মহারথীদের মহড়ায় উত্তেজনা

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১০:০৮ পিএম

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যখন পুরো বিশ্ব নজিরবিহীন সংকটে, বিশ্ববাসী এখন চরম ভোগান্তিতে, যুদ্ধ যখন কেউ চায় না; ঠিক তখনই সামরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। দুই মহাশক্তিধর দেশ ও পশ্চিমা জোট নিজ নিজ সামরিক তৎপরতাকে ‘নিয়মিত কর্মসূচি’ বললেও বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির উত্তেজনায় বাড়তি মাত্রা যোগ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ গড়িয়েছে নবম মাসে, যুদ্ধে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করতে পারে পশ্চিমের এই শঙ্কার মাঝেই রাশিয়ার কৌশলগত বিশেষ বাহিনী গত বুধবার পরমাণু অস্ত্রের মহড়া চালিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি ডুবোজাহাজ থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেরও পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ করেছে।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর একটি কন্ট্রোল রুম থেকে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন এ মহড়া পর্যবেক্ষণ করেন। এক বিবৃতিতে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুতিনের নেতৃত্বে স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। মহড়ায় রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপ থেকে এবং আর্কটিকের বারেন্টস সাগরে পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এ প্রশিক্ষণে টিইউ-৯৫ পারমাণবিক বোমারু বিমানও ছিল বলে জানা গেছে।

রাশিয়া যখন পারমাণবিক মহড়া চালাচ্ছে তখন বসে নেই যুক্তরাষ্ট্র। বুধবারই যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় নাসার উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে এক ডজন হাইপারসনিক মিসাইলের পরীক্ষা চালায় দেশটির সেনা ও নৌবাহিনী। পেন্টাগন জানায়, শব্দের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি ছিল অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রগুলোর গতি। ঘণ্টায় ৬ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় একেকটি ক্ষেপণাস্ত্র। 

এদিকে, ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অব্যাহত রয়েছে ন্যাটোর বার্ষিক মহড়া স্টিডফাস্ট নুন। ফোর্থ ও ফিফথ জেনারেশন ফাইটার জেটের পাশাপাশি সক্ষমতা ঝালাই করে নিচ্ছে ৬০টির বেশি যুদ্ধবিমান। রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বি-ফিফটি টু বোমারু বিমানও। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে ন্যাটোর এ পেশিশক্তি প্রদর্শন নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। যদিও তা অস্বীকার করেছেন জোটটির মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ।  

যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সাম্প্রতিক তৎপরতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দাবি, ‘নিজ সক্ষমতা খতিয়ে দেখতেই এসব কার্যক্রম।’ পাশাপাশি মিত্র ইউক্রেন এবং ন্যাটোবহরে সহযোগিতা বৃদ্ধিও অন্যতম লক্ষ্য। বাইডেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মিত্র দেশগুলো ইউক্রেনের পাশেই আছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যেন দেশটি শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, সেটাই লক্ষ্য। ক্রমবর্ধমান হুমকির মধ্যে ন্যাটোকে শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ রাখা আমাদের কর্তব্য। শক্তিমত্তা যাচাইয়ের জন্যই চলছে সামরিক জোটের মহড়া। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় বাড়ানো হচ্ছে পরিসর। এর মাধ্যমে গড়ে তোলা হবে উন্মুক্ত, সমৃদ্ধ ও সুরক্ষিত বিশ্ব।

কেবল রুশ-পশ্চিমা পাল্টাপাল্টি সামরিক প্রতিযোগিতা নয়, কোরীয় উপদ্বীপেও উত্তেজনা চরমে। সেদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সাম্প্রতিক তৎপরতায় পাল্টা জবাব দিচ্ছে কিম জং উনের উত্তর কোরিয়া। বর্তমানে কোরীয় উপদ্বীপে বিগত ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে অস্থির সময় যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সিউল প্রতিনিধি জিন ম্যাকেনজির লেখায় উঠে এসেছে নতুন করে কোরীয় উত্তেজনার এই চিত্র।

উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক তৎপরতার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে ম্যাকেনজি জানিয়েছেন, গত মাসে উত্তর কোরিয়া জাপানের ওপর দিয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল; যা সেখানকার বাসিন্দাদের বেশ আতঙ্কে ফেলেছিল। এরপর দেশটি আরও কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি যুদ্ধবিমান উড়িয়েছে এবং সমুদ্রে শত শত কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছে। এসব গোলা ২০১৮ সালে দুই কোরিয়ার শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তৈরি করা ‘সামরিক নিরাপদ অঞ্চলে’ পতিত হয়। কোরীয় দ্বীপের এই দুই দেশ কৌশলগত দিক থেকে আসলে ‘যুদ্ধে লিপ্ত’ রয়েছে।

সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি যেসব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এবং সামরিক মহড়া চালানো হয়েছে, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানের যৌথ সামরিক মহড়ার প্রতিক্রিয়া মাত্র। কোরীয় দ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য শত্রুদের দায়ী করে উত্তর কোরিয়া বলছে তাদের উৎক্ষেপণের পরিষ্কার সতর্কবার্তা হচ্ছে, শত্রুদের থামতে হবে। দেশটির দাবি, শত্রুর আক্রমণ থেকে দেশ রক্ষার লক্ষ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে তারা। গত বছর কিম আগামী পাঁচ বছরের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন। এর মধ্যে তিনি যেসব নতুন অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছেন তার বিশদ বিবরণ ছিল। এই পরিকল্পনায় তুলনামূলক ছোট যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক বোমা এবং সেগুলো বহন করার জন্য স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিবিসি বলছে, পারমাণবিক হামলার আদলে সম্প্রতি কয়েকটি মহড়াও করেছে দেশটি। গত মাসে উত্তর কোরিয়াকে ‘পারমাণবিক অস্ত্রধারী’ দেশ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন কিম জং উন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত