রাস্তায় ফোন নিয়ে কাউকে হেঁটে যেতে দেখলে এখন শিউরে ওঠেন যিনি, তিনি মোবাইল ফোনের জনক মার্টিন কুপার। তবে মার্কিন এই প্রকৌশলী এটিও বিশ^াস করেন যে, পাঁচ দশক আগে তৈরি করা ছোট্ট এই ডিভাইসটি দিয়েই একদিন অসুস্থতা জয় করবে মানুষ। লিখেছেন নাসরিন শওকত
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মার্কিন প্রকৌশলী মার্টিন কুপারকে বলা হয় বেতার যোগাযোগ শিল্পের পথিকৃৎ। তিনি রেডিও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনারও একজন বিশেষজ্ঞ। নিজেকে স্বপ্নচারী হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন এই প্রকৌশলী। ১৯২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ইহুদি এক অভিবাসী পরিবারে জন্ম নেন কুপার। তার বাবা-মা ইউক্রেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ১৯৯১ সালে টেলিযোগাযোগ শিল্পের উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও উদ্ভাবক আর্লেন জয় হ্যারিসকে বিয়ে করেন কুপার। আর্লেন তার ব্যবসার অংশীদারও। কুপার ও তার স্ত্রী আর্লেন যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য টেলিযোগাযোগ কোম্পানির সহপ্রতিষ্ঠা।
১৯৫০ সালে ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কুপার। কোরিয়ান যুদ্ধের সময় ডুবোজাহাজে কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন তিনি। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সেই যুদ্ধ চলে। ১৯৫৭ সালে কুপার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। ২০০৪ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কিন কুপারকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি দেওয়া হয়। স্নাতকোত্তর পড়ার আগেই শিকাগোর প্রযুক্তি সংস্থা টেলিটাইপ করপোরেশনে যোগ দেন তিনি। পরে ১৯৫৪ সালে সেখান থেকে পদত্যাগ করে ইলিনয়ের মোবাইল প্রস্তুতকারী সংস্থা মটোরোলায় যোগ দেন। এখানে কাজ করার সময়ই শিকাগো পুলিশের জন্য বিশেষ ধরনের ‘রেডিও যন্ত্র’ তৈরি করেন কুপার। হাতে ধরা ওই যন্ত্রের মাধ্যমেই পুলিশকর্মীরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন। এর ফলে দুষ্কৃতি ধরা অনেক সহজ হয় পুলিশের পক্ষে। সত্তর দশকের শুরুতে মটোরোলায় যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান হন কুপার। এরপরই হাত দেন মোবাইল তৈরির কাজে।
১৯৭৩ সালে মার্কিন প্রকৌশলী কুপারই বিশে^র প্রথম বহনযোগ্য ও হাতে ধরা একটি টেলিফোন (সেলফোন) তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে। ৫০ বছর আগের আবিষ্কার করা সেই মোবাইলটি দেখতে মোটেও আজকের স্মার্ট ফোনের মতো ছিল না। দীর্ঘ এক অ্যান্টিনাসহ ইটের সমান আকারের বড়সড় একটি ডিভাইস ছিল সেটি।
পরবর্তী এক দশক দলকে সঙ্গে নিয়ে এই ফোনকে আরও উন্নত করার কাজ করেন তিনি। গাড়িতে রাখা ফোন থেকে আরও উন্নত এই ফোন ১৯৮৩ সালে বাজারজাত করে মটোরোলা। এদিকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের ক্ষেত্রে খুব সহজেই যোগাযোগ করা ও বহন করার সুবিধা থাকায় কুপারের আবিষ্কার করা মোবাইল ফোন ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। তাই তাকে ‘মোবাইল ফোনের জনক’ বলা হয়।
আজ নিজের সৃষ্টি সেই মোবাইলের যথেচ্ছ ব্যবহারে নিয়ে বিরক্ত ও হতাশ মোবাইলের এই জনক। তাই এখন আক্ষেপ শোনা যায় তার কণ্ঠে। যদিও স্বপ্নবাজ এই প্রকৌশলী মনে করেন, আবিষ্কার এখানেই থেমে থাকবে না। যোগাযোগের জন্য তৈরি হবে আরও উন্নতমানের যন্ত্র, যা হাতে ধরতে হবে না।
কঠিন যাত্রা
কুপারের মোবাইল আবিষ্কারের পথটি মোটেও সহজ ছিল না। তখন গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখেই কঠিন এই পথে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। ডিক ট্রেসির রেডিও হাতঘড়ি কুপারের মনোযোগ কাড়ে প্রথমে। মার্কিন ট্যাবলয়েড ‘ডেট্রয়েট মিররের’ জনপ্রিয় কমিক চরিত্র ছিল ‘ডিক ট্রেসি’। ১৯৪০-এর দশকের তুখোড় গোয়েন্দা ট্রেসি তার রেডিও (দ্বিমুখী যোগাযোগ করার যায়) হাতঘড়ি ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত হয়েছিল। ঘড়িটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে সে সময় থেকে কয়েক দশক এগিয়ে ছিল। ট্রেসির সেই রেডিও ঘড়ির অনুপ্রেরণা থেকেই মোবাইল ফোন আবিষ্কারের নেশা পেয়ে বসে কুপারকে। সে সময় তিনি মটোরোলায় প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন।
সময়টা ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল নিউ ইয়র্কের মটোরোলার দপ্তর থেকে হাতে ধরা ওই টেলিফোন থেকেই প্রথম পাবলিক কল করেন কুপার। মাত্র পাঁচ মাস আগে তার দল প্রাথমিক ওই টেলিফোনের মডেলটির নকশা করেছিল। মোবাইল তৈরি নিয়ে তখন বাজারে দারুণ প্রতিযোগিতা ছিল। এই প্রতিযোগিতায় আরও গতি আনতে কুপার তখন ডাইনা-ট্যাক মডেল ব্যবহার করেছিলেন, যার ওজন ছিল ২.৫ পাউন্ড (১ কিলোগ্রামেরও বেশি) ও লম্বায় ১১ ইঞ্চি।
সেদিন মার্টিন কুপার মটোরোলার দপ্তর থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এটিঅ্যান্ডটির দপ্তরে ফোন করে জোয়েল অ্যাঞ্জেলের সঙ্গে ২৫ মিনিট কথা বলেন। বিশে^র প্রথম মোবাইল ফোনে কুপার তখন জোয়েলকে বলেছিলেন, ‘আমি মার্টিন কুপার বলছি। আমি একটা হাতে ধরা ফোনে কথা বলছি। এটি একটি সেলফোন, ব্যক্তিগত, এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া যায়, হাতে ধরে রাখা যায়।’ এই ফোন করার মধ্য দিয়ে কুপার সেদিন যোগাযোগ প্রযুক্তির বিশ্বে নতুন এক ইতিহাস গড়েন। তখন প্রথম ফোন আবিষ্কারের রোমাঞ্চের পাশাপাশি উদ্বেগও কম ছিল না তার। পাঁচ দশক আগের সেই দিনের কথা স্মরণ করে কুপার বলেন, ‘ওই দিন শুধু একটি বিষয় নিয়েই আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, শেষ পর্যন্ত এটি কাজ করব তো? এবং তা কাজও করেছিল।’ সেদিনের ওই কলটি মোবাইল বিপ্লবের সূচনা ঘটায়। পরের দশকের পুরোটা সময় কুপার ডিভাইসটির বাণিজ্যিক সংস্কারণ বাজারে আনার কাজে ব্যয় করেন। পাশাপাশি বেতার যোগাযোগশিল্প চালু করতেও সহায়তা করেন তিনি। তার সে সময়ের কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবেই আজ প্রযুক্তি বিশ্বে বিপ্লব ঘটেছে।
তবে কুপারের মোবাইল আবিষ্কারের আগেই এর ভাবনা মানুষের মাথায় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ হয়েছে মাত্র। ১৯৬০-এর দশকের সেই সময়ে প্রথমবারের মতো গাড়িতে ফোন রাখার ব্যবস্থা চালু করে একটি সংস্থা। কিন্তু তা তেমন সফলতা পায়নি। কারণ সেই ফোনের সঙ্গে গাড়িতে বিশাল ব্যাটারি রাখতে হতো। এই সমস্যা কুপারকে নতুন ভাবনায় ফেলে দেয়। তার মনে হয়, লোকজন সব সময় কেন সঙ্গে ফোন রাখতে পারছে না। এই ভাবনা থেকেই ১৯৭২ সালের শেষ দিকে কুপার সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করবেন, যা সব সময় সঙ্গে রাখা যাবে এবং যেকোনো জায়গায় ব্যবহার করা যাবে। এ নিয়ে টানা তিন মাস গবেষণা করেন তিনি। অবশেষে ১৯৭৩ সালের মার্চের শেষদিকে কুপার ও তার মটোরোলার দল সফল হয়। কুপারের তৈরি করা প্রথম মোবাইল ফোনটিতে সর্বোচ্চ ২৫ মিনিট কথা বলা যেত।
সৃষ্টি নিয়ে বিরক্ত
মোবাইলের জনক কুপার এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ডেল মারেতে নিজের দপ্তরে কাজ করেন। সেখানে বসে সংবাদ মাধ্যম এএফপিকে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এ সময় মোবাইল আসক্তি নিয়ে নিজের হতাশার কথা তুলে ধরে এই প্রকৌশলী বলেছেন, ‘যখন মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে কাউকে রাস্তা পার হতে দেখি, তখন মন ভেঙে যায়। মনে হয়, পুরোমাত্রায় হতবুদ্ধ হয়ে গেছে এরা। হয়তো পারাপারের সময় কেউ যদি কখনো গাড়ির ধাক্কায় ছিটকে পড়ে মারা যান, তবেই হয়তো হুঁশ ফিরবে এদের।’
মোবাইলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা কুপার এই শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়েও শঙ্কিত। বিশেষ করে গোপনীয়তার বিষয় ও শিশুদের স্মার্ট ফোন ব্যবহারের বিষয় তাকে ভাবায় বেশি। ভাবতেও পারেননি, নিজের তৈরি করা সাধের এই যন্ত্র এতটা ক্ষতি করবে মানুষের।
এখন সবার মতোই কুপারও নিজের সৃষ্টি নিয়ে বীতশ্রদ্ধ। বিশেষ করে মোবাইলের ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দ্রুত ক্ষতিকর কন্টেন্ট ছড়িয়ে পড়া নিয়ে তার আক্ষেপের শেষ নেই। কারণ এতে একদিকে এই কোমলমতিরা ইন্টারনেট আসক্তির সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে, আর অন্যদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা হারানোর আশঙ্কা। সমাজের ওপর নিজের আবিষ্কারের নেতিবাচক এই প্রভাব যারপরনাই হতাশ করেছে তাকে।
গত মাসের শেষ সপ্তাহে স্পেনের রাজধানী বার্সেলোনায় মোবাইল ওয়ার্ল্ডের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত চারদিনের ওই কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় সম্মেলন কেন্দ্রে। বিশে^র মোবাইল প্রযুক্তি শিল্পের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী এই বাণিজ্য সম্মেলনে প্রথম বাণিজ্যিক মোবাইল ফোনের জনক হিসেবে মার্টিন কুপারকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়। এ সময় তিনি বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এই আবিষ্কার নিয়ে আমার নিজস্ব গুরুতর নেতিবাচক একটি মতামত রয়েছে। আর সেটি হলো, আজ আমাদের কোনো গোপনীয়তাই নেই। কারণ আমাদের সবকিছুই এখন কোথাও না কোথাও রেকর্ড করা হচ্ছে। আর যার কাছে এই রেকর্ডের মূল্য বেশি, সে তা পেয়েও যাচ্ছে সহজেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘লোকজন এভাবে সারা দিন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে, এমন হবে ভাবিনি!’ তার নিজের সৃষ্টির প্রতি মানুষের বিধ্বংসী এই মোহ তাকে আনন্দ তো দেয়ই না বরং উদ্বিগ্ন করে তোলে।
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
মোবাইলের জনক কুপার বলেছেন, তিনি আধুনিক স্মার্টফোনের নানা আকার, প্লাস্টিকের ব্লক , এর মেটাল বা গ্লাস নিয়ে মোটেও ‘আত্মহারা নন’। তিনি মনে করেন, এই মোহও একদিন কেটে যাবে। বাজারে আসবে আরও আধুনিক যোগাযোগের যন্ত্র। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ফোনগুলো এমনভাবে বিবর্তিত হবে, যাতে সেগুলো আপনার শরীরের সঙ্গে স্থাপন করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সেন্সরের কথা উল্লেখ করেন। সম্ভবত শরীরে থাকা এই সেন্সরই ‘সারাক্ষণ আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে।’ তিনি এমন একটি ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করেছেন, যেখানে ফোন চার্জের জন্য ব্যাটারির পরিবর্তে মানুষের শরীরের শক্তিই ব্যবহার হবে।
তার ভাষ্য মতে, ‘আপনার শরীরই হলো চার্জার। আপনি যখন খাবার খান, তা থেকে আপনার শরীর শক্তি তৈরি করে।’ সেই শক্তিই হবে মোবাইলের শক্তির উৎস। তবে কুপার আশ্বাস দিয়েছেন, এ ধরনের চার্জের জন্য শরীরের খুব বেশি শক্তিক্ষয় হবে না। সামান্য শক্তিই নিজের জন্য সংগ্রহ করে নেবে সেই আধুনিক মোবাইল।
কুপার মনে করেন, সম্প্রতি মোবাইল আধুনিক করার জন্য তেমন বিশেষ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়নি। তার মতে, মানুষের মাথার আকৃতি গোলাকার। মোবাইল যন্ত্রটি মসৃণ তলবিশিষ্ট আয়তাকার। তাই যখন তা কানে ধরা হয়, তখন বেশ অসুবিধায় পড়তে হয় সবাইকে। তবে এ নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও মোবাইল ফোনের নকশা ও এর সক্ষমতা কতটা এগিয়েছে তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। স্বপ্নবাজ এই প্রকৌশলীর বিশ্বাস, একুশ শতকের প্রযুক্তির বিস্ময়কর এই আবিষ্কার এখানেই থেমে থাকবে না। সম্ভাবনাময় সেই আগামীতে এই মোবাইলের মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো সেবায় ঘটবে অভূতপূর্ব সাফল্য। সেদিন কুপার আরও বলেছিলেন, ‘মোবাইল ফোন, চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং ইন্টারনেট- প্রযুক্তির শক্তিশালী এই তিন মাধ্যমের সহায়তায় অদূর ভবিষ্যতে আমরা রোগকেও জয় করতে যাচ্ছি।’
বিস্ময়কর শোনালেও, নিজের ফোন ব্যবহার সম্পর্কে কুপার জানান, যখন তিনি রাতের খাবার খেতে টেবিলে বসেন, তখন শুধু মেইল চেক করা ও অনলাইনে তথ্য ঘাঁটার কাজে মোবাইল ব্যবহার করেন। টিকটক কী তা জানেন না মোবাইল ফোনের এই জনক।