সহনশীলতার অভাব আমাদের জাতীয় জীবনে একটি বড় সংকট। সমাজে যেমন বিভক্তি বাড়ছে এবং একই সঙ্গে নানা পর্যায়ে ঘটছে সহিংসতার প্রকাশ। রাজনীতি থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্বকাপে দলীয় সমর্থন পর্যন্ত সবখানেই অসহনশীলতা। যদিও যে কোনো সমাজের অগ্রগতির পেছনের মুখ্য নিয়ামক সেই সমাজের সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। অগ্রগতি মানে শুধুমাত্র অবকাঠামোর উন্নয়ন না, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও নেতৃত্বগুণ ইত্যাদির উত্তরোত্তর বিকাশ। যা মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শেখে। আর এভাবেই সংস্কৃতির বিবর্তন, আর এর সঙ্গে নতুন নতুন অনুষঙ্গের সংযোগ ঘটে। সমাজের ধারাবাহিক উন্নয়নের পেছনে রয়েছে বৈচিত্র্যময় চর্চা এবং সেখান থেকে নতুন কিছু গ্রহণের প্রচেষ্টা। তবে এজন্য প্রয়োজন ভিন্ন পথ ও মতের প্রতি সহনশীলতা। একইসঙ্গে দরকার অন্যের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে না দেওয়ার চর্চা।
বৈচিত্র্য ও বিভক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিভক্তিপূর্ণ সমাজ বিদ্বেষে পরিপূর্ণ, তবে বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ এমনটি নয়। বিদ্বেষপূর্ণ সমাজে জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা নিঃসন্দেহে খন্ডিত। বিভাজিত সমাজে আমরা নিজস্ব রাজনৈতিক ধারা, ধর্ম, বিশ্বাস ও চর্চা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। এর মূল কারণ অন্যের রাজনীতি, বিশ্বাস ও চর্চায় আমাদের শ্রদ্ধার ঘাটতি। আর এ ধরনের চেষ্টা সমাজের মধ্যে সামাজিক পুঁজি তৈরিতে বাধা দেয়। অন্য কথায় এর ধারাবাহিকতাই হচ্ছে পশ্চাৎপদতা। আজকের এই পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যতগুলো সমাজ ও দেশকে আমরা ভঙ্গুর অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি তার জন্য দায়ী সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব, বিভক্তি ও সমাজের সব অংশকে সমমর্যদার আসনে বসাতে না পারা বা তাদের আস্থা অর্জন করতে না পারা। বিভক্তি ও বিভাজন থেকে ভালো কিছু অর্জনের কোনো সম্ভাবনা নেই, যদিও তা হয়, সেটা কেবলই গোষ্ঠীগত স্বার্থ আদায়ে প্রযোজ্য, সামষ্টিক অগ্রগতিতে নয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক উদ্ভাবন একদিকে সমস্যার সমাধান করে, জীবনকে সহজ করে এবং সমাজকে একত্র করতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এর আলোকেই সহজেই সমাজের পশ্চাৎপদতা ও অগ্রগতির মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আমাদের যে আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চাৎপদ, যা সমস্যার সমাধান করতে পারে না, বা সমগ্রকে ধারণ করার ক্ষেত্র তৈরিতে ব্যর্থ হয় তার বিপরীতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণই অগ্রগতি। বলাবাহুল্য এর অনেকগুলোই সময়ের বিবেচনায় ভবিষ্যতে পশ্চাৎপদ বিবেচিত হতে পারে বা হবে।
জনসংখ্যা কোনো দেশের সম্পদ তখনই যখন একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে তার শক্তি, সামর্থ্য ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়। বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও সক্ষমতা নিয়ে আমরা অনেক স্বপ্ন দেখি যদিও আমাদের দেশ এখন উন্নয়ন ও অগ্রগতির এক নতুন সন্ধিক্ষণে আছে। এখন পর্যন্ত আমাদের যতটুকু অগ্রগতি তার পেছনে রয়েছে জনগণের উদ্যম ও ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐক্য। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টারও যেন কোনো ঘাটতি নেই। বলাবাহুল্য এর পেছনে রয়েছে এমন এক ধরনের শক্তি যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজেদের প্রভাব বলয়কে শক্তিশালী করা। যদিও অবস্থা এমন যে, আজকের বাংলাদেশকে আমরা যেমন খুব সহজেই সমৃদ্ধির পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি তেমনি আবার একই সঙ্গে তাড়াতাড়ি খাদের কিনারায় নিয়ে যেতে পারি।
সামাজিক অগ্রগতির সন্ধান পেতে দরকার নতুন প্রজন্মকে সক্ষম করা, একইসঙ্গে তাদের এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তারা অগ্রগতিকে গ্রহণ করতে পারে। যদিও এর পেছনে বড় বাধা হচ্ছে তাদের মধ্যে বিভক্তির বীজ বপন করা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণে অভ্যস্ত করে তোলা। আমরা প্রায়ই দেখি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এক দলের সঙ্গে আরেক দলের সংঘাত তৈরি হয় এবং বিশ্বাসের বিভাজনের ভিত্তিতে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আবার এই ধরনের কর্মকাণ্ডে জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ব্যাপকভাবে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার লক্ষণীয়।
আজ বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের পরবর্তী লক্ষ্য উন্নত দেশের কাতারে শামিল হওয়া, রূপকল্প ২০৪১ অর্জন করা। এই উন্নত দেশ হওয়ার অন্যতম কৌশল হচ্ছে এদেশের যুব সমাজকে কাজে লাগানো। এখন বিশ্বকাপ চলছে। সারা দেশই বলতে গেলে হয় আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত। বিশ্ব মিডিয়ায় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নিয়ে আমাদের উন্মাদনা উঠে আসছে। অন্যদিকে এই নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানও দৃশ্যমান। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করায় দোষের কিছু নেই কিন্তু এ নিয়ে যে বাড়াবাড়ি সামনে উঠে আসে তা হলো আমরা কত অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকতে চাই। অন্যকে আপন করে নেওয়ার আমাদের সক্ষমতাও প্রবাদপ্রতিম। কিন্তু এর উল্টো পিঠেই মনে হয় এই আবেগটাকেই আমরা কেন শক্তিতে পরিণত করতে পারছি না, নিজেরাই বা কেন বিশ্বকাপে যেতে পারছি না?
আর এখানেই যুবজনগোষ্ঠীর সঠিক দিকনির্দেশনায় পরিচালনার ঘাটতিটা দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় সংকট প্রবল। অন্যদিকে অনেক সময়ই আমরা যুবদের ওপর আমাদের পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি যা কখনো কখনো ভেদাভেদ ও বিভাজন তৈরি করে। মনে রাখা প্রয়োজন পুরনো দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না, অধিকন্তু ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে পড়ে থাকতে হবে আর অন্যের অগ্রগতি দেখে তখন শুধু আফসোস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। যেমনটা এখনো করে থাকি মালয়েশিয়া, কোরিয়া ও ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশের অগ্রগতি দেখে। মনে রাখা প্রয়োজন সামাজিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য চাই সবার মৌলিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি। আর এটাই হচ্ছে জাতিসংঘ প্রতি বছর নভেম্বরে যে ‘বিশ্ব সহনশীলতা দিবস’ পালন করে তার মূল প্রতিপাদ্য।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
