জীবন বাঁচে অর্থমূল্যে

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:২২ পিএম

প্রবল চাপের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি। অর্থনৈতিক মন্দা গ্রাস করছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে। বিশেষ করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা নাজুক। আর অনুন্নত এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্বল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চিত্র কেমন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘ডলার’ যখন বিশ্ববাজারের নিয়ন্ত্রক, তখন এর পতন সরাসরি আঘাত হানে- অর্থনীতিতে। কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে, ‘আমদানি-রপ্তানি’ নিয়ন্ত্রিত হয় ডলারের মাধ্যমে। সেই ডলারের যখন ঘাটতি দেখা দেয়, স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তৈরি করে অর্থনৈতিক কৌশল। জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই কৌশলের বিকল্প নেই। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কৌশলেই আর কাজ হয় না। বাধ্য হয়ে সরকারকে অনেক কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তবে ডলারের চাপ যখন একটি দেশের জনগণের চিকিৎসাব্যবস্থায় সরাসরি আঘাত করে, তখন বিষয়টি দুশ্চিন্তার হয় বৈকি!

গতকাল দেশ রূপান্তরের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘ডলারের চাপ চিকিৎসা সরঞ্জামেও’ শিরোনামের সংবাদের মাধ্যমে জানা যায় হার্টের রিং, ভালভ ও শিশু হার্ট রোগীদের ডিভাইস ক্লোজার, অস্ত্রোপচারের জায়গা সেলাইয়ের সুতা, এক্স-রে, এমআরআই ও সিটিস্ক্যানের ফিল্ম, ইসিজি রোলসহ বেশ কিছু চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট দেখা দিয়েছে। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকে প্রয়োজন অনুযায়ী এলসি খুলতে পারছেন না চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিকারকরা। ফলে গত চার মাসে এসব পণ্যের আমদানি ৪০-৫০ শতাংশ কমেছে। এদিকে আমদানিকারকদের কাছে থাকা মজুদও শেষ হয়ে আসছে। চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

সংবাদে আরও জানা যায়, সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে হার্টের রিং, ভালভ ও শিশু হার্ট রোগীদের ডিভাইস ক্লোজার, অস্ত্রোপচারের জায়গা সেলাইয়ের সুতা, এক্স-রে, এমআরআই ও সিটিস্ক্যানের ফিল্ম, ইসিজি রোল, আল্ট্রাসনো পেপার, ডায়াবেটিস মাপার স্ট্রিপস, ব্লাড ও ইউরিন ব্যাগ, ডায়ালাইজার, হ্যান্ড গ্লাভস, অক্সিজেনেটর মেশিন, স্পাইনাল কর্ড নিডল, ডায়াগনোসিস কেমিক্যাল ও মেডিকেল-বর্জ্য পরিশোধনের ডিসপোজিবল সরঞ্জামাদির। এর মধ্যে আবার কিছু কিছু পণ্য আমদানি একেবারেই বন্ধ রয়েছে।

এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সিঙ্গাপুর ও জাপানের মানসম্পন্ন জেএমএস ও ট্রেমো ব্লাড ব্যাগ পাচ্ছি না। প্রতি মাসে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ ব্যাগ লাগে। ট্রিপল ব্যাগ লাগে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার। সরবরাহকারীরা আগে যে পরিমাণ ব্যাগ দিত এখন দিতে পারছে না। এখন যে ব্যাগ আছে তা দিয়ে এক থেকে দেড় মাস চলবে।’ বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুজ্জামান বলেন, ‘এলসির অভাবে গড়ে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামাদির আমদানি ৪০ শতাংশ কমেছে। আমরা যে ব্যাংকে এলসি করি, সেই ব্যাংক থেকে বলা হচ্ছে, এত টাকার এলসি করার অনুমতি নেই। আরও কম আনেন। যেখানে আমরা ১ লাখ ডলারের এলসি করতাম, এখন করছি ২০-২৫ ডলারের এলসি। ফলে আমদানিও কম করতে হচ্ছে।’ বাংলাদেশ সার্জিক্যাল মেডিকেল ডিভাইস অ্যাসোসিয়েশনের ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, ‘জানুয়ারি থেকে কিছু কিছু এলসি খোলা যাচ্ছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এ ছাড়া আমদানিকারকদের চাহিদা অনুপাতে যেন ঔষধ প্রশাসন পণ্য আমদানিতে অনুমতি দেয়, সরকারকে সেটাও দেখতে হবে।’

মানুষ রোগাক্রান্ত হবেন। তারা চিকিৎসকের কাছে ও হাসপাতালে যাবেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অপারেশনের পর সুস্থ হয়ে উঠবেন। মধ্যবর্তী সময়ে চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তার কোনো আতঙ্কের কারণ ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, সাধারণ রোগীর দুশ্চিন্তা আরও বাড়ছে। ডলার সংকটের কারণে, এভাবে এলসি কমতে থাকলে চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি আরও বাড়বে। তখন ভবিষ্যৎ কী হবে, তা ভাবলেও শরীর হিম হয়ে আসে! দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করছি, কেটে যাবে ডলার সংকট। চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে, এলসি করতে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। সাধারণ মানুষ যেন চিকিৎসাসেবা পেতে দুর্যোগের মুখোমুখি না হন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত