ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোহাম্মদ রিজওয়ানের শুরুটা রঙিন ছিল না। প্রথম ফিফটির জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৬ ম্যাচ পর্যন্ত। তার মাঝে দল থেকে বাদ পড়েছেন একবার। ফিরেও ঝলক দেখাতে সময় নিয়েছেন। তবে সবশেষ দুই বছরে তিনি নিজেকে বদলে ফেলেছেন, নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। কিভাবে সেটা পারলেন তিনি, সেই রহস্য জানতে চাইলে ‘আল্লাহর ইচ্ছেতেই’ নিজেকে বদলে ফেলেছেন বলে দাবি করলেন এই পাকিস্তানি ক্রিকেটার।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে রিজওয়ানের অভিষেকের আট বছর পূর্ণ হবে এই এপ্রিলে। যার শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে। সিরিজের একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে একাদশে থাকলেও সুযোগ পাননি ব্যাটিংয়ের। তারপর টানা সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি। রান আসছিল, তবে ইনিংস বড় করতে পারছিলেন না। ফলস্বরুপ ২০১৬ সালে ইংল্যান্ড সিরিজ শেষে বাদ পড়তে হয় দল থেকে।
ফিরেছিলেন প্রায় আড়াই বছর পর। তবে প্রত্যাবর্তনটা সেভাবে রাঙাতে পারেননি। আরও এক বছর দলের সঙ্গে থাকলেও অনেক সময় সুযোগ পাননি একাদশে, একাদশে থাকলেও নামা হয়নি ব্যাটিংয়ে। ৮ ইনিংসে তাকে ব্যাটিংয়েই পাঠায়নি দল। নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে না পারাই তার জন্য যেন কাল হয়ে আসে।
ক্যারিয়ারের প্রথম ২৫ ম্যাচ খেলে তার রান ছিল মাত্র ২২৪। গড় ১০.৬৬, স্ট্রাইক রেট ৯৭.৮১। যা একজন টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানের কাছে মোটেই প্রত্যাশিত নয়। তাকে দিয়ে কিছু হবে না, এমন মন্তব্য শুরু হয়ে গিয়েছিল। আর ঠিক সেটাই যেন তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ক্যারিয়ারের ২৬তম ম্যাচে এসে নিজেকে বদলে ফেলেন তিনি। পেয়ে যান প্রথম অর্ধশতকের দেখা।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেদিন ৫৯ বলে ৮৯ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। দল জিতেছিল ৪ উইকেটে। তিনি হয়েছিলেন ম্যাচসেরা। তাতেই দমে যাননি। পরের ম্যাচেই তিনি পেয়ে যান ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে প্রথম শতকের দেখা।
সেই থেকে রিজওয়ানের ক্যারিয়ারের বাঁকবদল। একটা সময় যার গড় ছিল সাড়ে ১০, স্ট্রাইক রেট ছিল ১০০-এর নিচে। যাকে দিনের পর দিন খেলালেও ব্যাট হাতে নামতে দেখা যেত না, সেই রিজওয়ান এখন পাকিস্তানের অন্যতম ভরসার নাম। বর্তমানে তার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ সংখ্যা ৮০। ৬৯ ইনিংসে ব্যাট করে মোট রান করেছেন ২ হাজার ৬৩৫। তার গড় চোখ কপালে তুলবে। ৪৮.৭৯। স্ট্রাইক রেটটাও (১২৬.৬২) ঈর্ষনীয়। ২৩টি অর্ধশতকের সঙ্গে আছে ১টি শত রানের ইনিংসও।
শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে চলমান টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতেও আছে তার কদর। সেই কদরের অংশ হয়েই তিনি খেলতে এসেছেন বিপিএলে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার তিনি। সর্বোচ্চ পাঁচ রান সংগ্রাহকদের একজন তিনি। ১০ ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৫১ রান। আছে চারটি অর্ধশতক, এখানেও তার গড় ৫০.১৪। সর্বোচ্চ ৭৩ রানের ঝলমলে এক ইনিংস।
কিভাবে নিজেকে বদলে ফেললেন তিনি, কিভাবে তার এই উত্থান! সবশেষ ২-৩ বছরে ব্যাট হাতে এত সাফল্য কি করে পেলেন তিনি? তা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। বিপিএলে লিগ পর্বের শেষ ম্যাচেও তার ব্যাটিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের প্রতিনিধি হয়ে তিনি এসেছিলেন। সেখানেই তার কাছে জানতে চাওয়া এই বিষয় নিয়ে।
সবশেষ ২-৩ বছরে কিভাবে নিজেকে বদলে ফেলেছেন? গণমাধ্যমকর্মীদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ‘আমার ক্যারিয়ারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমি আল্লাহপাকের প্রতি বিশ্বাস রেখেছি। শুধু ক্রিকেটারই নয়, কঠিন সময় সবার জীবনেই আসে। আল্লাহর কাছে চেয়েছি এবং অপেক্ষা করেছি সঠিক সময়টার জন্য।’
রিজওয়ান যোগ করে বলেছেন, ‘আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। সেজন্য আমাদেরকে কঠিন সময়ের সম্মুখীন করেন। সেখান থেকেই আমরা অভিজ্ঞতা অর্জন করি। আমাকেও নিশ্চয়ই আল্লাহ অভিজ্ঞতা দিয়েছেন। তাই আজ তৃপ্ত কিছু ইনিংস খেলছি।’
রিজওয়ান তার পারফরম্যান্সটা ‘আল্লাহর ইচ্ছে’ জানিয়ে বলেন, ‘দুই বছর আগেও আমি ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। দলে সুযোগ পাইনি ঠিকই, তবে বসে ছিলাম না। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি, যেভাবে নিজের উন্নতি করা যায়, সেভাবে কাজ করেছি। তাছাড়া সবই আল্লাহর ইচ্ছে। তিনি আমাকে যেদিন সুযোগ দেন সেদিন আমি পারফরম করি। যেদিন সুযোগ দেন না, সেদিন আমি ব্যর্থ হই। তবে আমি আল্লাহর কাছে সবসময় চাই যেন ভালো পারফরম করি। আল্লাহ বলেছেন, তার কাছে চাইতে এবং কঠোর পরিশ্রম করতে। আমি আমার কাজটা করছি, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে।’
পারফরম্যান্স করলেই সবাই মনে রাখবে, নাহলে লোকে ভুলে যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে এজন্যই চাই, কারণ আমি জানি পারফরম করলে লোকে মনে রাখবে, নয়তো সবাই ভুলে যাবে। এবং একটা সময় আমি দলে জায়গা হারাবো। তাই আমি শুধু আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখি এবং কঠোর পরিশ্রম করে যাই।’
