রাষ্ট্র কার প্লেটোর লেনিনের না হিটলারের?

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২২, ১০:৩২ পিএম

‘যেভাবে বেঁচে আছি, এইভাবে বেঁচে

থাকতে থাকতে একদিন রাষ্ট্র হয়ে যাব’

প্রায় সাতসকালে আমার দিল্লির আস্তানায়, বন্ধু, কবি প্রবাল কুমার বসু ভালোবেসে নিজের লেখা যে চটি বই হাতে গুঁজে দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল, ধীরেসুস্থে তা পড়তে গিয়ে প্রথমেই ওই ওপরের লাইনগুলো চোখে পড়ল।

তারপর থেকে অনবরত ওই লাইনগুলো আউড়ে যাচ্ছি। একদিন রাষ্ট্র হয়ে যাব। যাব। যাব। যাব। কেমন হবে সে রাষ্ট্র! প্লেটোর কল্পনার রাষ্ট্র! লেনিনের বলা রাষ্ট্র! না হিটলারের ফ্যাসিবাদী স্টেট!!

আজকাল চোখ বুজলেই যে রাষ্ট্র দেখতে পাই, তার সঙ্গে অদ্ভুত মিল আছে হিটলার, মুসোলিনির অন্ধকারের রাষ্ট্রের। নতুন নতুন কথা, নতুন নতুন কত আইনে, রাষ্ট্র পরিচালকদের বিপুল হুঙ্কারে চাপা পড়ে যাচ্ছে যাবতীয় গণতান্ত্রিক স্বর। তুমি আমার পক্ষে না। তবে নিশ্চিত তুমি দেশদ্রোহী, মাওবাদী। এদেশে ভিন্ন স্বর, ভিন্ন আওয়াজ উঠলেই তাকে গ্রেপ্তার করা এখন রাষ্ট্রের অভ্যেস হয়ে গেছে। পছন্দ না হলে বুলডোজার দিয়ে তার বা তাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ তনিকা সরকার সখেদে বলছিলেন, তুমি আমি কেউই আর নিরাপদে নেই। হাঁটছি, গল্প করছি, পড়াচ্ছি, সেমিনারে যাচ্ছি, লিখছি, সিনেমা করছি, সব কিন্তু রাষ্ট্র লুকিয়ে লুকিয়ে নজর রাখছে। একচুল এদিক ওদিক হলেই রাষ্ট্র লাল চোখ দেখিয়ে তোমাকে ভয় দেখাবে। ভয় পেতে পেতে তুমি কখন কীভাবে হারিয়ে যাবে, তা কেউ জানতেও পারবে না।

অদ্ভুত এক দেশ আমার। চমৎকার তার ভূপ্রকৃতি, চমৎকার সব জনপদ, বর্ণময় মানুষজন। বছরের পর বছর এই দেশকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কত শীতের দুপুরে রিনরিন নদী পার হয়েছি। বস্তারের গভীর জঙ্গলে মাওবাদী গেরিলাদের ডেরায় গিয়ে ছবি তুলেছি। কখনো বিপুল বর্ষায় নদীভাঙন দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়েছে। কত কত আদিবাসী গ্রাম আর দলিত বস্তি দেখেছি। চাঁদ রাতে খুশি উপচেপড়া জমজমাট ভাঙ্গর, হাড়োয়া দেখে মন ভালো হয়ে গেছে। আবার গুজরাট গণহত্যার ভয়ংকর সময় দেখে মনে হয়েছে এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়। কত বছর হয়ে গেল, এখনো গুজরাট-যজ্ঞ ভুলতে পারি না। কান্না, হাহাকার, বিষাদের ছবি সারা জীবন আমাকে ভুলতে দেবে না। রাষ্ট্র তুমি কার! সাধারণের না শুধুই শাসকদের!! সেই শাসক যে কিনা দিনরাত সবাইকে সবক শেখায় আর গুজরাটের সংখ্যালঘুদের মৃত্যু প্রসঙ্গে রাস্তায় গাড়ির ধাক্কা লেগে কুকুরছানার মৃত্যুর তুলনা টানেন।

উল্টেপাল্টে প্রবালের কবিতা পড়তে গিয়ে দেখি, এতো এক ইস্তাহার। যার ছত্রে ছত্রে রয়েছে ঘৃণা। সেই ঘৃণা, অন্যায় যে সহে তারে যেন তৃণসম দহে... অন্যায় যে করে তার তুলনায় যে সহে, সেও নিশ্চিত অপরাধী। অধিকাংশ মেরুদণ্ডহীন বুদ্ধিজীবীদের ভিড়ে প্রবালের এই বই এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। বহুজাতিক কোম্পানির বড় চাকুরে প্রবাল কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে এদেশের যে চেহারা সামনে নিয়ে এসেছে তা বোধহয় কবিতাতেই সম্ভব। গদ্য সব বলতে পারে না। সব প্রকাশ করতে পারে না। কবিতার ভাষা, নীরবতার। নীরবেই আমরা বরং আজ প্রবাল কুমার বসুকে পাঠ করি।

