সম্পর্কে সম্ভাবনা চ্যালেঞ্জ দুটোই আছে

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:০৯ এএম

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একাধিক অভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বাধা অতিক্রম করে নিজেদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দুই পক্ষ সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চায়। রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদারের অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গা সমস্যার মূল মিয়ানমারে এবং এ সংকট সমাধানে দেশটি বাংলাদেশকে সহযোগিতা করে যাবে। ঢাকা সফরে এসে এমন বার্তা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের বিশেষ উপদেষ্টা ডেরেক শোলে। এ ছাড়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) ইতিবাচক পরিবর্তনের বিষয়ে সাধুবাদ জানিয়ে টেকসই সংস্কারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে সফররত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল। তবে র‌্যাবকে একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য কার্যকরী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন বলেন, র‌্যাব ইতিমধ্যেই জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাউন্সেলর ডেরেক শোলের নেতৃত্বে সফররত সাত সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের আলাদা বৈঠকে এ আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র জানিয়েছে।

গতকাল বুধবার বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত যৌথ ব্রিফিংয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও ডেরেক শোলে। শোলে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাই। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ বছরের সম্পর্কের যে ধারাবাহিকতা, সেটিকে আরও এগিয়ে নিতে চাই, একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আমরা এ নিয়ে আশাবাদী।’

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা শোলে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক বাড়ছে। অনেক মার্কিন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং আমি এখন এসেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আমাদের খুব ভালো বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অনেক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি একসঙ্গে কাজ করার সমান সুযোগ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে উদারতা দেখিয়েছে তা অনুসরণীয়। বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে আসা এক মিলিয়নের বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা প্রতিদিন কাজ করছি, বাংলাদেশকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এ সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এবং বাংলাদেশের জন্য আমরা আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন বলেন, ‘উনি এসেছেন দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ভালো করার জন্য, শক্তিশালী করার জন্য। গত ৫০ বছরে আমাদের সম্পর্ক ভালো। কিন্তু এই সম্পর্ক আমরা আরও সামনে নিয়ে যেতে চাই, সলিডিফাই করতে চাই। আমেরিকা আমাদের সবচেয়ে বড় ইনভেস্টর। তারা সিঙ্গেল কান্ট্রি আমাদের গার্মেন্টসে, তারা প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য নেয়। আমরা এটা থেকে আরও ওপরে যেতে চাই। বাংলাদেশে নতুন গড়ে তোলা ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছি।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, প্রথম দিন থেকেই তারা রোহিঙ্গা বিষয়ে আমাদের সাহায্য করছে এবং করে যাচ্ছে। সিঙ্গেল কান্ট্রি, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা গ্রেটেস্ট কন্ট্রিবিউটর। তারাও আমাদের সঙ্গে একমত, রোহিঙ্গাদের জীবনমান আরও উন্নত করতে হবে, তাদের হৃদয়ে একটা হোপ দিতে হবে। তারা আমাদের সঙ্গে আছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাখাইনে নিরাপদ অঞ্চল (সেইফ জোন) প্রতিষ্ঠা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়েছি।’

আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে তারা জানতে চাননি। আমরা কীভাবে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করব, কীভাবে স্বাধীন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করেছি এবং ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা বানিয়েছি, এগুলো তাদের জানিয়েছি। বিএনপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে জ¦ালাও-পোড়াও এবং অগ্নিসন্ত্রাস ঘটিয়েছে তার একটি ডকুমেন্ট তাদের দিয়েছি।’

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ৫ ফেব্রুয়ারি ডেটা সুরক্ষা আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেন, এই আইনের কারণে দেশটির ২০০০-এরও বেশি কোম্পানি বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারে। বিশেষ উপদেষ্টা ডেরেক শোলের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে আলাপ হয়েছে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘না, এ বিষয়ে আলাপ হয়নি। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নিয়ে আলাপ হয়েছে। আমরা বলেছি যে এই আইনের যেখানে যেখানে প্রয়োজন আমরা সংশোধন করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলাপ হয়েছে। আমরা এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তাদের আহ্বান জানিয়েছি।’

বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ডেরেক শোলে। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে গতকাল প্রাতরাশ বৈঠক করেন। ডেরেক শোলের এ সফরের বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, যৌথ অগ্রাধিকার, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, মানবাধিকার, জলবায়ু, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলাপ হয়।

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এই সফর নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘র‌্যাবের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বৈঠকে আলাপ হয়েছে। র‌্যাবকে আরও শক্তিশালী এবং পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের সহায়তা চেয়েছি, বিশেষ করে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে।’

বিশেষ উপদেষ্টা ডেরেক শোলে বলেন, ‘বাংলাদেশ সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আমি সম্মানিত বোধ করছি যে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তির পরপরই আমি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফরে এসেছি। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব রয়েছে; যা কয়েক দশকের সহযোগিতা ও সমর্থনের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। আমরা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও যৌথ অগ্রাধিকারের অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক জোরদার করার অপেক্ষায় রয়েছি।’

ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস এ সফর নিয়ে এক বিবৃতিতে গতকাল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের কাউন্সেলর ডেরেক শোলে এবং স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক প্রতিনিধিদল ১৪-১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বাংলাদেশে থাকাকালে কাউন্সেলর শোলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে কাউন্সেলর শোলে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, মানবাধিকারের সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমনে সহযোগিতা ও একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার আমাদের উভয় দেশের জন্য আরও বেশি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মানবিক সহযোগিতার পূর্ণ সম্প্রসারণের পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে দৃঢ়বন্ধন গড়ে তোলার জন্য নিবেদিতভাবে কাজ করে চলেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত