পৃথিবীর ফুসফুসের ক্ষত কতোটা সারাতে পারবেন লুলা?

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২২, ০১:২৯ পিএম

ব্রাজিলের রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরলেন দেশটির বামপন্থি নেতা লুইজ ইনাসিও  লুলা দা সিলভা। ৭৭ বছর বয়সি এই নেতার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। যার মধ্যে অন্যতম আমাজন বনকে সুরক্ষিত করা।

লুলার এ প্রত্যাবর্তনকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত ও বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিরহরিৎ বন আমাজন বনের সুরক্ষায় আশা দেখছে বিশ্ববাসী। আমাজন রক্ষায় লুলা আগের শাসনামলেও বেশ আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। এবারও বনের ক্ষত সারিয়ে তোলার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি।

দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমাজন রক্ষায় লুলার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে লুলা বলছেন, ‘বিশ্বে অরণ্য উজাড় করা শীর্ষ দেশ হওয়ার চাইতে আমরা বরং জলবায়ু সংকট নিরসন ও সামাজিক পরিবেশের উন্নয়নে চ্যাম্পিয়ন হতে চাই।’

কিন্তু তার আগের চরম ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর নানা পদক্ষেপ পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজনে যে ক্ষত তৈরি করেছে লুলা কি পারবেন তা সারাতে?

একসময় বিশ্বের কাছে ব্রাজিল ছিলো প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের দৃষ্টান্ত। আদিবাসীদের ভূমি সংরক্ষণ, অবৈধভাবে বন উজাড়কারীদের ওপর ধরপাকড়, কী পরিমাণ বন ধ্বংস হচ্ছে, তা গভীরভাবে পর্যক্ষণ করায় একসময় দেশটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিলো বন উজাড়ের হার।

তবে ২০১৯ সালে পালটে যায় পরিস্থিতি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন জইর বলসোনারো। বলসোনারোর শাসনামলে আমাজন জঙ্গল ধ্বংসের হার যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে পরিবেশের সুরক্ষাজনিত পদক্ষেপগুলো।

গবেষণায় দেখা গেছে, বন উজাড় এবং আগুনের কারণে আগের দশকের তুলনায় ২০১৯ ও ২০২০ সালে দেশটিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের হার দ্বিগুণ হয়েছে।

২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত বলসোনারোর শাসন মেয়াদের প্রথম তিন বছরে আগের একই সময়ের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি বন এলাকা উজাড় হয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট দাবানলে ধ্বংস হওয়া বন এলাকাকে বাদ দিয়ে এ হিসাব করা হয়েছে।

লুলা দা সিলভা আবারও দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় আশার আলো দেখছেন পরিবেশবিদরা। প্রশ্ন হলো লুলা কি পারবেন আমাজনের ক্ষত সারতে?

২০০৩ সালে ব্রাজিলে আমাজন জঙ্গল উজাড়ের হার আগের বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল। ওই বছর ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা উজাড় হয়েছিল। এমন সময়ই প্রথমবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন লুলা। ২০০৪ সালেও পরিবেশ বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছিল।

ব্রাজিলের জাতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা-আইএনপিই-এর গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৪ সালে আমাজন জঙ্গলের ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ধ্বংস হতে দেখা গিয়েছিল।

তবে ২০১২ সাল নাগাদ বন ধ্বংসের এলাকা কমে ৪ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এই আট বছরের মধ্যে বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায় ছিলেন লুলা।

লুলা তার আগের শাসন মেয়াদে পরিবেশ নিয়ে যেমন ভূমিকা দেখিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তার বিজয় আমাজনের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক জলবায়ুবিষয়ক ওয়েবসাইট কার্বন ব্রিফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লুলা যদি তার আগের মেয়াদের মতো করে বন উজাড়ের হার কমাতে পারেন, তাহলে আগামী দশকে বন উজাড়ের হার ৯০ শতাংশ কমে যাবে।

ব্রাজিলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইমাজনের গবেষক ব্রেন্দা ব্রিতো বলেন, ‘গত কয়েক বছরে যা কিছু ঘটেছে, তা সত্যিকার অর্থে মর্মান্তিক। আমাদের পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাজন বন সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝেন লুলা। কারণ, এর আগে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তিনি তা করে দেখিয়েছেন।’

অন্যদিকে বনখেকো সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বলসোনারো ছিলেন যে কোনো মূল্যে কেবল মুনাফা লাভে বিশ্বাসী। এ জন্য পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় আমাজনকে বিসর্জন করতেও পিছপা হননি তিনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, বলসোনারো ক্ষমতায় থাকাকালে মহাবন আমাজন সবচেয়ে বেশি উজাড় হয়েছে।

আমাজনে ক্ষত সৃষ্টির জন্য ডানপন্থি নেতার নীতিগুলোকে দায়ী করছে গণমাধ্যমগুলো। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে গত ২১ অক্টোবর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলসোনারোর বনবিধ্বংসী নীতি এবং আমাজনের আদিবাসীদের অস্তিত্ব বিলীনের ভীতি নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

প্রতিবেদনে এক আদিবাসী নেতা দাভি কোপেনাওয়ার ভাষ্য ছিল ‘যদি বলসোনারো আবার জিতে যায়, তাহলে আমাদের মেরে ফেলবে।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বলসোনারোর নেওয়া কট্টর ডানপন্থি নীতিমালা বিশেষ করে আমাজন বনসংক্রান্ত নীতি ব্রাজিলকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

২০১৯ সালে ক্ষমতায় আসা বলসোনারোর নীতি বনভূমি উজাড় করে বিশেষ করে আগুন লাগিয়ে কৃষিজমি বাড়ানো এবং অপরিণামদর্শী অবৈধ সোনার খনি প্রকল্পগুলোকে উৎসাহিত করেছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর বলসোনারো ব্রাজিলের পরিবেশের সুরক্ষাজনিত পদক্ষেপগুলো কমিয়ে ফেলেন, বিজ্ঞান ও পরিবেশগত সংস্থাগুলোতে খরচ কমিয়ে দেন, পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের বরখাস্ত করেন এবং আদিবাসীদের ভূমির অধিকারে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করা হয়।

তাই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভার সামনে এখন বলসোনারোর হাতে ক্ষত-বিক্ষত আমাজনকে সারিয়ে তোলার চ্যালেঞ্জ।

ওদিকে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর বিশ্বনেতাদের প্রশংসায় ভাসছেন লুলা দা সিলভা। দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত