তুই-তোকারির মাত্রাজ্ঞান

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৮ পিএম

সম্বোধন আমাদের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সম্বোধন শুনে বোঝা যায় মানুষে মানুষে সম্পর্ক, সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণিবৈষম্য। বাংলা ভাষায় তিনটি সম্বোধন পদ আছে :  তুই, তুমি ও আপনি। তুচ্ছার্থে বা নিচু শ্রেণি বোঝাতে যেমন ‘তুই’ বলা হয় তেমনি অতি প্রিয়জনকে ভালোবেসে বা আদর করে ‘তুই’ সম্বোধন করা হয়। এটা আমাদের ভাষার মাধুর্য, রেওয়াজ বা প্রচলিত রীতি। আমরা ছোটদের ‘তুই’ বা ‘তুমি’ আর বড়দের ‘আপনি’ বলি। এই আমরাই আবার শ্রেণি বিবেচনায় বাবা-মা-দাদা-নানার বয়সী মানুষকেও তুই-তোকারি করি দম্ভ ভরে। যুগ যুগ ধরে সামাজিক অবস্থান বা পোশাক দেখে খুব সহজেই তুই-তোকারির প্রথা রয়েছে। বাসাবাড়িতে কাজের বুয়াকে ৫-৬ বছরের শিশুও ‘তুই’-‘তুমি’ বলে ডাকে। আর বয়স্ক বুয়ারা ‘ভাইয়া’, ‘আপামণি’ বলে ডাকে। রিকশাওয়ালা ফেরিওয়ালা বা নিম্নবিত্তের মানুষদের অবলীলায় ‘তুই-তোকারি’ করাটাই এখানকার নিয়ম। এই ঘটনাগুলো আমাদের কাছে অতি পরিচিত।

এ ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষা নিরাপদ। সেখানে সবাই ‘ইউ’ অর্থাৎ তুমি। ‘আপনি’ বা ‘তুই’ এর বালাই নেই। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘তুই’ সম্বোধনটাই বেশি চলে। তারা ছোটদের ‘তুই’ বলে ডাকে। এক টিভি সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদি মোহাম্মদ বলেন, ‘বিশ্বভারতীতে (শান্তিনিকেতন) পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রথমে আমার খুব সমস্যা হয়েছিল। সেখানে সব শিক্ষকরা তুই বলে ডাকেন। আমি সেটা মেনে নিতে পারতাম না। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়েছি। আসলে তুই বলে ডাকাটাই সেখানকার চল’। চলচ্চিত্রনির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ ‘এবং ঋতুপর্ণ’ নামে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ছোট-বড় প্রায় সবাইকে তুই সম্বোধন করতেন। একবার ঋতুপর্ণ ঘোষকে কোনো এক সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল সবাইকে তুই বলার কারণ। তিনি বলেছিলেন, ‘তুই বললে একে অন্যকে কাছের আর বেশি আপন মনে হয়। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় অন্তরঙ্গ হওয়া সহজ হয়।’ ৭০-৮০’র দশকে বন্ধু-বান্ধবীরা তুই বলেই সম্বোধন করত বেশি। ’৯০ দশক থেকে বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যে তুমি বলার চল বেড়েছে। বন্ধু-বান্ধবীদের মধ্যে বিয়ে হলে তুই থেকে তারা তুমি বা আপনি সম্বোধনে চলে যেতেন। কারণ বিয়ের পর তুই-তোকারি চলে না। সহপাঠীরা একে অপরকে তুই বলে ডাকলেও উভয়ের মধ্যে পরিণয় ঘটলে তখন এক অজানা নির্দেশে ‘তুই’ শব্দটি তুমিতে উন্নীত হয়। বিয়ের পর তুই সম্বোধন তাদের কাছে যেন বেমানান লাগে। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধুর সম্পর্কে সম্বোধনটি তুমি হলেই যেন ভালো। এক সময় আমাদের দেশে স্বামীরা স্ত্রীদের সম্মান করে আপনি বলে ডাকতেন। আবার তুই বলে ডাকার চলও আছে। স্ত্রীকে আপনি বলবেন এটা অনেক পুরুষ যেন ভাবতেই পারেন না। তবে, ইদানীং অনেকেই স্ত্রীকে তুমির পরিবর্তে তুই বা আপনি বলে ডাকছেন ভালোবেসে।

তুই সম্বোধন করে অনেক গানও হচ্ছে আজকাল। গানগুলো জনপ্রিয়ও হচ্ছে। তবে এই গানগুলো একতরফা ছেলেরাই মেয়েদের নিয়ে গাচ্ছে। তপুর গানের শিরোনাম ‘তুই’। আসিফ আকবরের গান-‘খোদার কসম-আজ থেকে ভুলে যাব তোর নাম’। এমনি আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। তুই সম্বোধনটাকে আবার অনেকে মেনে নিতে পারছেন না আমাদের সমাজে। তারা মনে করছেন এতে নারীদের অসম্মান করা হচ্ছে। গানের লিরিকে কেন তুই-তোকারি থাকবে? আমাদের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় গান আছে তুমি বলে ডাকলে কত মধুর লাগে/আজ থেকে আর আপনি বলে ডেকো না আমাকে। প্রখ্যাত গীতিকার রফিকুজ্জামান গানে তুই-তোকারিকে পছন্দ করেননি। একটি জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালে তার কলামে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাংলা সাহিত্যের দিকপাল কবিদের লেখায় তুই-তোকারি’র অনেক উদাহরণ আছে। কিন্তু সেসব নিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ কখনো কোনো প্রশ্ন তোলেনি। ‘‘আপাতভাবে নিরীহ মনে হলেও ‘তুই’, ‘তুমি’ ও ‘আপনি’ শব্দ তিনটি আমাকে খুব ভাবায়। অনেক দেখার পর আমার মধ্যে এই বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে এই তিনটি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে আমরা ব্যাপক অবিচার করে থাকি। আমরা গরিবকে অবমূল্যায়ন করি; পরিশ্রমীকে অপমান করি; অযোগ্যকে সম্মান করি, নিরীহকে ভয় দেখাই, সাধারণ লোকের আত্মসম্মানে আঘাত করি; সর্বোপরি সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করি। চোখ কান একটু খোলা রাখলেই আপনি উপলদ্ধি করতে পারবেন।’’ (আমার ভাবনা/মনিরুজ্জামান সোহেল, ভোকাব গ্রামার-১,পৃ ৫৮৭)।

তুই-তোকারির কারণে শুধু যে মানুষ অপমানিত হয়, বিব্রতবোধ করে আর শ্রেণিবৈষম্য চোখে পড়ে তাই না। জীবননাশের ঘটনাও ঘটছে। তুচ্ছ কারণেই জীবন চলে যাচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে তুই তুমি নিয়ে তেমন সমস্যা না থাকলেও তরুণদের মধ্যে রয়েছে। বয়সে ছোট কেউ তুই তুমি বললে যুবকরা একদম সহ্য করতে পারে না। তাদের ইগোতে লাগে। এ নিয়ে আমাদের দেশে অনেক ফ্যাসাদ হয়। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে, শুধু ‘তুই’ করে বলাতেই ২০১৭ থেকে ২০১৯ এই তিন বছরে রাজধানীতে খুন হয়েছে চারজন। তুই-তোকারি করতে গিয়ে আমরা অনেকেই মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। ঝগড়া বিবাদে আপনি বা তুমি থেকে তুইতে নামতে বেশি সময় লাগে না। আমাদের জীবনে সম্বোধনের ভূমিকা রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের মধ্যে এ ধরনের চর্চা ও শিক্ষা দেওয়া উচিত। মানুষকে ‘তুই’ এর পরিবর্তে তুমি বা আপনি বললে ক্ষতি কী? এতে যদি একটি মানুষ নিজেকে সম্মানিত মনে করে।

সম্বোধনের এই জটিল সমীকরণ থেকে মুক্ত হতে তুই তুমি ও আপনি থেকে যে কোনো একটা বেছে নিতে পারি। এ ক্ষেত্রে হয়তো অধিকাংশই তুমি বলাকেই পছন্দ করবেন। আবার অনেকে এটাও মনে করেন বৈচিত্র্য হিসেবে তিনটি সম্বোধন থাকলে দোষ কী? সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে সম্বোধনের ধরন। সম্পর্কই বলে দেবে কাকে আপনি কাকে তুমি আর কাকে তুই বলতে হবে। তবে, অপরিচিতজনকে তুই কিংবা তুমি না বলে আপনি বলাই বুদ্ধিমানের কাজ। তা না হলে কখনো বিব্রত হতে পারেন। কোনো মানুষকে তুই তুমি বলার আগে আরেকটিবার ভাবুন, ভাবুন এবং ভাবুন। কাউকে তুমি বলার আগে একবার ভাবুন আর তুই বলার আগে দুইবার ভাবুন। সৌজন্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। প্রথম পরিচয়ে কোনো অবস্থাতেই সম্বোধনে যেন ত্রুটি না থাকে সেদিকে সতর্ক হোন।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত