‘আমি তো মরেই গেছি কবে, নেহাত মেসি ফিরেছিল ফুটবলে’

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১৬ এএম

লুসাইলে সেদিন বল হাতে এক পা দুই পা করে এগিয়ে আসছিলেন গনজালো মনটিয়েল। পেনালটি পয়েন্টে বল রাখলেন, রেফারির বাঁশি বেজে উঠল। শট নিয়ে হুগো লরিসকে পরাস্ত করে জালে জড়ালেন বল। তারপরই দিলেন ভোঁ দৌড়। সতীর্থরা এসে যোগ দিলেন। যেন উড়ছিলেন লিওনেল মেসি। কাতার বিশ্বকাপের শিরোপা যে জিতেছে আর্জেন্টিনা। চ্যাম্পিয়নের মুকুট উঠেছে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসির মাথায়। যে মেসি একাধিকবার ফুটবল থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসেছিলেন। আর তার ফিরে আসাতে ভক্তরা ফিরে পেয়েছেন প্রাণ, মেসি নিজের বেলায়ও তাই।

মেসির বুকটা এখন হালকা হওয়ারই কথা। যেন অনন্তকাল ধরে বিপুল অন্ধকারের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা পথের অবসান হলো। হ্যা অবসানই তো। ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। যেন দীর্ঘকাল পর বন্দীশালা থেকে মুক্তি মিললো। কত জন্ম পর আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা দেখবেন নতুন ভোর। আরব্য রজনীতে নতুন ইতিহাস লিখে ফুটবলের আসল স্বাদ পেলেন মেসি। আগে কখনও জীবনের এত স্বাদ হয়তো পাননি তিনি।

অথচ অভিমানে ফুটবল থেকে অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন মেসি। ২০১৬ সালে শতবর্ষী কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে পরাজিত হয়েছিল আর্জেন্টিনা। তার দুই বছর আগে বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছিল লিওনেল মেসির দল। সেই পাপ মোছনের উপলক্ষ্য ছিল সামনে। কিন্তু চিলির কাছেও হেরে যায় আলবিসেলিস্তেরা। সে ব্যথা সইতে না পেরে তিনি অভিমানে সরে যান ফুটবল থেকে, ঘোষণা করেন অবসরের।

তার অবসর ঘোষণার পর রীতিমতো আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পেলের মতো কিংবদন্তিরা তাকে সিদ্ধান্ত বদলানোর অনুরোধ করেছিলেন। আর্জেন্টিনার মানুষও বুয়েনস এইরেসের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন, মেসিকে আবারও আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফেরানোর দাবি নিয়ে। এমন অবিশ্বাস্য সমর্থনের পর কি মন না গলে পারে! হয়তো–বা সমর্থকদের এমন ভালোবাসা পেয়েই তিনি আবার ফিরে এসেছিলেন।

সেই সময় আর্জেন্টিনার শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা লা নাসিওন তখন এক প্রতিবেদনে মেসির ঘনিষ্ঠজনের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছিল, মেসি ফিরবেন। ২০১৮ বিশ্বকাপ তার ভাবনায় রয়েছে।

রাশিয়া বিশ্বকাপে বিশ্ব জয়ের লক্ষ্যে পা রেখেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু সেখানে উন্নীত হতে তাদের অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছিল। একটা পর্যায়ে মনে হয়েছিল তারা সেবার বিশ্বকাপই খেলতে পারবে না, তবে সেই শঙ্কা কাটিয়ে তারা রাশিয়ায় খেলতে আসে। তবে দুঃখের গল্পটা বাকি ছিল। সেই আসরে গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে পরাজয়ের পর মনে হয়েছিল শেষ ষোলোয় খেলা হবে না। সেই শঙ্কাও উড়িয়ে তারা রাউন্ড অব সিক্সটিনে তারা খেলে। তবে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেয়। শিরোপা জয় অধরাই থেকে যায়।

তাতে ফের অভিমান চেপে বসে মেসির মনে। তবে এবার আর অবসর ঘোষণা করেননি। নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি। আড়াল করে ফেলেন সবকিছু থেকে। গুঞ্জন ছিল অবসরের ঘোষণাও আসতে পারে। তবে সেবারও তিনি নেননি। এবার অবশ্য ত্রাতা হয়ে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার আরেক লিও। তিনি দলটির বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর স্কালোনিকে আর্জেন্টিনার কোচ করা হয়। সেই সময় মেসিকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন স্কালোনি। তিনি লিখেছিলেন, ‘লিও, আমি স্কালোনি। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’স্কালোনি কথা বলেন মেসির সঙ্গে। তাকে বোঝান কেন আর্জেন্টিনার তাকে প্রয়োজন। মেসিকে নিজের পরিকল্পনার কথা বলেন। মেসি ফিরে আসেন নীল-সাদা জার্সিতে। দলের আবহাওয়া পাল্টে দিয়েছেন স্কালোনি। মেসি চেয়েছিলেন কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ জিততে।

স্কালোনির এক কথাতে ফিরে আসা সেই মেসি ২০২১ সালে চুক্তি শেষ করেন বার্সেলোনার সঙ্গে। তাতে তিনি হয়ে যান একজন ফ্রি-অ্যাজেন্ট। আর সেই তকমা গায়ে মেখেই তিনি গত বছর জিতেছেন কোপা আমেরিকা। কোপা জয়ের পর তার উচ্ছাস ছিল বাঁধভাঙা। কারণ সেটাই যে তার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। এরপরই শুরু হয় বিশ্ব জয়েল মিশন।

সেই মিশনটা আর্জেন্টিনা শুরু করার আগে টানা ৩৬ ম্যাচ ছিল অপরাজিত। কিন্তু শুরুটা করেছিল সৌদি আরবের সঙ্গে পরাজয় দিয়ে। তারপর ফের গেল গেল রব উঠে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে লিওনেল মেসির দল ঘুরে দাঁড়ায়। ৩৬ ম্যাচ পর হারা দল টানা সব ম্যাচ জিতে ৩৬ বছর পর জয় করে নেয় বিশ্বকাপ।

ভাগ্যিস, সেদিন স্কালোনির বার্তায় সাড়া দিয়ে ফুটবলে ফিরেছিলেন মেসি। না হলে, আর্জেন্টিনার ভক্তদের আর মেসির হাতে শিরোপা দেখা হতো না। তাই এখন লিও ভক্তরা দেবদ্বীপের সুরে গাইতেই পারেন, ‘আমি তো মরেই গেছি কবে, নেহাত ও বেসেছিল ভালো।’ কথাটা ইষৎ পরিবর্তন করে নিয়ে বলাই যায়, ‘নেহাত মেসি ফিরেছিল ফুটবলে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত