আমদানিকৃত জ্বালানি তেল জাহাজ থেকে দ্রুত, নিরাপদে খালাস করার জন্য দেশে প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্রে চালু হচ্ছে ডাবল পাইপলাইনের ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম)। ব্যয় সাশ্রয়ী প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পটি চালু হলে বছরে হাজার কোটি টাকা ব্যয় সাশ্রয় হবে বলে এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।
তিনি বলেছেন, জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনা সাশ্রয়ী ও টেকসই করতে এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েট মুরিং) কার্যকরি অবদান রাখবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি তেল বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে করে রিফাইনারি ট্যাংকে পৌঁছাতে সময় লাগে ১১-১২ দিন। এসপিএম চালু হলে সমপরিমাণ তেল পরিবহনে সময় লাগবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। এতে ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি সিস্টেম লস কমবে।
দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের চাহিদাপূরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে নভেম্বরে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। তিন বছরের মধ্যে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিলতায় কয়েক দফা প্রকল্প সংশোধনের পর মেয়াদও বাড়ানো হয়। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার কোটি টাকায়।
সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক সভায় প্রকল্পের অগ্রগতি বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানে ইআরএল'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ লোকমান জানান, আগামী জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হবে। এ সময় জ্বালানি বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ খায়েরুজ্জামান মজুমদার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ দেন।
প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিমে (বঙ্গোপসাগরে) একটি এসপিএম তথা ভাসমান জেটি স্থাপন করা হয়েছে। আমদানিকৃত তেল জাহাজ থেকে সরাসরি পাম্প করা হবে যা এসপিএম হয়ে অফশোর (সাগরের তলদেশে স্থাপিত) পাইপলাইনের মাধ্যমে মাতারবাড়ি এলটিই (ল্যান্ড র্টামিনাল ইন্ড) পর্যন্ত এবং সেখান থেকে অনশোর বা ভূমিতে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় নির্মিত স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে। এসপিএম হতে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের ২টি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আনলোডিং করা হবে। স্টোরেজ ট্যাংক থেকে পাম্পিং এর মাধ্যমে তেল প্রথমে অনশোর ও পরবর্তীতে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্রগ্রামে অবস্থিত গহিরা এলটিই পর্যন্ত এসে পুনরায় অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) এর ভেতর দিয়ে ডাংগারচর পর্যন্ত এসে কর্ণফুলী নদী এইচডিডি এর মাধ্যমে ক্রস করে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভেতর দিয়ে ইআরএল-এ পাঠানো হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্য কম (৮-১৪ মি.) হওয়ায় মাদার অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো সরাসরি খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মাদার অয়েল ট্যাঙ্কারগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট ছোট লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাস করা হয়। এভাবে ১১ দিনে একটি ১০০,০০০ ডিডব্লিউটি ট্যাঙ্কার খালাস করা হয়। সমুদ্র উত্তাল হলে কিংবা অন্যান্য কারণে কখনো কখনো এই তেল খালাস করতে আরও সময় বেশি লাগে। নতুন এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সময় লাগবে মাত্র ২ দিন।
কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের আওতায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইনে পাশাপাশি ৯০ একর জায়গাজুড়ে তেল মজুতের ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের তেল মজুত সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভৌত অবকাঠামোর নির্মাণ শেষ, এখন নানাধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও শেষ মহুর্তের প্রস্তুতির কাজ চলছে।
ইআরএল সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে একসঙ্গে সোয়া দুই মাসের জ্বালানি তেল মজুত করা যায়। এসপিএম চালু হলে আড়াই মাসের জ্বালানি তেল মজুত করা যাবে।
