মুদ্রায় বেঁচে থাকা এক সম্রাট

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:২৮ পিএম

তৃতীয় শতকের রোমান সম্রাট স্পন্সিয়ান। ইতিহাসের বাইরের কাল্পনিক এক চরিত্র হিসেবেই এত দিন দেখা হতো তাকে। কিন্তু ৩০০ বছরের প্রাচীন এক স্বর্ণমুদ্রা নতুন করে অস্তিত্বের প্রমাণ দিল তার। গবেষকদের দাবি, রোমান সম্রাট স্পন্সিয়ান বাস্তবে ছিলেন। লিখেছেন নাসরিন শওকত

একটি স্বর্ণমুদ্রা

দীর্ঘদিন ধরে যার সঠিক অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একসময় নকল বলে বিশ^াসও করা হতো। আজ তা ইতিহাসের অতলে ডুবে থাকা এক সাম্রাজ্যকে সবার সামনে তুলে ধরেছে। প্রাচীন এই মুদ্রাটি তৃতীয় শতকের রোমান এক সম্রাটের শাসনামলের বলে প্রমাণিত হয়েছে এখন। রোমান ওই সম্রাটের নাম স্পন্সিয়ান। তিনি ছিলেন মূলত ইউরোপের একটি বিচ্ছিন্ন রোমান রাজ্যের সামরিক কমান্ডার। যাকে এত দিন এক কাল্পনিক চরিত্র হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসে তার অস্তিত্ব ছিল কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি এত দিন। তবে এখন মনে হচ্ছে, স্পন্সিয়ান বাস্তবে ছিলেন। কারণ প্রাচীন সেই সময়কার চারটি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। যার একটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গ্লাসগোর হান্টারিয়ান বিশ^বিদ্যালয়ের জাদুঘরে রয়েছে। স্বর্ণমুদ্রাগুলোর ওপর গবেষণার পর দেখা যায়, ওই মুদ্রাগুলোর একটিতে সম্রাট স্পন্সিয়ানের নাম ও ছবি খোদাই করা রয়েছে। গবেষকরা দাবি করছেন, প্রাচীন একটি স্বর্ণমুদ্রায়-খচিত সম্রাট স্পন্সিয়ানের নাম ও ছবি। যা প্রমাণ করে তার অস্তিত্ব ছিল।

সত্যি নাকি নকল?

এই স্বর্ণমুদ্রাগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। মুদ্রার ছোট একটি ভা-ার ট্রানসিলভেনিয়ায় আবিষ্কার করা হয়েছিল, যা একসময় রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন রোমান সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর ছিল  ট্রানসিলভেনিয়া । যেখান থেকে স্পন্সিয়ান তার রাজ্য শাসন করতেন । ট্রানসিলভেনিয়া ১৭১৩ সালে আধুনিক রোমানিয়ায় পরিণত হয়। আবিষ্কারের পর থেকে একে প্রকৃত রোমান মুদ্রা হিসেবেই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এর নকশা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তখন আসল রোমান মুদ্রা দাবি করা একই বিশেষজ্ঞরা হঠাৎ করেই তাদের মত পাল্টান। মুদ্রার অমসৃণ নকশা ও বিশৃঙ্খল লেখার ধরনের জন্য তারা নিশ্চিত হন যে, জালিয়াতকারীরা মুদ্রাগুলোকে নকল করে তৈরি করেছে। তৃতীয় শতকের আরও রোমান সম্রাট ছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন গর্ডিয়ান তৃতীয় ও ফিলিপ আরব। এ সময়ের আরও কিছু স্বর্ণমুদ্রা পরে আবিষ্কার হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ওই বিশেষজ্ঞদের বিশ^াস শতাব্দী ধরে স্থায়ী ছিল। এরই মধ্যে একজন বিশেষজ্ঞ দাবি করেন যে, এই নকল করার পেছনে ভেনিসের একজন অভিজাত জালিয়াতকারীর হাত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যিনি ঐতিহাসিক নিদর্শন সংগ্রহকারীদের আকৃষ্ট করতে পুরো একজন সাম্রাটকেই নির্মাণ করে দেখিয়েছিলেন। তার এই মন্তব্য পরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

২ হাজার বছরের প্রাচীন

তিন হাজার বছরেরও আগে মধ্য ইউরোপের ঐতিহাসিক একটি এলাকায় পাওয়া যায় চারটি স্বর্ণ মুদ্রা। যার একটিতে পাওয়া গিয়েছিল স্পন্সিয়ানের নাম ও অস্পষ্ট প্রতিকৃতি। ঐতিহাসিক এলাকাটির নাম ট্রানসিলভেনিয়া। অনেক সময় আগে বিশেষজ্ঞরা এই মুদ্রাগুলোকে নকল বলে দাবি করেছিলেন। তখন তারা পরামর্শ দেন, জাদুঘরের ক্যাবিনেটে রাখা স্বর্ণমুদ্রাগুলো ১৮ শতকের, যা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করেছে প্রতারকরা। তাই তখন স্বর্ণমুদ্রায়-খচিত সম্রাটের তথ্য সঠিক নয় বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। এরপরই সেগুলো জাদুঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। তবে বর্তমানে এক ব্রিটিশ গবেষণার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে, মুদ্রার ওপরের আঁচড়ের দাগগুলো শুধু মাইক্রোস্কোপের নিচেই দেখা যায়। গবেষকরা বলছেন, ওই স্বর্ণমুদ্রা তারা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাতে মুদ্রা কোন সময়ের সে বিষয়টি ধরতে পেরেছেন তারা। তারা দাবি করেছেন, এটি দুই হাজার বছর আগের মুদ্রা। এবারের গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের অধ্যাপক পল পিয়ারসন। ফলাফলে উচ্ছ্বসিত অধ্যাপক পিয়ারসন বিবিসি নিউজকে বলেন, ‘এই আবিষ্কারে আমি অভিভূত। আমরা খুব আত্মবিশ^াসী যে এগুলো খাঁটি। এ থেকে আমরা একজন সম্রাটকে খুঁজে পেয়েছি। তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাকে এত দিন কাল্পনিক বলে ধারণা করা হতো এবং তার চরিত্র সৃষ্টিও করেছেন বিশেষজ্ঞরাই। কিন্তু এখন আমরা মনে করি সত্যিই তার অস্তিত্ব ছিল। তাই ইতিহাসে তার ভূমিকাকেও দেখতে হবে । আমাদের গবেষণার ফলাফল বলছে, রোমান সাম্রাজ্য ডেসিয়া শাসন করতেন স্পন্সিয়া। সে সময় ডেসিয়া ছিল সোনার খনির বিচ্ছিন্ন একটি ঘাঁটি। সাম্রাজ্যটি তখন গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যার সীমান্ত এলাকাগুলো লুটেরা দখলদারদের আক্রমণের শিকার হয়।’

পিয়ারসন বনাম কোহেন

ঊনিশ শতকের প্রধান মুদ্রাবিশেষজ্ঞ ছিলেন হেনরি কোহেন। ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারের মুদ্রাবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন। ফরাসি এই মুদ্রাবিশেষজ্ঞের সংগ্রহে ছিল বিশাল রোমান মুদ্রার সংগ্রহ, যা তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল সে সময়। ১৮৬৩ সালে কোহেন দাবি করেন যে, স্পন্সিয়ানের প্রতিকৃতি-খচিত স্বর্ণমুদ্রাগুলো আসল নয়। তার মতে, মুদ্রাগুলো শুধু ‘আধুনিক’ প্রযুক্তিতে তৈরি নকলই নয় বরং সেগুলো ‘খুব অবহেলায় তৈরি’ এবং ‘হাস্যকরভাবে কল্পনা’ করা হয়েছিল। এদিকে অন্য বিশেষজ্ঞরাও সে সময় তার পথই অনুসরণ করে একই দাবি তোলেন। আর সেজন্যই এ সময়ের পণ্ডিতদের ক্যাটালগ থেকে রীতিমতো বাদ দেওয়া হয়েছিল স্পন্সিয়ানকে। এরও অনেক দশক পরে এসে কোহেনের যুক্তি বাতিল হয়। দীর্ঘ সময় ধরে জারি থাকা এই পণ্ডিত মতামতকে যিনি পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন, তিনি ব্রিটিশ অধ্যাপক পিয়ারসন। তিনি মূলত পৃথিবীবিষয়ক বিজ্ঞানী (পৃথিবীর ভৌত গঠন ও বায়ুমণ্ডল নিয়ে কাজ করেন) ও ‘দ্য রোমান এম্পায়ার ইন ক্রাইসিস, ২৪৮-২৬০ বইয়ের লেখকও। অধ্যাপক পিয়ারসন বলেন, করোনা মহামারীর সময় তিনি একটি লকডাউন প্রকল্পে কাজ করছিলেন। যেখানে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের ওপর একটি বই নিয়ে গবেষণা চলছিল তার। গবেষণার সময়ই তিনি ওই মুদ্রার ছবিগুলো দেখতে পান, যা তাকে সন্দিহান করে তোলে। এরপরই অধ্যাপক পিয়ারসন গ্লাসগো বিশ^বিদ্যালয়ের হান্টেরিয়ান জাদুঘরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক জেসপার এরিকসনের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। জেসপারের কাছে স্পন্সিয়ারের প্রতিকৃতি খোদাই করা একটি মুদ্রা রয়েছে। মুদ্রাটি নিয়ে গ্লাসগো বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে একটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে দেখতে চান পিয়ারসন। তাই সেখানে গবেষণাটি তিনি করতে পারবেন কি না, তা জেপসারের কাছে জানতে চান।

মুদ্রায় আঁচড়ের দাগ

সোনা দিয়ে তৈরি মুদ্রাগুলো এর ওজনের কারণে মূল্যবান। কারণ পুরো একটি মুদ্রায় যে পরিমাণ সোনা রয়েছে তার বর্তমান মূল্য ২০ হাজার মার্কিন ডলার হতে পারে। মুদ্রার প্রকৃত ওজন ও দাম মূল্যায়ন করে পিয়ারসন বলেন, ‘যদি এটি নিয়ে সত্যিকারের কোনো জালিয়াতিই হয়ে থাকে, তবে তা শুরু করার জন্য বড় অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন।’ মুদ্রাগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণের সময় এর পৃষ্ঠে/গায়ে সালফেট স্ফটিক বা কাচ শনাক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা। কোনো কিছু দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকলে তাতে স্ফটিক জমে। আর এই স্ফটিক জমার কারণ হলো মাটির নিচে অক্সিজেনের অভাব । তারপর বাইরে বের করে আনলে বাতাসের সংস্পর্শে এসে তার ওপর স্ফটিকের আবরণ পড়ে। বৈজ্ঞানিক ওই বিশ্লেষণের সময় প্রতিটি মুদ্রাকে ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপের অপটিক্যাল ইমেজের মাধ্যমে বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল। যেখানে দেখা যায়, আসল মুদ্রায় যে ধরনের পরিধান ও আঁচড় ছিল এই মুদ্রাগুলোতেও তেমন ফাড়ার আঁচড় রয়েছে। আর এই প্রমাণই পিয়ারসন ও এরিকসনকে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে সহায়তা করেছে যে, মুদ্রাগুলোকে মাটিচাপা দেওয়ারও বেশ কিছু বছর আগে সেগুলো প্রচলিত ছিল।

পিয়ারসনের ব্যাখ্যা

আমরা মুদ্রাগুলোর গায়ে যে আঁচড়ের দাগ খুঁজে পেয়েছি , সেগুলো দৈর্ঘ্যে এক মিলিমিটারের এক হাজার ভাগ ও ব্যাসে তার চেয়ে কম। সাধারণত আসল মুদ্রায় যে রকমটা দেখতে পাওয়া যায়। গবেষণায় মুদ্রাগুলোকে ধোয়া, কৃত্রিমভাবে ঘষা বা সেগুলোর বয়স বাড়াতে চেষ্টা করার তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে কৌতূহল জাগানো বিষয়টি হলো, মুদ্রার গায়ের ওপর সিমেন্ট আকারের ময়লার আবরণ। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম, এটি কৃত্রিম কোনো পদার্থ দিয়ে পোড়ানো, আঠা লাগানো বা ঘষা হয়েছে বোধ হয়। নয়তো

কৃত্রিম কোনো উপাদান দিয়ে এটি আঁকা হয়ে থাকতে পারে। গবেষণার পর পিয়ারসন আরও যুক্তি দিয়ে তার পূর্বসূরিদের তত্ত্বগুলোকে খণ্ডন করার চেষ্টা করেছেন। তার মতে,  মুদ্রার গায়ে যে প্রাকৃতিক ময়লা ছিল তা সিলিকা দিয়ে সিমেন্ট করা হয়। মুদ্রাগুলোর সব জায়গায় সিলিকার সূক্ষ্ম দাগ পাওয়া গেছে। মুদ্রার সোনা অবিকৃত রয়েছে। কিন্তু এর গায়ের ওপরে কাচের আবরণ শক্ত সিমেন্টের আকার পেয়েছে বা ফাটল হয়ে আটকে থাকে। আমরা এই নমুনাটিকে আসল মুদ্রার সঙ্গে তুলনা করে দেখেছি যে এটি হুবহু এক। আমি যতটা সম্ভব জোর দিয়ে বলব যে, এই মুদ্রাকে নকল করা যাবে না। কমপক্ষে এখন তা করা খুবই কঠিন হবে এবং সেই ১৮ শতকে কারও পক্ষে এই নকল করা একেবারেই কল্পনার বাইরে ছিল।

ট্রানসিলভেনিয়ার স্বীকৃতি

স্পন্সিয়ানের স্বর্ণমুদ্রাটি প্রথমে গ্লাসগোর হান্টেরিয়ান জাদুঘরের একটি আলমারিতে রাখা ছিল। কারণ তা নকল বলে ধারণা করা হয়েছিল সে সময়। বর্তমানে সবগুলো মুদ্রা গ্লাসগোর হান্টেরিয়ান জাদুঘরের প্রদর্শনী রয়েছে। মুদ্রাগুলো যে খাঁটি ছিল তা একসময় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন গবেষকরা। সেই সঙ্গে তারা এক হারিয়ে যাওয়া রোমান সম্রাটকেও আবিষ্কার করেন। এরপরই বিষয়টি নিয়ে গবেষকরা ট্রানসিলভেনিয়ার সিবিউয়ের ব্রুকেনথাল জাদুঘরের গবেষকদের সতর্কও করেছিলেন। এই জাদুঘরেই স্পন্সিয়ানের আরেকটি স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। ট্রানসিলভেনিয়ার হ্যাবসবার্গের গভর্নর ব্যারন স্যামুয়েল ভন ব্রুকেনথাল। যার উইলের একটি অংশ ছিল ওই স্বর্ণমুদ্রাটি। মৃত্যুর সময় ব্যারন তার মুদ্রাটি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। প্রচলিত আছে, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে তিনি একটি নোট লিখেছিলেন, যেখানে একটি মাত্র শব্দ বলা হয় ‘খাঁটি’। এর আগে অন্য সবার মতো ব্রুকেনথাল জাদুঘরের বিশেষজ্ঞরাও তাদের মুদ্রাটিকে ‘ঐতিহাসিকভাবে নকল’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। কিন্তু সবশেষ ব্রিটিশ গবেষণা দেখে তারা তাদের মত পাল্টেছেন। ব্রুকেনথাল জাদুঘরের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থাপক আলেকজান্দ্রু কনস্ট্যান্টিন চিতুতার মতে, এই আবিষ্কারের সঙ্গে ট্রানসিলভেনিয়া ও রোমানিয়ার ইতিহাসের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলেকজান্দ্রু কনস্ট্যান্টিন চিতুতা আরও বলেন, ‘ট্রানসিলভেনিয়া ও রোমানিয়ার ইতিহাসের জন্য এই গবেষণা বিশেষ তাৎপর্যবহ। তবে ইউরোপের ইতিহাসের জন্যও তা কম নয়। যদি এর ফলাফল বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে এর অর্থ হবে আমাদের ইতিহাসে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সংযোজন।’

কে ছিলেন স্পন্সিয়ান

একসময় তিনি ছিলেন ইতিহাসবিচ্যুত, শুধু এক কাল্পনিক চরিত্র! কিন্তু বর্তমানে গবেষকরা বিশ^াস করেন যে, স্পন্সিয়ার একজন সামরিক কমান্ডার ছিলেন। তার সময়ে রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দূরের রাজ্য ছিল ডেসিয়া। বহিঃশত্রুর হাত থেকে এই রাজ্যকে বাঁচাতে স্পন্সিয়ান নিজেই সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেছিলেন। প্রতœতাত্ত্বিকদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে ২৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে ডেসিয়াকে রোমান সাম্রাজ্য থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। তখন একটি মহামারী ও গৃহযুদ্ধের কারণে রোমান সাম্রাজ্য খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়। যার চারপাশ শত্রুরা ঘিরে ফেলায় রোম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো সাম্রাজ্য। সম্ভবত গৃহযুদ্ধকবলিত ও বিশৃঙ্খল সেই সময়ে স্পন্সিয়ান সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত লড়াই করেন যতক্ষণ পর্যন্ত না ডেসিয়ার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে এর সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া যায়।

জেসপার এরিকসনের তথ্য মতে, ২৭১ থেকে ২৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ডেসিয়াকে পুরোপুরি জনশূন্য করা হয়েছিল। হান্টেরিয়ান জাদুঘরের সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের এই তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘আমাদের ব্যাখ্যা হলো, তিনি ডেসিয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক ও বেসামরিক জনগণের জীবনরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। কারণ শত্রুরা তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। যার জন্য সবকিছু থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারা। আর তাই রাজ্যের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য তারা তাদের নিজস্ব মুদ্রা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’ এদিকে অধ্যাপক পিয়ারসন বলেন, ‘স্পন্সিয়ানের প্রতিকৃতি-খচিত মুদ্রাগুলোর কেন রোমের অন্য মুদ্রাগুলো থেকে আলাদা- তা এই তত্ত্বই ব্যাখ্যা করবে। তখন প্রকৃত সম্রাট কে, তা নাগরিকদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কারণ সে সময় গ্রহযুদ্ধ চলছিল। তখন রোমের ক্ষমতা একেবারেই হ্রাস পেয়েছিল। আর তাই তাদের প্রয়োজন ছিল একজন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের। তিনি এমন একসময়ে কমান্ডারের দায়িত্ব নেন, যখন রাজ্যের এমন নেতৃত্বের খুবই প্রয়োজন ছিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত