ছুটির দিনে পাঠকের জোয়ার

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০২:৪৪ এএম

সাপ্তাহিক ছুটির দিনে লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও দর্শনার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল অমর একুশের বইমেলা। গতকাল শুক্রবার শিশুপ্রহর নির্ধারিত থাকায় সকাল থেকেই সব বয়সী বইপ্রেমীদের ঢল ছিল মেলায়। ১১টায় মেলা দর্শনাথীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। মেলার দুয়ার খোলার আগে থেকেই শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে প্রবেশপথে। সকাল থেকেই খুদে বইপ্রেমীদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল মেলা প্রাঙ্গণ।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই মেলায় পাঠক-দর্শনার্থীর সমাগম ছিল চোখে পড়ার মতো। শাহবাগ থেকে টিএসসি হয়ে দোয়েল চত্বর আর গোটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যেন মানুষের মেলা বসেছিল। বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ছিল উপচেপড়া ভিড়। দুপুরের পর দল বেঁধে ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে বইপ্রেমীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন মেলায়। এ দিন মেলার প্রায় প্রতিটি স্টলে সব বয়সী দর্শনার্থী ও ক্রেতার উপস্থিতি দেখা যায়। কেউ বই কিনছেন আবার কেউ নতুন বই দেখেছেন। আবার অনেকেই বিভিন্ন স্টলের সামনে লেখকদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত ছিলেন অনেক তরুণ-তরুণী। এদিকে সকালের দিকটা ছিল শিশু-কিশোরদের আনাগোনায় মুখরিত। আর বিকেল থেকে রাত অবধি সময়টা ছিল বড়দের। এ সময়টাতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

মেলায় ঘুরতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অতসী সেন বলেন, ‘এই কয়েক দিন ব্যস্ততার কারণে মেলায় আসতে পারিনি। আজ ছুটির দিনে মেলায় এলাম। কয়েকটি নতুন বই কিনেছি। তবে প্রচুর ভিড় আজকে মেলায়। অবশ্য এত মানুষ দেখেও ভালো লাগছে।’

প্রকাশকরা জানিয়েছেন, এবারের মেলা অন্যবারের চেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও পরিপাটি। পাঠকরা মেলায় এসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। কয়েক দিনের তুলনায় আজ প্রচুর মানুষে এসেছে। বইয়ের বিক্রি অনেক ভালো হয়েছে। তবে একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে বই বিক্রি আরও বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।

নতুন বই : গতকাল ছিল বইমেলার ১৭তম দিন। মেলা শুরু হয় বেলা ১১টায়, চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় নতুন বই এসেছে ২৭৬টি। মেলায় বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত ছিল শিশুপ্রহর।

শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : সকাল ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ক-শাখায় প্রথম হয়েছে আরোহী বর্ণমালা, দ্বিতীয় হয়েছে অংকিতা সাহা রুদ্র এবং তৃতীয় হয়েছে জুমানা হোসেন। খ-শাখায় প্রথম হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ, দ্বিতীয় হয়েছে আনিশা আমিন এবং তৃতীয় হয়েছে অদ্রিতা ভদ্র এবং গ-শাখায় প্রথম হয়েছে আদিবা সুলতানা, দ্বিতীয় হয়েছে তাজকিয়া তাহরীম শাশা এবং তৃতীয় হয়েছে সিমরিন শাহিন রূপকথা। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ার, দেওয়ান সাঈদুল হাসান এবং ড. শাহদাৎ হোসেন নিপু। প্রধান অতিথি ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী প্রজ্ঞা লাবণী।

আলোচনা অনুষ্ঠান : বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হয় জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশ নেন অনিরুদ্ধ কাহালি ও মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আকরম হোসেন।

প্রাবন্ধিক বলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তার সমকালীন জাতীয়তাবাদী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। যে তিনটি প্রধান উপন্যাস তিনি রেখে গেছেন, সেগুলোর মুখ্য অন্বেষা দেশ, দেশের সামগ্রিক চিত্র এবং পারিবারিক-সামাজিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির সূক্ষ্মতর বিশ্লেষণ। শুধু তা-ই নয়, এমন উপন্যাসও তার রয়েছে, যেখানে পাওয়া যায় দৈশিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিশদ চিত্র। ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসের চরিত্র, সংলাপ, কাহিনী এবং বর্ণনার অন্তরালে নিহিত থাকে অন্তর্বাস্তবের এমন ইঙ্গিত, যা কখনো প্রত্যক্ষ এবং কখনো প্রতীকী।

আলোচকরা বলেন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ তার সমকালীন সমাজচিত্র ও মানবচরিত্রকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই মানবজীবনের অনিশ্চয়তা, ভয়, অস্তিত্বের সংকট সবকিছুই তার রচনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর বর্ণনাশৈলী ও ভাষা উপস্থাপনা বিশেষভাবেই স্বতন্ত্র। বাংলা সাহিত্যের গল্প, উপন্যাস ও নাটক প্রতিটি ক্ষেত্রেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সৃষ্টিকর্ম যেমন ক্রমান্বয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, তেমনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ হয়ে উঠছেন আরও বেশি সমসাময়িক।

সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ আকরম হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকে বিচার করা এখন সময়ের দাবি। তার সাহিত্য-বিশ্লেষণে তত্ত্বের শৈল্পিক ও নান্দনিক ব্যবহারের দিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। 

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন ফরিদ আহমদ দুলাল, ফেরদৌস নাহার, তপন বাগচী, জাহিদ মুস্তাফা, আফরোজা সোমা এবং আশরাফ জুয়েল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী সুকান্ত গুপ্ত, রুবিনা আজাদ এবং মো. শওকত আলী। এ ছাড়া ছিল ফরিদ আহমদ দুলাল রচিত এবং নাট্যাঙ্গন নাট্যপরিবার নিবেদিত নাটক ‘উন্মোচন রহস্য’ এবং রুবিনা আজাদের পরিচালনায় ‘উদয় দিগঙ্গন’-এর শিল্পীদের পরিবেশনা।

আজকের সূচি : আজ ৫ ফাল্গুন ১৪২৯/১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ শনিবার। অমর একুশে বইমেলার ১৮তম দিন। মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।

শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : আজ সকাল ১০টায় বইমেলার মূলমঞ্চে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।

আলোচনা অনুষ্ঠান : বিকেল ৪টায় বইমেলার মূলমঞ্চে হবে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন গোলাম মুস্তাফা। আলোচনায় অংশ নেবেন মোহিত কামাল ও রাজীব কুমার সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সুব্রত বড়ুয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত