বিএসএমএমইউ’র গবেষণা

শিশুদের হাতে ২ ঘণ্টার বেশি মোবাইল ফোন নয়

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০৯:৪৯ পিএম

দেশের গ্রামাঞ্চলে ১১-১৭ বছর বয়সীদের প্রায় ৩৩ শতাংশ শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এসব শিশুদের ৩৫ শতাংশ উৎপীড়ন, উপহাস, গুজব কিংবা অপমান, ২৯ শতাংশ অসৎ উদ্দেশ্যে বেনামে যোগাযোগ, ১১ শতাংশ যৌন-নিপীড়নমূলক বার্তা কিংবা মন্তব্য এবং ১৭ শতাংশ শিশু যৌনতাপূর্ণ ছবি বা ভিডিওর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং নিজেদের অজান্তেই সাইবার অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। 

বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ‘অনলাইনে শিশু নির্যাতন’ শীর্ষক এক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। 

গ্রাম এলাকার ৪৬০ শিশুর ওপর করা এ গবেষণা উপস্থাপন করেন মুহাম্মদ ইব্রাহীম ইবনে তৌহিদ। 

এ গবেষক বলেন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের নীতির কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার অনেক বেড়েছে। ইন্টারনেট সম্পর্কে কম জ্ঞান এবং সঠিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারার কারণে অপরাধীরা ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো এবং হোয়াটসঅ্যাপের মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিশুদের নির্যাতন করতে সক্ষম হয়।

এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে অনুষ্ঠানে বিএসএমএমইউ উপাচায অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া ঠিক নয়। কারণ এ বয়সে শিশুরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে নিজের অজান্তেই অনেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যেসব শিশু মোবাইলে আসক্ত তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। তারা এক সঙ্গে মোবাইল ফোন আসক্তি কমাতে পারবে না। এ জন্য তাদের দিনে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা তবে একটানা আধাঘণ্টার বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করা বা দেখা যাবে না। এটি করতে পারলে তাদের নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে পারি।

এ গবেষণাসহ মোট পাঁচটি গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। 

বাকি চার গবেষণার মধ্যে ডা. মারিয়াম সাল ‘শিশু অধিকার ও সুরক্ষা’, ডা. নীলিমা বর্মন ‘শৈশবের বিরুপ অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তী স্বাস্থ্য সমস্যা’, শাবনাম আযীম ‘শিশু নির্যাতন বন্ধে মিডিয়ার ভূমিকা’ এবং ডা. মো. মারুফ হক খান ‘অসংক্রামক রোগ: শিশু বিকাশের অন্তরায়’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের তত্ত্বাবধানে এসব গবেষণা হয়। 

অনুষ্ঠানে প্রকাশিত ২০২১ সালে দেশের শহর ও গ্রামের ৪৫৬ শিক্ষার্থীর (নবম ও দশম শ্রেণি) ওপর পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়, দেশের ৫৬ শতাংশ কিশোর এবং ৬৪ শতাংশ কিশোরী ইন্টারনেট মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। শহরে শিশুদের মধ্যে ইন্টারনেটে যৌন নিপীড়নের ঘটনা গ্রামীণ শিশুদের চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি।
এ গবেষণায় বলা হয়, যেসব শিশু ফেসবুক, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং চ্যাটরুম ব্যবহার করে তাদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

এ ছাড়া ৯-১৩ বছর বয়সী ২৪ শিশুর ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় বলা হয়, শিশু নির্যাতন সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি গতানুগতিক এবং কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা, যার মারাত্মক শারীরিক এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিশেষত কমবয়সী শিশু, মেয়ে-শিশু এবং গরীব শিশু তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পরিবার, খোলা এবং কর্মক্ষেত্রে তারা নিম্নস্তরে এবং নিম্ন অবস্থানে থাকায় তাদের কথায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইব্রাহীম ইবনে তৌহিদ আরো বলেন, শিশুর ১৮ বছর বয়সের আগে ঘটে যাওয়া আঘাতমূলক এবং পীড়াদায়ক ঘটনার সঙ্গে শিশুর ওপর মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, মানসিক এবং শারীরিক অবহেলা, পিতামাতার বিচ্ছেদ, মায়ের প্রতি সহিংসতা, বাড়িতে মাদকের ব্যবহার, পরিবারে মানসিক রোগী থাকা এবং পরিবারের সদস্যদের কারাবাস- এসব বিষয় সম্পর্কিত।  

অপর এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ি, যেসব মায়েরা তিন বা ততোধিক প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তাদের মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা সম্পন্ন শিশু জন্ম দেওয়ার সম্ভাবনা চারগুণ বেশি। অন্য একটি গবেষণায় প্রাপ্তবয়স্কদের বিষন্নতা, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে প্রতিকূল শৈশব অভিজ্ঞতার একটি উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে।  
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শিশু নির্যাতন একটি নিত্যনৈমিত্তিক এবং বেদনাদায়ক ঘটনা যা বাংলাদেশি সমাজে সর্বজন স্বীকৃত। কমবয়সী শিশু, মেয়ে এবং দরিদ্র শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। শিশুদের সবসময় ছোট এবং বাবা-মার অধীনস্থ মনে করা হয়, তাই পরিবার, স্কুল এবং কর্মক্ষেত্রে কোথাও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা সাবেক তথ্য কমিশনার ও দৈনিক আজকের পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কোনটিতে লাইক, কমেন্ট দেওয়া যাবে তার জন্য সকলকে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সাইবার অপরাধ দমনে সচেতনতার বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন অনুষদের ডিন ও পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শরিফুল ইসলাম। 

স্বাগত বক্তব্য রাখেন পাবলিক হেলথ এন্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. আতিকুল হক। 

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. একেএম মোশাররফ হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিশু ও সমন্বয় উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিবুজ্জামান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত