদীতে মাছ শিকারে নামা ঠিক নয়। এভাবে শিশুদের মাছ শিকারে নদীতে নিয়ে গেলে যেকোন সময় ঝড়-বৃষ্টি বা অন্যকোন উপায়ে নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটে জীবনহানীর ঘটনা ঘটতে পারে। শিশুদের জীবনের ঝুঁকিরোধ করতে সকলকে আরও সচেতন হতে হবে।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন নদীতে অভিযানে নেমে কিছু অসাধু জেলেদের পাশাপাশি ছোট ছোট শিশুদেরও মাছ ধরতে দেখতে পাই। সাধারণত শিশুদের সাজার বাইরে রাখা হয় বলে জেলেরা কৌশলে শিশুদেরকে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত করছে। এতে করে শিশুদের জীবনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামীতে শিশু আইনে এসব শিশুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, কোন অবস্থাতেই যেন অভয়াশ্রমের সময়ে জেলেরা নদীতে না নামে সেজন্য প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের যেন কোন অবস্থাতেই নদীতে নামানো না হয় সে ব্যাপারে জেলেদের সচেতন করা হয়েছে। তারপরেও কিছু অভিভাবক শিশুদের নদীতে পাঠিয়ে তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। এটি কোন ভাবেই কাম্য নয়।