বই এর নাম রাষ্ট্র বলছে। একটাই দীর্ঘ কবিতা। মাত্র এক ফরমা। ১২ পরিচ্ছেদ। উল্লেখ না করে পারছি না ১. ‘রাষ্ট্র বলছে কথা বলো কেন/ রাষ্ট্র বলছে চুপ/ রাষ্ট্র চাইছে সহমত/ যেন সকলেই ইচ্ছুক/ রাষ্ট্র বলছে কেবল মাত্র/ রাষ্ট্রের আছে ভাষা/ রাষ্ট্র বলছে মানতে/ মানাই বাধ্যবাধকতা/ রাষ্ট্র বলছে খাদ্যের রুচি/ তার আওতায় পড়ে/ সংবিধানের মত ই/ গণতান্ত্রিক অধিকারে/ রাষ্ট্র বলছে পরিচয় সব/ তারা দেবে ঠিক করে/ তারাই বলবে এদেশের কারা/ নাগরিক হতে পারে/ রাষ্ট্র বলছে ধর্ম সেটাও তারা করে দেবে ঠিক/ অন্যথা হলে রাষ্ট্র তাকেই/ ভাববে অধার্মিক।’ ২. ‘রাষ্ট্র বলছে জয়ের নিশান/ রাষ্ট্রের হাতে ওড়ে/ বাকি হাত সব অসহায়/ গণতন্ত্রের পরিসরে’ দীর্ঘ কবিতা। পুরোটা আর এখানে দিলাম না। এক একটা শব্দ যেন এক একটা ডিনামাইট। কখন যে ফেটে বিস্ফোরণ ঘটাবে, কেউ বলতে পারবে না। এই আশ্চর্য কবিতা পড়তে পড়তে মনে হলো শুধু এটি নিয়েই চমৎকার এক ডকুমেন্টারি হতে পারে। এমন সব চিত্রকল্প বহুদিন কোনো কবিতায় পাইনি।

হতেই পারে এরকম শক্তিশালী, সংবেদী কবিতা নিয়ে অন্যরকম এক সিনেমা। যাতে একদিকে থাকবে বীভৎসতা, অন্যদিকে রঙিন ভোর। বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভাঙা আর জোর করে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করা সংখ্যালঘুর কান্না। পাশাপাশি থাকবে বর্ণময় প্রজাপতি আর ভোরের নদী। নীল আকাশ, রামধনু ও ঝলমলে শিশুর মুখ। আমার রাষ্ট্র যারা চালান, তারা একজনও এই সুন্দর দেশকে দেখেননি। তারা ক্ষমতার দম্ভে কখনো ফুল, পাখি, গাছ ভালোবাসতে শেখেননি। তারা নিশ্চিত সালিম আলীর নাম শোনেননি। রাজস্থানের ভরতপুরে গেলে সামান্য রিকশাওয়ালাও বলে দেবেন সালিম আলীর গল্প।

ওই রিকশাচালকদের পাখি ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন সালিম আলী। ছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ। সন্তানের মমতা নিয়ে ভরতপুর বার্ড স্যাঙ্কচুয়ারিতে পাখিদের আগলে রাখতেন। একবার কোনো এক মন্ত্রী সেখানে গেছেন। তার হুটারের শব্দ, পারিষদ দলের চেঁচামেচি শুনে বিরক্ত সালিম আলী বলেছিলেন, ‘যাও বাপু, আপনি যেই হোন, চলে যান এখান থেকে। আমার পাখিদের কষ্ট হচ্ছে।’ শুনেছি, মন্ত্রী নিজেও লজ্জা পেয়ে নাকি চলে গেছিলেন। তখন সময়টা অন্যরকম ছিল। এখন হলে হয়তো স্রেফ নামের জন্য সালিম আলীকে ঘুষপেটিয়া বলে অথবা আর্বান নকশাল বলে জেলে ঢোকানো হতো।

ধীরে ধীরে চমৎকার এই দেশ বদলে যাচ্ছে। আলো, বাতাস, তারাখচিত আকাশ সব এখন কর্তাদের আদেশে চলবে। সবাই সব ভয়ে মেনে নিচ্ছে। চুপচাপ শান্ত পরিবেশের ভেতরে ভেতরে হয়তো ক্রোধ জমছে। রাষ্ট্র জানে না, নীরবতার ভাষাও কিন্তু আগামী দিনে ভয়ংকর রোষে ফেটে পড়তে পারে।

প্রবালের লাইন দিয়েই শেষ করি ‘মুখ বুজে সব, বদলে যাচ্ছি/ সকলেই অসহায়/ রাষ্ট্র জানে না চোখের জলেও/ বিদ্যুৎ চমকায়।’

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত