চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পর হত্যার রহস্য উদঘাটন

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৪:২৯ এএম

মোহাম্মদ হাসান। কাজ করতেন গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় আসবাব তৈরির একটি কারখানায়। আট বছর আগে কারখানার ভেতর তাকে হত্যা করা হয়। থানায় মামলা হলে পুলিশ তদন্ত করে। এরপর তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ সংস্থাটিও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে আদালতকে জানায়, হাসানকে কে মেরেছে, তা শনাক্ত করা যায়নি। পরে আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করার নির্দেশ দেয়।

এক বছর তদন্ত করে পিবিআই মাদক সেবনে নিষেধ করায় এলাকার আট বখাটে মিলে তাকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর চেষ্টা করে। এমনকি ঘাতকরা এলাকায় প্রকাশ্য থেকে অপরাধ করলেও থানা পুলিশ ও সিআইডি তাদের কিছুই করেনি। ঘটনার মূল অভিযুক্তসহ তিনজনকে আইনের আওতায় এনেছে পিবিআই।

পিবিআই সূত্র জানায়, মো. হাসান (৪৫) খুনের ঘটনায় জড়িত আজিজুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির ওরফে রোমান ও জাফর ইকবালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা পেশাদার মাদক কারবারি এবং একাধিক মামলার আসামি। হত্যাকা-ে আটজন জড়িত। মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার জের ধরে অভিযুক্তরা ফার্নিচার কারখানার ভেতরেই হাসানকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়। ৫ বছর ৭ মাস থানা পুলিশ ও সিআইডি আসামি শনাক্ত না করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। ২০২১ সালে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। এরপর আদালতে সাক্ষ্য ও মামলায় বিভিন্ন আলামতের সূত্র ধরে জড়িতদের চিহ্নিত করে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ পরিদর্শক হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি রাতে টঙ্গীর দত্তপাড়ায় হাজি মো. মাঈন উদ্দিন মিয়ার আসবাব কারখানার পূর্ব পাশের কক্ষ থেকে হাসানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। হাসান ওই কারখানায় ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করতেন। খুনের পরের দিন তার ভাই মো. বাবু তালুকদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন রাত ৯টায় ওই ফার্নিচার কারখানায় হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তার কোনো খোঁজ না পেয়ে কারখানার মালিকসহ অন্যরা কারখানার ভেতর থেকে হাসানের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করেন। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদনে তার নাক, মুখ, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত ও ক্ষতের চিহ্ন থাকা ও রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ করে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, থানা পুলিশ ৩ বছর ২ মাস ২০ দিন তদন্ত করার পর ওই সময় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি সিআইডি গাজীপুরে ন্যস্ত করা হয়। ২০১৮ সালের ২ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিআইডি তদন্ত করে আসামি শনাক্ত করা যায়নি বলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। ২০২১ সালে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য গাজীপুরের পিবিআইকে নির্দেশ দেয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, গত সোমবার রাতভর গাজীপুর ও টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন মঙ্গলবার গ্রেপ্তার তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

যেভাবে খুন করা হয় : প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আজিজুল, রোমান ও জাফর জানায়, তারা টঙ্গীর বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবন করত। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে প্রায় ৮-১০ জনের একটি গ্রুপ ছিল। যারা টঙ্গী এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাদকের আড্ডা বসাত। সবাই মিলে মাদক সেবন করত। ২০১৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বিকেলে তারা আরও ৬-৭ জন সহযোগী মিলে হাসানের কর্মস্থল ওই আসবাব কারখানায় মাদক সেবনের জন্য যায়। হাসান ভেতরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এক মাস আগেও একই কারণে তাদের সঙ্গে হাসানের বাগ্্বিত-া হয়েছিল। পরে তারা কারখানায় ঢুকে হাসানকে গালিগালাজ করে এবং মাদক সেবন করতে শুরু করে। একপর্যায়ে হাসানকে মারপিট করতে থাকে। এ সময় তারা কারখানার ভেতরে থাকা স্ক্রু-ড্রাইভার, হাতুড়িসহ ফার্নিচার তৈরির অন্যান্য ধারালো সরঞ্জাম দিয়ে হাসানের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কোপায়। হাসপাতালের নেওয়ার পর তিনি মারা যান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত