দ্বৈত অবস্থানে ফের প্রশ্নবিদ্ধ সালাউদ্দিন

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:২৭ এএম

১৭ ফেব্রুয়ারি দেশ রূপান্তরের অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিল ‘গোপনে ফিফা সদর দপ্তরে কেন সোহাগ?’ এ নিয়ে সরব হয়ে ওঠে ফুটবল অঙ্গন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কেনাকাটায় অসংগতি, ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ত্রুটিপূর্ণ অডিট রিপোর্ট নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই তদন্তে নেমেছে ফিফা। বেশকিছু অসংগতিও পেয়েছে তারা। এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শোকজ পাওয়া সোহাগ ও অর্থ বিভাগের সহকারী অনুপম সরকারকে তলব করে ফিফা। ব্যাখ্যা দেওয়ার সুবিধার্থে বাফুফের আরও দুই নির্বাহী জাবের বিন তাহের আনসারী ও হাসান মাহমুদকে সঙ্গী করেন সোহাগ। জুরিখে তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন এক আইনজীবীও। তবে চার নির্বাহীর এই সফর নিয়ে চরম গোপনীয়তার পথে হাঁটতে গিয়েও পারেনি বাফুফে। তাদের গোপন সফর দেশ রূপান্তরে ফাঁস হয়ে যায়। যদিও তাদের সফরের বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছিলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। তবে সোহাগরা ফিরে আসার পরের দিন সংবাদ মাধ্যম ডেকে সালাউদ্দিন বুঝিয়ে দিলেন এই সফর সম্পর্কে ভালোই জানা তার। চার নির্বাহীর এটি একান্ত ব্যক্তগত সফর দাবি করলেন প্রথমে, আবার তাদের সঙ্গী হওয়া আইনজীবীর বৃত্তান্তও মুখস্থ বলে দিলেন সালাউদ্দিন নিজেই। অভিযুক্ত সাধারণ সম্পাদককে পাশে বসিয়ে তিনি একবার দাবি করলেন, এটা অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, এর সঙ্গে বাফুফে বা তার কোনো সংযোগ নেই। আবার পরক্ষণেই তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেন। এরকম দ্বৈত অবস্থানে সালাউদ্দিন আরেকবার প্রশ্নবিদ্ধ হলেন।

সালাউদ্দিনের মধ্যে এখন এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু হলেই আগ বাড়িয়ে সংবাদমাধ্যমকে ডেকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের একটা চেষ্টা থাকে তার মধ্যে। আবার আস্থাভাজন হওয়ায় বাফুফে সাধারণ সম্পাদকসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগ্রহও নেই তার। সালাউদ্দিন বলেন, ‘ফিফা কেন তাদের ডেকেছে, তা আমার জানা নেই। কখনো জানতেও চাইনি। যেহেতু ফিফা বিষয়টি অতি গোপনীয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তাই ওরা কেউ বাধ্যও নয় আমাকে কিছু বলার। যেচে জানতে চাইলে দেখা যাবে আমাকেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে ফিফার।’ তিনি যোগ করেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত চলছে, তাদের কেউ যদি দোষী প্রমাণিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তারা অভিযুক্ত প্রমাণিত হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তো আমার কিছু করার নেই। আর যে বিষয়গুলো আমার জানাই নেই, সে বিষয়ে আমি কীভাবে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করব।’

অভিযুক্ত সোহাগ ও অনুপমের সঙ্গী হয়ে যাওয়া জাবের ও হাসান মাহমুদ কেন গিয়েছেন? প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন সোহাগ, ‘নির্বাহী প্রধান হিসেবে তিনজনের ছুটির অনুমোদন আমি দিয়েছি। আর সভাপতি আমার ছুটির অনুমোদন দিয়েছেন। আমরা নিজ খরচায় জুরিখে গিয়েছিলাম। যেহেতু কিছু ফাইল তৈরির ক্ষেত্রে অন্যরা যুক্ত ছিল, তাই তারা তাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়েছে।’ যারা অভিযুক্ত নন, তাদের কী দায় পড়েছে নিজ খরচায় জুরিখ গিয়ে বিপদ ডেকে আনার? এই প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন বলে ওঠেন, ‘তাদের যাওয়া-আসার খরচা কেউ একজন বহন করেছে।’ সেই কেউ একজন কে? সেটা অবশ্য বলেননি বাফুফের প্রধান।

আলোচনায় উঠে এসেছিল জেমি ডে’র বেতন বকেয়ার ব্যাপারে ফিফার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও। ফিফা সাফ জানিয়েছে, জেমির বেতন সুদসহ পরিশোধ না করলে ফিফা ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের একটা অংশ স্থগিত করে দিবে। ফিফা প্লেয়ার স্ট্যাটাস কমিটির এই সিদ্ধান্ত অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশও করা হয়েছে। অথচ সালাউদ্দিন জানালেন, এরকম কোনো সিদ্ধান্ত তারা জানা নেই। জেমির বেতন সময়মতো পরিশোধ করলে অন্তত সুদের অঙ্কটা দিতে হতো না। সালাউদ্দিন এক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে দায় চাপালেন সরকারের ওপর, ‘আমার কাছে টাকা থাকলে তো তখনই দিয়ে দিতাম। সরকারের কাছে আমরা একটা প্রকল্প জমা দিয়েছিলাম। সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে যাওয়ায় আমাদের আর্থিক সংকটে পড়তে হয়েছে।’

ফিফার সন্দেহের তালিকায় থাকা বাফুফের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আবু হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আছেন। হিসাবে অসংগতির মূল দায়টা সালাউদ্দিন চাইলেন আবু হোসেনের ওপর চাপাতে। এই বিতর্কিত নির্বাহীকে আগেই চাকরিচ্যুত করা উচিত ছিল, তবে ফাইন্যান্স কমিটির প্রধান ও বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদীর কারণে সেটা করা যায়নি দাবি করেছেন সালাউদ্দিন, ‘আমি সালামকে বলেছিলাম, তোমাকে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিলাম, তুমি যাকে ইচ্ছে তাকে চাকরিচ্যুত করতে পার। কিন্তু সে তা করেনি।’ সালাম এই অভিযোগ শুনে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘আমি আমার ছেলেকে আমার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বানিয়েছি। অনেক স্বাধীনতা দিয়েছি, তবে চেক সাইন করার অধিকার দেইনি। তার মানে কী দাঁড়াল? আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে তো আগেই আমি ব্যবস্থা নিতাম। সেটা পারিনি বলে তার ওপর একজন পর্যবেক্ষক বসিয়ে দিয়েছিলাম।’ ফিফায় কী কথা হচ্ছে, না হচ্ছে, সালাউদ্দিন দাবি করেছেন সেটা তাকে জানানো হয় না। তাতেই একটা সন্দেহ দানা বাঁধছে; তবে কি ফিফা সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে! বাফুফে সভাপতিকে বাইরে রেখে হয়তো তার ব্যাপারেই জানার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে সোহাগদের। ফিফার এই নড়েচড়ে বসায় সালাউদ্দিনও কি পারবেন সুরক্ষিত থাকতে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত