আইএমএফের ঋণ উত্তরণ না উৎপীড়ন

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:১৮ এএম

শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য আইএমএফের ঋণপ্রাপ্তি ঘটেছে, প্রথম কিস্তির অর্থও চলে এসেছে। বাংলাদেশ চেয়েছিল ৪.৫ বিলিয়ন ডলার; কিন্তু ঋণ প্রদানকারী সংস্থার নির্বাহী বোর্ড অনুমোদন করেছে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার। এ যেন বন্দুকের জন্য দরখাস্ত করে কামান পাওয়ার মতো অবস্থা। এজন্য অর্থমন্ত্রী তার অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও আইএমএফের সংশ্লিষ্ট নির্বাহীদের অত্যন্ত পুলকিত বদনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। দেশ যে এখনো খাদে পড়ে যায়নি, দেশের ঋণমান যে এখনো দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির এই ঋণ অনুমোদন তার এক উজ্জ্বল প্রতিভাস হিসেবে বিবেচনায় নিলে এই পুলক অনুভব অযৌক্তিক কিছু নয়।এতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আরও অর্থ ধার করার ক্ষেত্র প্রসারিত হলো; সেসব ক্ষেত্রে অল্প আলোচনাতেই ঋণের প্রয়োজনীয়তা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে উপসংহারে উপনীত হওয়া যাবে। 

৪২ মাসে ছাড়যোগ্য ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের এই ঋণ তিনটি প্যাকেজে বিভক্ত : ক) Extended Credit Facility, EDF, খ) Extended Fund Facility, EFF এবং গ) Resilience and Sustainable Facility, RSF। ঋণের প্রথমোক্ত অংশটি সুদমুক্ত; সাড়ে ৫ বছর পারিতোষিক কালসহ পরবর্তী ১০ বছরে পরিশোধযোগ্য। দ্বিতীয়াংশে উল্লিখিত অংশটিও ১০ বছরে পরিশোধযোগ্য, তবে পারিতোষিক কাল সাড়ে ৩ বছর। আর শেষাংশে উল্লিখিত নতুন অংশটির পরিমাণ ১.৪ বিলিয়ন ডলার যা ২০ বছরে পরিশোধযোগ্য, আর পারিতোষিক কাল ১০ বছর। সুদযোগ্য ঋণাংশে সুদ মাত্র ২.২ শতাংশ। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে এত স্বল্প সুদে এরকম দীর্ঘ সময়ের জন্য এই রকম ঋণ পাওয়াটা দেশের জন্য অবশ্যই একটা বড় অর্জন। তবে এই ঋণ দেশের ক্রমাবনতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ও অস্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনীতিকে কতটা স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়, সেটা দেখার বিষয়। কারণ, দেশের চাহিদার তুলনায় এই ঋণের পরিমাণ তেমন কিছু নয়; দেশের প্রায় ২ মাসের রেমিট্যান্সের প্রায় সমপরিমাণ। তদুপরি এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নানা শর্ত, যেগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। 

ঋণ প্রদানের জন্য আইএমএফ নাকি অন্তত ৩০টিরও বেশি শর্ত আরোপ করেছে, কিন্তু সেগুলো কী কী, এখনো তা স্পষ্ট নয়। তবে গণমাধ্যমের লেখালেখি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য হারে কমানো,  ব্যাংকের মন্দঋণ ১০ শতাংশে নামানো, রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে করনীতি ও কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাঠামোগত সংস্কার সাধন, আর্থিক খাতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালীকরণ, সামাজিক, উন্নয়ন ও জলবায়ু খাতে টেকসই বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, মানবসম্পদ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, মুদ্রা বিনিময় ও সুদ হার মূল্য বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হিসাব পদ্ধতি সংশোধন করা, বৈদেশিক মুদ্রার নিট স্থিতি অন্যূন ২৪.৪ বিলিয়ন ডলারে বজায় রাখা, পুঁজিবাজারের বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে উন্নয়নে অর্থের টেকসই জোগান বৃদ্ধি করা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয় করা প্রভৃতি।

আইএমএফের শর্তের মধ্যে কোনো গোপনীয়তা আছে কি না, থাকলে তাতে দেশের স্বার্থবিরোধী কিছু আছে কি না, তা আমরা এখনো জানি না। তবে যেসব শর্ত ও সংস্কারের কথা জনসমক্ষে এসেছে, সেগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য সময়োপযোগী নয় এমন কথা বোধ করি কেউ বলবেন না। দেশীয় অর্থনীতিবিদরা এই জাতীয় সংস্কারের কথা অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন। কিন্তু তা করা হয়নি। কারণ, সংস্কার সময়সাপেক্ষ ও পীড়নদায়ী। এজন্য এর বিরুদ্ধে সমাজে ও অর্থনীতিতে নানা প্রতিরোধ ও প্রতিবন্ধকতা থাকে, থাকে অনেক অজনপ্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের ঝুঁকি। সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী দিল্লির এক সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক কিছু বৈপ্লবিক সংস্কার কাজে হাত দেন। কিন্তু সভাসদের অসহযোগিতায় ব্যর্থ হয়ে এই অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটি জনসাধারণের কাছে পাগলরূপে প্রতিভাত হয়ে আছেন। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, আমলাতন্ত্রের বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার অভাব এবং দুর্নীতি এই ব্যর্থতার প্রধান কারণ। তবে দূরদর্শী ও দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বে দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মীবাহিনী দিয়ে এই পর্বতসম প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করা অসাধ্যও কিছু নয়।

ইতিমধ্যে পাহাড়সম ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; দফায় দফায় সমন্বয় করা হচ্ছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম। সারের মূল্যও বাড়ানো হয়েছে। ভর্তুকি আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছানোর পথে অন্যতম বাধা। তবে সব ভর্তুকিকে একতরফাভাবে নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে দেশে এখন পর্যন্ত অবশ্য উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। তবে এর প্রভাব পরিদৃষ্ট হচ্ছে পণ্য ও সেবার মূল্যে; নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির ছোবলে সীমিত আয়ের মানুষ নাকাল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের সুরক্ষা দিতে প্রয়োজন আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ন। সেটা করা না গেলে সমস্যার স্থানান্তর ঘটবে মাত্র, সমাধান হবে না।

দ্রুত প্রবৃদ্ধির এই দেশ ধনিক শ্রেণির উত্থানে বিশ্বে অগ্রবর্তী হলেও রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন কেন, তা এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন বটে। এদেশে ধনিক শ্রেণি ও বড় বড় করপোরেট হাউজ তাদের প্রদেয় কর কমই দেয়; কর বেশি দেয় সাধারণ মানুষ, ধনীরা কর এড়াতে এবং করভার নিচের দিকে স্থানান্তরে সিদ্ধহস্ত। দেশে এত মাল্টিবিলিয়নিয়ার তৈরি হওয়া সত্ত্বেও এখনো অন্যতম সেরা করদাতা জর্দা বিক্রেতা কাউস মিয়া। পাকিস্তান আমল থেকে তার এই তকমা। এখন আইএমএফের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রাজস্ব বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রভাবশালী কর ফাঁকিবাজদের যদি বাগে আনতে পারে, সেটা হবে একটা কাজের কাজ। সেটা করতে সফল না হয়ে তারা যদি মরিয়া হয়ে রাজস্ব বাড়াতে বাঁধা গরুর মতো নিয়মিত কর প্রদানকারীদের ওপর চড়াও হন, তবে সেটা হবে এক মুরগি দুই বার জবাই করার সমান। তাতে সমাজে অসন্তোষ বাড়বে, কর আদায় কমবে, আর বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে।

খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও আইনের নিরাসক্ত প্রয়োগ। এর জন্য শুধু ঋণের টাকায় গড়া সম্পত্তি অধিগ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে না, দোষীকে জেলে পর্যন্ত ভরতে হবে। আইএমএফের কল্যাণে যদি সেটা সম্ভব হয়, তবে তা হবে স্মার্ট বাংলাদেশে সুশাসনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখন দেশের ব্যাংকিং জগতের সংস্কৃতিতে কলমের খোঁচায় মন্দঋণের পরিমাণ ১০ শতাংশেরও নিচে কমিয়ে আনা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী সংসদে ২০ জন সর্বোচ্চ ঋণখেলাপির যে ফিরিস্তি প্রকাশ করেছেন, তার মধ্যে অনেক রাঘব-বোয়ালের টিকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উদার হস্তে বণ্টিত পুনঃতফসিলীকরণ সুবিধার বদৌলতে তারা গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় হয়তো এমনটি ঘটেছে। এই একই কায়দায় কলমের খোঁচায় শর্ত পালনের জন্য খেলাপি ঋণের হার যদি ১০  শতাংশের নিচে প্রদর্শন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাতে নিয়ম রক্ষা হয়তো হবে, কিন্তু অবস্থার কোনো ইতরবিশেষ হবে না।

একই ভাবে অন্যান্য শর্তে যাই থাকুক না কেন, সেগুলো মূলত বাজার অর্থনীতির চিরাচরিত সূত্র থেকে উৎসারিত। কিন্তু দেশে ব্যবসায়ীরা রাজনীতির মাঠ জবরদখল করে ফেলায় নীতিনির্ধারণে তার অশুভ প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে; স্বার্থের সংঘাত অহরহ দেখা দিচ্ছে। ফলে এই সব সূত্রের কার্যকারিতা ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া কার্যকারিতা নির্ভর করছে দৃঢ় অঙ্গীকার, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং বাস্তবায়নকালে পীড়ন সহ্য করার ক্ষমতার ওপর। সব ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ আকাশচুম্বী। এসব অতিক্রম করেই কেবল সফলতা আনা সম্ভব।

তবে আইএমএফের শর্তগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় না আসায় অবাক হয়েছি। ধারণা করা হয় যে, এদেশ থেকে  প্রতি বছর গড়পড়তা ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাচার হয়ে যায়। পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য বাজেটে বিশেষ ব্যবস্থা রাখায় এর সত্যতা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু পাচার রোধ করার জন্য গৃহীত কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়। মাত্র ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ধারে পাওয়ার জন্য এত সব অজনপ্রিয় সংস্কার কাজের বোঝা ঘাড়ে নিয়েও পুলক বোধ, অথচ এর চেয়ে শতগুণ বেশি অর্থ দেশে আটকে রাখার জন্য তেমন কোনো গরজ নেই কেন সেটাও এক দুর্বোধ্য প্রশ্ন।

দেশের এক কোটিরও বেশি অদক্ষ শ্রমিক প্রবাসে নিদারুণ কায়িক শ্রমের বিনিময়ে বছরে ২০-২২ বিলিয়ন ডলার দেশে প্রেরণ করেন। অথচ এদেশে নয় দশ লাখ বিদেশি কর্মী কাজ করে বছরে ৫ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যান। উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার এই অপচয় পর্যায়ক্রমে রোধ করা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রেও তৎপড়তা লক্ষণীয় নয়।

আমদানিতে পর্যাপ্ত রক্ষণশীলতা সত্ত্বেও এই মুহূর্তে দেশে প্রতি মাসে চলতি হিসাবে যেখানে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেখানে এই ঋণে ৬ মাস অন্তর অন্তর আইএমএফ থেকে ৬০ কোটির কিছু বেশি ডলারপ্রাপ্তি নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। তবে এ ঋণের তাৎপর্য শুধু এর পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা উন্নয়ন সহযোগীদের একটা ইতিবাচক বার্তা দেবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সাময়িক পীড়ন সত্ত্বেও এর শর্তগুলোর সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়ন সামষ্টিক অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা আনতে সহায়তা করতে পারে। যে সব প্রয়োজনীয় সংস্কার স্বউদ্যোগে গ্রহণ করা যাচ্ছে না, আইএমএফের চাপে সেগুলো হয়ে গেলে তাকে অন্তত মন্দের ভালো বলাই যায়। তখন নিজস্ব উদ্যোগে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে আত্মনির্ভরশীল ও উদ্বৃত্ত হওয়ার পথ সহজতর হবে। সেই সঙ্গে অর্থ পাচাররোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারলে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে টনিকের কাজ করবে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের নিশ্চয়তা। এবারও আমরা আশাবাদী হতে চাই।

লেখকঃ খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত