‘করোনা’, সভ্যতার সামাজিক মহা-অভিঘাত

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:১৯ পিএম

পুঁজিবাদী বিজ্ঞান সভ্যতার ঔদ্ধত্যের বুকে প্রচণ্ড পদাঘাত হানল করোনাভাইরাস বা কভিড। একুশ শতকের মানবসভ্যতা ভুলেও কল্পনা করেনি, থরথর বুক কাঁপানো নিকষ অন্ধকার মৃত্যুর হুংকারের সামনে সে পতিত হবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসমান-ছোঁয়া সম্পদের পাহাড় নির্মাতা এবং ক্ষমতার মদেমত্ত ৫৬ ইঞ্চি বুকের পাটাওলাদের দুয়ার ঠেলে অন্দরমহলে ঢুকে যাবে কভিড, কে কবে ভেবেছে? লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনীতি। কভিড থামছে না। থামানো যাচ্ছে না। এ যেন অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া। ছুটছে তো ছুটছে পর্বত-সমুদ্র পেরিয়ে গোলার্ধেও, যেখানে রয়েছে মানব প্রজাতি নামক প্রাণী। পৃথিবীর হাজার-লাখো হেক্টর ভূমি দখল করছে আগুনতি গণকবর। গণদাহের অনির্বাণ আগুন ছুঁয়েছে নন-সেমেটিক ধর্মের দেশ, চীন-ভারতের মতো অপরাপর ভূখণ্ডে। সেমেটিক ধর্মানুসারীদের লাখ লাখ কঙ্কাল বাংলাদেশ-আমেরিকা-ব্রিটেন-আর্জেন্টিয়ার মাটির কবরে তৈরি করছে কঙ্কালের রাজ্য।

কী সংবাদ, মানবসভ্যতার ভাবলোক তথা মনোলোক আর সমাজ সম্পর্কের? সে এক অবিশ্বাস্য ভয়াবহ অবয়ব। বাঙালি আমজনতা শিখল নতুন কিছু ইংরেজি শব্দ। লকডাউন, স্যানিটাইজার, মাস্ক, সোশ্যাল ডিসটেনস ইত্যাদি। নতুন এক অচেনা জীবন। মুখে মাস্ক লাগিয়ে ছদ্মবেশ। ঘরে আটকা পড়ে গৃহবন্দি। মানুষের এমন শারীরিক পলায়ন আর আত্মপলায়ন কবে দেখেছেন মানুষ? রোগভয়, মৃত্যুভয় গণ-আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। যেন কিয়ামতকাল।

এমন অসম্মানের মৃত্যু কিংবা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা এবং আতঙ্ক, সে এক অভূতপূর্ব-অবিশ্বাস্য বিষয়। আদিম যুগেও মৃতদেহের প্রতি ভালোবাসা, ভক্তি, শ্রদ্ধা, সম্মান ছিল। ধর্মের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে, মৃতব্যক্তির প্রতি কিংবা লাশ বা মরদেহ বিধিবিধানের ভেতর দিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রচলন শুরু হয়। ধর্মে অবিশ্বাসী কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রেও জাতীয় পতাকা এবং পার্টির পতাকায় শবাধার আচ্ছাদিত করে গার্ড অব অনার সহকারে সৎকার করা হয়। আর করোনার মৃতদেহ? কুকুর-বেড়াল বা জন্তুর মতো টেনে-হিঁচড়ে মাটিচাপা দেওয়া হয়। কার লাশ যে কোথায় গেল, প্রিয়জনরা জানতেও পারে না। করোনায় মৃত মানুষ তো সম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগম নয় যে, তার কবর ঘিরে জগতের বিস্ময়কর স্থাপত্য ‘তাজমহল’ তৈরি হবে। একটি মৃত্যু প্রিয়জনদের কাছে ভালোবাসা আর করুণা কিংবা শোকের বদলে ঘৃণাভরা মহা-আতঙ্ক সৃষ্টি করে। জীবনের এমন অস্বীকৃতি, রোগ আর মৃত্যুর প্রতি এই প্রতিহিংসার ঘৃণা বড় বিস্ময় জাগায়।

বিশ্বের নগরগুলো কভিড রোগের স্বর্গরাজ্য। নগরসভ্যতার আবাসনগৃহ দখল করেছে ভাইরাসেরা। সমাজের বোঝা হয়ে অহেতুক বেঁচে থাকে বৃদ্ধরা, যাদের বুর্জোয়া সমাজ শখ করে ‘প্রবীণ নাগরিক’ বলে ডাকে, করোনার আক্রোশ তাদের প্রতিই অধিক। এই ঘাতক বাইরাস যাদের মোটেই সহ্য করে না তারা হচ্ছেন গরিব-দরিদ্র পুষ্টিহীন, রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ক্ষমতাশূন্য আমজনতা। জীবন যেমনি তাদের পদে পদে অসম্মান করেছে, মৃত্যুও তাই।

বেঁচে থাকলে নির্জনতার কবি, বিষন্নতার কবি জীবনানন্দ দাশ ও তার কবিতার খাতা বন্ধ করে রাখতেন। মহাযুদ্ধের নগর কলকাতার কারফিউ পড়া রাত দেখেছেন তিনি, দেখেননি করোনাভাইরাসের লকডাউনের কলকাতার রাত। সেকালে এত বিদ্যুতের আলোর দাপট ছিল না, ছিল না ট্রামলাইনের সিগন্যালের লাল-হলুদ-সবুজের আলোর চোখ। লকডাউনে পড়া বিশ্বের প্রতিটি দেশের রাজপথের নির্জনতা, স্তব্ধতা খানখান ভেঙে পড়ে দুঃসময়ের বুকে। আতঙ্ক বর্ষার জলের মতো থই থই করে মানুষের বুকের ভেতর, চোখের কর্র্নিয়ায়। যানবাহন আর মানুষশূন্য রাজপথের নির্জনতায় সিগন্যালের লাল-সবুজ-নানা বর্ণের আলো আচমকা জ¦লে আর নেভে। অতি প্রাকৃত-ভৌতিক এক দুনিয়া নেমে আসে শহরে অজানা মহাশূন্য থেকে।

এই যে সভ্যতার বাস্তবতাএর অভিঘাত, মানবজাতির মনোলোক এবং ভাবনার বিকাশের ভেতর দিয়ে আধুনিক সভ্যতায় পা রাখা সামাজিক চলমান জীবন পাল্টে কোথায় দাঁড়াবে? ভাবনায় পড়েছেন বিশে^র তাবড়-তাবড় মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী। সমাজে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অভিঘাত। মানুষের মনোলোকে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন জটিল উপসর্গ। সমাজবিজ্ঞানীরা আর মনোচিকিৎসা বিজ্ঞানীরা খেই পাচ্ছেন না।

চীনের যে গবেষণাগার থেকে ভাইরাসটির উদ্ভব বলে জনশ্রুতি (প্রমাণ হয়নি), তা বি স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থানুকূল্যে পরিচালিত। শুধু চীনা গবেষকই নন, মার্কিনি গবেষকরাও সেখানে কাজ করেন। তা ছাড়া ওষুধ-বাণিজ্য চালায় বিশে^র যেসব দেশ, তাদের বিজ্ঞানীরাও রয়েছেন সেখানে। ঠিক যেমনি রয়েছে বাংলাদেশ ঢাকার মহাখালীর আইসিডিডিআরবি বা কলেরা-উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস বলছে, বিশ্বে প্রথম ‘কলেরা’ নামে রোগের উদ্ভব বাংলাদেশের বরিশাল। মনে হয়, সেই স্মৃতিবাহী ঢাকার আন্তর্জাতিক কলেরা গবেষণা কেন্দ্রটি। কিংবদন্তি এই সুলতান মো. বিন তুঘলকের মৃত্যু ঘটেছিল আরব সাগরের ‘ইলিশ’ মাছ খেয়ে পেটের পীড়ায়।

করোনার অভিঘাতমানবজাতির সংস্কার, বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা এবং চিরকালের বিশ্বাসের ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনে চলেছে। মনের জগৎকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। অর্থনৈতিক শ্রেণিবিভাজনের ওপর একটার পর একটা ঢেউয়ের আঘাত হানছে। ধনীর জন্য যেমন ভ্যাকসিন নেই, দরিদ্রের জন্যও তাই। মহাপণ্ডিত কিংবা মহামূর্খ, সমান দাস করোনার কাছে।

লকডাউনের ফলে গৃহবন্দি মানুষ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। প্রথম দিকে তো দরজা-জানালা পর্যন্ত বন্ধ, এই বুঝি করোনা ঢুকে গেল ঘরে। এমনি করেই প্রতিদিনের কর্মময় পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন মানুষ। ধীরে ধীরে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে শারীরিক বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশি মানসিক বিচ্ছিন্নতাও ঘটতে থাকে। কর্মহীন মানুষ যেন জড়পদার্থে পরিণত হচ্ছেন। হাজার হাজার বছরের কর্মময় সাংস্কৃতিক অভ্যাসের যে ঐতিহ্য মানুষের মনোজগতে গড়ে উঠেছে, হঠাৎ তার থেমে যাওয়া যেন জীবনের বিপর্যয়। অবিরাম চোখের সামনে ঘরের আপনজনরা, বড় একঘেয়ে ঠেকে। টিভির পর্দা বা মোবাইল তো এর বিকল্প নয়। তাই বৃদ্ধি পাচ্ছে ডোমেস্টিক ভায়লেন্সি। সান্নিধ্যের নৈকট্যের ঘনঘটা আর ভালো লাগে না। পরস্পরের কাছে পারিবারিক সম্পর্কগুলো বড় বাসি মনে হয়। মনের অজান্তেই সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য চিড় ধরতে থাকে।

সোশ্যাল ডিসডেন্সস এমনটা মানতে গিয়ে পড়শি বা সহনাগরিক পরস্পর থেকে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন। কি জানি কার ভেতর রয়েছে ভাইরাস। মুখের মাস্ক বেয়ে হয়তো চলে আসবে আপন শরীরে। এভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে পরস্পর অবিশ্বাস। জীবনের প্রয়োজনে ওই যে রাস্তায় বের হওয়া, বাজার-ব্যাংকে যাওয়া, ওষুধের দোকানে পা ফেলা, সবখানেই ভয় আর সন্দেহ। শুধু কি তাই? পরমাত্মীয়ের দুয়ার পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন। নিষিদ্ধ দুয়ার। আমরা কী দেখলাম? উন্নত বিশ্ব তথা ইউরোপ-আমেরিকার  স্টাইল দ্রুতগতিতে ছড়িয়েছে করোনা। নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পরস্পর অভিব্যক্তি প্রকাশের যে ঐতিহ্য (যৌনতা ও চুম্বন) করোনা বিস্তারের অন্যতম কারণ। রক্ষণশীলতা এখানে জয়ী হলেও নারীমুক্তি বা নারী স্বাধীনতাকে তো অস্বীকার করা যায় না। মানুষের অধিকারকেও না।

দুঃখ, শোক, মৃত্যু মানুষকে ধর্মের দিকে ঠেলে দেয়। প্রাচীন মিথ বা গ্রিক পুরাণ এবং ভারতীয় পুরাণে দেব-দেবীদের উদ্ভবের আখ্যান পাই। জন্ম-মৃত্যু, শস্য, সমুদ্র, বৃষ্টি, আগুন, আকাশ, পাতাল এবং প্রতিটি রোগের এক-একজন দেবতা বা দেবীকে দেখতে পাই। প্রাচীন অসহায় মানুষের এভাবে ঈশ্বর কল্পনা ছাড়া অন্য গতি ছিল না। ভয় এবং দুঃখ থেকে মুক্তির জন্য দেব-দেবীর কল্পনা করেছেন মানুষ। বসন্ত রোগের দেবী, কলেরার দেবী, চর্মরোগ বা খোস-পাঁচড়ার দেবতাও রয়েছে। এই একুশ শতকে করোনাভাইরাস এসে পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া, শিক্ষাবঞ্চিত আদিবাসী কুসংস্কারাচ্ছন্ন কোনো কোনো জনগোষ্ঠী কিংবা নিম্নবর্গের হিন্দুদের মধ্যে নতুন এক দেবতার জন্ম দিয়েছে। তার নাম ‘করোনা দেবতা বা দেবী’। বেশ কয়েক জায়গায় এর কাল্পনিক মূর্তি বানিয়ে পূজাও হয়েছে। যারা এই করোনাভাইরাস দেবীর পূজা করেছেন তাদের বিশ্বাস প্রচলিত কোনো শক্তিমান দেব-দেবীর পক্ষেই ‘করোনা’ নামক ‘অসুর’কে হত্যা অসম্ভব। তাই করোনা দেবী এ যেন দেবীদুর্গা কর্তৃক তাসুর নিধনেরই বিকল্প রূপ কল্পনা।

প্রশ্ন হলোএমন ঘটনা কেন ঘটল? মানুষের কোন অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস আর অসহায়তা এর জন্য দায়ী? সে যা হোক, করোনাভাইরাস মানুষের আত্মবিশ্বাসের মূলে আঘাত হেনেছে। মানুষকে ভেঙে চূর্ণ করেছে, নিঃসহায় করেছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আশায় মানুষ দম বন্ধ করে আছে। আমাদের বিশ্বাস বিপুল প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে খুব তাড়াতাড়িই করোনাভাইরাসকে মানুষ প্রতিহত করবে। কিন্তু এর মহা-অভিঘাতের ফলে মানবসমাজ আর মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে বিরাট পরিবর্তন ঘটবে। পাল্টে যাবে স্টাইল, জীবন ও জগৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখবেন মানুষ। ভাঙবে পুরনো জীবন দর্শন, নতুন করে জীবনের নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে নিতে হবে সভ্যতাকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত