জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব ও মাস্টারমাইন্ড নিয়ে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বাগবিত-া হয়েছে। গতকাল রবিবারের সংসদ অধিবেশন অর্থনীতি, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও রাজনীতি নিয়ে নানা প্রস্তাব ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সরগরম ছিল। সাধারণ আলোচনায় ওঠে আসে ব্যাংকিং সংস্কার, সুদমুক্ত অর্থনীতি, কালো টাকা, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তারেক রহমান দূর থেকে কার্যকর নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে এবং তিনিই আন্দোলনের প্রধান নায়ক।
এর জবাবে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড নেই। এ আন্দোলনের কৃতিত্ব বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ ও দেশের যুবসমাজের।
দুপুরে অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, ডা. শফিকুর রহমান নিজেই অতীতে এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে জুলাই আন্দোলনের মহানায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাই প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ওই বক্তব্য তিনি ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে একটি ইফতার মাহফিলে দিয়েছিলেন। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশে একজনকে আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলার পর তিনিই প্রথম এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, আগেও বলেছি, এখনও বলছি এই আন্দোলনের কোনো একক মাস্টারমাইন্ড নেই; এর কৃতিত্ব বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের।
৫০০-১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব : বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিলের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এই অর্থ ব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিল করে দুই মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। যাদের ট্যাক্স ফাইলে ওই অর্থের হিসাব থাকবে না, তারা ২৫ শতাংশ কর দিয়ে তা বৈধ করতে পারবেন। এতে বাজেট ঘাটতি কমবে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়বে এবং বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, দেশে এত বেশি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে ব্যাপক লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে দেশের আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও দেশে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ বিদেশে অর্থ না পাঠিয়ে দেশেই বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সফলতা কামনা করেন।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নিয়ে সরকারের অবস্থান : আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্তের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, এটি মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত নয়; বরং হাসপাতালের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। আদ্-দ্বীনের ঘটনায় ছয়টি শিশু অক্সিজেনের অভাব ও চরম অবহেলার কারণে মারা গেছে। হাসপাতালের কক্ষে এসি বন্ধ ছিল, জানালা বন্ধ ছিল, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা ছিল না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাও যথাসময়ে উপস্থিত হননি। তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চিকিৎসক ও নিহত শিশুদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালটির ভবনে অনুমোদনবহির্ভূতভাবে বেকারি কারখানা ও দাহ্য বর্জ্য রাখা হয়েছিল, যা রোগীদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছিল। তাই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং সব হাসপাতালকে কঠোরভাবে শৃঙ্খলার আওতায় আনা হবে। এ বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করার আহ্বানও জানান তিনি।
কয়েকবার বিরোধী দলে থাকলে সমালোচনা করা শিখবেন : বিরোধীদলের সমালোচনাকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা এই প্রথম বিরোধী দল হয়েছেন। আমার বিশ্বাস, অনেক জায়গায় সমালোচনা করতে আপনারা ভুল করেছেন। আরও দুই-চারবার বিরোধী দলে থাকলে আস্তে আস্তে সমালোচনা করাটাও বুঝে যাবেন।
তিনি বলেন, নতুন সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে কাজ করছে। অর্থমন্ত্রী অনুন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়েছেন, যা অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। তিনি দাবি করেন, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল ঋণের সুদ পরিশোধেই সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিএনপি সরকারের অতীত অর্থনৈতিক সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, এবারও সরকার নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে।
সুদমুক্ত অর্থনীতির প্রস্তাব : জামায়াতের সংসদ সদস্য এটিএম আজহার দেশের অর্থনীতিকে সুদমুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাজেটে সুদ পরিশোধেই বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা মুসলিমপ্রধান দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ইসলামী বন্ড আরও জনপ্রিয় করে জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রস্তাব দেন।
তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ, ব্যাংক লুটপাট ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার। এ সুবিধা বাতিলের দাবি জানিয়ে তিনি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলে জামায়াত নেতাদের ফাঁসিকে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ আখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিচারও দাবি করেন।
বাজেটে জাকাত না থাকায় ক্ষোভ : জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে জাকাত শব্দের কোনো উল্লেখ নেই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করা গেলে বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ সম্ভব এবং তা দিয়ে বাজেট ঘাটতির বড় অংশ পূরণ করা যাবে।
তিনি সুদভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল, মদ-বিড়ি নিষিদ্ধকরণ, শিক্ষা জাতীয়করণ, কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি সহায়তা, শ্রমিকদের সময়মতো মজুরি প্রদান এবং দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান।
সংসদে দিনের আলোচনায় অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের সংকট, স্বাস্থ্যসেবার জবাবদিহি, ধর্মভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রস্তাব এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে উচ্চমূল্যের নোট সাময়িকভাবে বাতিলের প্রস্তাব এবং জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের প্রকাশ্য বিতর্ক অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।