ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে নিয়ম কি সবার জন্য সমান, নাকি মহাতারকাদের ক্ষেত্রে রেফারিদের চোখ কিছুটা এড়িয়ে যায়? ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে, তখন মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এই পুরোনো বিতর্কটিই আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
ম্যাচের প্রথম অর্ধে দারুণ এক গোল করে দলকে এগিয়ে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফ্লোরিয়ান বালোগুন যখন ৬৪ মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ছেন, তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে রেফারিংয়ের দ্বিমুখী নীতি। ফুটবলবিশ্ব এখন একই প্রশ্ন তুলছে—গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রায় হুবহু একই ফাউল করে লিওনেল মেসি যেখানে কোনো শাস্তিই পেলেন না, সেখানে বালোগুন কেন?
নাটকের সূত্রপাত ম্যাচের ৬২ মিনিটে। বসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সাথে বল দখলের লড়াইয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন বালোগুন। মুহারেমোভিচ বল ক্লিয়ার করার মুহূর্তে পেছন থেকে ছুটে আসা বালোগুনের ডান পা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসনিয়ান ডিফেন্ডারের গোড়ালির পেছনের অংশ মাড়িয়ে দেয়। ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস শুরুতে এটিকে ফাউল হিসেবেও গণ্য করেননি। কিন্তু দুই খেলোয়াড়ই চোট পেয়ে মাঠে পড়ে থাকলে খেলা সাময়িক বন্ধ থাকে এবং তখনই ভিএআর-এর হস্তক্ষেপে মাঠের পাশের মনিটর দেখে বালোগুনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। স্লো-মোশনে ফাউলটি যতটা ভয়াবহ দেখাচ্ছিল, স্বাভাবিক গতিতে তা ছিল নিতান্তই এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।
এই সিদ্ধান্তের পর পরই ফুটবল মহলে ওঠে গত ১৭ জুন কানসাস সিটিতে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের সেই বিতর্কিত ঘটনাটি। আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার ঈসা মান্দিকে বুটের তলা উঁচিয়ে প্রায় একই কায়দায় পায়ের পেছনের অংশ মাড়িয়ে দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা লাল কার্ডের তীব্র দাবি জানালেও পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়াক কেবল ফাউলের বাঁশি বাজিয়েই ক্ষান্ত হন, মেসিকে কোনো কার্ডই দেখাননি। এমনকি ভিএআর-ও তখন নীরব ছিল। সেই ম্যাচে পার পেয়ে গিয়ে মেসি পরে হ্যাটট্রিকও করেছিলেন।
রেফারিদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি মার্ক হ্যালসি বলেন, “মেসি নিশ্চিতভাবেই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা বিপন্ন করেছিলেন। বল তখন খেলার নাগালের বাইরে ছিল, তাই এটি সরাসরি হিংস্র আচরণ বা ইচ্ছাকৃত আঘাত হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত ছিল। আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম যে সেবার ভিএআর রেফারিকে মনিটর দেখার কোনো পরামর্শই দিল না।”
এদিকে বিবিসিতে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “ঠিক এই জায়গাগুলোতেই মানুষ ভিএআর নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সবাই নিয়মের একই প্রয়োগ দেখতে চায়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির সেই ট্যাকল আমাদের সবার মনে আছে। ওটা সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ ছিল, অথচ সেটি খতিয়েই দেখা হলো না। আর এখন বালোগুনের ট্যাকলটা দেখুন—ভিএআর মাঝে নাক গলাল এবং আচমকাই সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দেওয়া হলো। এই আলাদা নিয়মটাই সবচেয়ে হতাশাজনক।”
একই চ্যানেলে ইংল্যান্ড নারী ফুটবল দলের সাবেক স্ট্রাইকার সু স্মিথ ঘটনাটির ব্যাখ্যায় বলেন, “স্লো-মোশনে ফ্রেমটা যখন আটকে রাখা হয়, তখন আপনার মনে হতেই পারে এটা শতভাগ লাল কার্ড। কিন্তু স্বাভাবিক গতিতে দেখলে সিদ্ধান্তটা বড্ড বেশি কঠোর মনে হবে। দুর্ভাগ্যবশত ওর পা-টা ভুল জায়গায় পড়ে গেছে।”
ম্যাচ শেষে যুক্তরাষ্ট্রের আর্জেন্টাইন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো তার শিষ্যের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, “এটা কোনোভাবেই লাল কার্ড হতে পারে না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পা মাড়িয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই ওর ছিল না। এটি ফুটবলের একটি সাধারণ গতিশীল অ্যাকশন যা দুর্ঘটনাবশত ঘটে গেছে।” মেসির সেই ফাউলের প্রসঙ্গে টেনে আনা হলে পচেত্তিনো স্পষ্ট করে বলেন, “আমার চোখে দুটির কোনোটিই লাল কার্ড পাওয়ার মতো ফাউল ছিল না।”
২০০৬ সালের ফাইনালে জিনেদিন জিদানের সেই লাল কার্ডের পর বালোগুনই প্রথম খেলোয়াড়, যিনি বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে গোল করার পর লাল কার্ড দেখলেন। তবে জিদানের লাল কার্ড নিয়ে কোনো সংশয় না থাকলেও, বালোগুনের এই প্রস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল ধাক্কা। নিয়ম অনুযায়ী এই লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে আগামী মঙ্গলবার সিয়াটেলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেই হাইভোল্টেজ ম্যাচে নিজেদের সেরা গোলদাতাকে ছাড়াই মাঠে নামতে হবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে।