রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আদালতের দুয়ারে ১৯ বছর

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৪৩ এএম

১৯ বছর আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে একই পরিবারের ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়। সেই ঘটনায় করা মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। ৫৭ সাক্ষীর মধ্যে জবানবন্দি দেওয়া বাকি আছে ৩৪ জনের। আসামিদের মধ্যে ২০-২২ জন গ্রেপ্তার হলেও এখন জামিনে আছেন। গ্রেপ্তার করা যায়নি অন্তত ১৫ জনকে।

এ অবস্থায় মামলার বাদী বিমল শীলের প্রশ্ন, তিনি আদালতের দুয়ারে ঘুরতে ঘুরতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দোষীদের শাস্তি দেখে মরতে চান।

২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর গ্রামে তেজেন্দ্র লাল শীলের ঘরের বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ‘গান পাউডার ছড়িয়ে’ আগুনে পুড়িয়ে নারী-শিশুসহ ১১ জনকে হত্যা করা হয়। তারা হলো তেজেন্দ্র লাল শীল (৭০), তার স্ত্রী বকুল শীল (৬০), ছেলে অনিল শীল (৪০), অনিলের স্ত্রী স্মৃতি শীল (৩২), অনিলের তিন সন্তান রুমি শীল (১২), সোনিয়া শীল (৭) ও চার দিন বয়সী কার্তিক শীল, তেজেন্দ্র শীলের ভাইয়ের মেয়ে বাবুটি শীল (২৫), প্রসাদী শীল (১৭), অ্যানি শীল (৭) এবং কক্সবাজার থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয় দেবেন্দ্র শীল (৭২)।

এ ঘটনার পরদিন বাঁশখালী থানায় ৩৮ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা হয়। প্রধান আসামি করা হয় স্থানীয় কালিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুর রহমানকে। তিনি ওই সময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

জানা গেছে, সাত তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে অষ্টম তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার হ্লা চিং প্রু ২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি আদালতে তিনটি ধারায় অভিযোগপত্র দেন। এ অভিযোগপত্রে কালিয়াপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়। যদিও আগের তিনটি অভিযোগপত্রে তার নাম রাখা হয়নি। ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ডাকাতির উদ্দেশ্যে অগ্নিসংযোগ, খুন ও লুটতরাজের অভিযোগে ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটিতে সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হত্যাকা-ের নতুন অভিযোগ আনে। ওই বছরের ১৯ এপ্রিল নতুন করে ওই ধারায় ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়। ২০১২ সালের ১২ মে চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওই বছরের ২ অক্টোবর মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়। নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় ২০১৩ সালের নভেম্বর আবার তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটি ফেরত আসে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। ২০১৯ সালের ২৩ জুন এ নির্দেশনার পর পেরিয়ে গেছে তিন বছরের বেশি সময়। নিষ্পত্তি তো দূরের কথা, মামলায় ৫৭ জন সাক্ষীর অর্ধেকেরই সাক্ষ্য শেষ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। উচ্চ আদালতের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেও বিচারকাজ শেষ হয়নি। ফলে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মামলার বাদী বিমল শীল।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকসহ ৩৪ সাক্ষীকে হাজির করার জন্য পরোয়ানা জারি করেন। মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ ৬ মার্চ সাক্ষীদের হাজির করতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক এইচএম শফিকুল ইসলাম।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ২৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকি আছে ৩৪ জন। তবে এতজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন মামলার বাদী বিমল শীল। তিনি বলেন, ‘সাক্ষ্য দেওয়া ২৩ জনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীও আছেন। ৫৭ জন সবার সাক্ষীর সাক্ষ্য তো প্রয়োজন নেই। কারণ আসামিদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আছে। বিমল বলেন, ছয় মাস পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল মামলার ধার্য তারিখ। কবে সাক্ষ্য শেষ হবে? আর কখন রায় হবে?’ তিনি বলেন, ‘আদালতে ঘুরতে ঘুরতে হার্টের অসুখ হয়ে গেছে। জেলা আদালতে এ পর্যন্ত চারজন পাবলিক প্রসিকিউটর বদল হয়েছে। কারও মধ্যে যেন আন্তরিকতা দেখছি না। সবাই শুধু আশ^স্ত করে যাচ্ছেন। আদালত সমন জারি করলেও পুলিশ বলছে পাইনি। জঘন্যতম এ হত্যাকান্ডে জড়িতদের শাস্তি দেখে আমি মরতে চাই।’

বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত কেন হচ্ছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শেখ ইফতেখার সাইমুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মামলায় তিনটি চার্জশিট আছে। কিছু সাক্ষীর নাম দিয়েছেন বাদী। সাক্ষীরা আদালতে না আসার কারণে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। তবে বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। সাক্ষীদের আগামী ধার্য (৬ মার্চ) তারিখে হাজির করার জন্য পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। সাক্ষীদের হাজির করাতে সামাজিক উদ্যোগ নিতে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদারের সঙ্গে কথা বলেছি। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ নেতা অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্তের সঙ্গে কথা বলব।’

সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা প্রসঙ্গে বাঁশখালী থানার ওসি কামাল উদ্দীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই থানায় আমি দায়িত্ব নিয়েছি এক বছর আগে। থানায় সমন আসার পর মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির করানোর জন্য আমরা সচেষ্ট আছি। ১১ জনকে পুড়িয়ে মারার মামলায় সাক্ষীদের বিরুদ্ধে আদালত পরোয়ানা জারি করেছেন বলে গণমাধ্যমের সুত্রে জেনেছি। পরোয়ানাগুলো থানায় এলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত