১৯৯০ সালের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত মিয়ানমারের গ্রেট কোকো দ্বীপ নিয়ে বেশ রহস্য ছিল। গুজব ছিল, দ্বীপটিতে নজরদারি কেন্দ্র নির্মাণ করেছে চীন, যদিও এই দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কখনও মেলেনি। তবে বর্তমানে দ্বীপটি ও এর ব্যবহার নিয়ে পুনরায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ব্রিটিশ পলিসি ইনস্টিটিউট চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তোলা স্যাটেলাইট ছবিতে কোকো দ্বীপে আধুনিক সামরিক স্থাপনা নির্মাণের লক্ষণ দেখা গেছে। সেখানে দুই হাজার ৩০০ মিটার রানওয়ে, রাডার স্টেশন, দুটি নতুন হ্যাঙ্গার, যার একটি আবাসন ব্লক এবং জলরাশিকে বিভক্ত করা পথের সন্ধান মিলেছে। এছাড়া দ্বীপের প্রান্তে জমি পরিষ্কারের প্রচেষ্টা নির্মাণকাজ চলার প্রমাণ দেয়।
১১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কোকো দ্বীপ আকৃতিতে ছোট হলেও এর অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল মালাক্কা প্রণালীর কাছাকাছি নয়, পাশাপাশি ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর ঘাঁটি রয়েছে।
ম্যাক্সার টেকনোলজিসের প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোকো দ্বীপের উন্নয়নের সঙ্গে ভারত শিগগিরই বেইজিংয়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্ত একটি দেশে নতুন বিমান ঘাঁটির মুখোমুখি হতে পারে। তবে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি।
ব্লুমবার্গের মতে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা জানতে পেরেছে, বেইজিং কোকো দ্বীপে নজরদারি কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা করছে। তবে সেখানে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ ও এর আধুনিকীকরণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীন।
চ্যাথাম হাউসের প্রতিবেদনের লেখকরা বলছেন, স্যাটেলাইট চিত্রে কোকো দ্বীপে চীনা কার্যকলাপের কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চায়, তাইওয়ান নিয়ে দেশটির দাবি সমর্থন করে এবং চীনের ‘বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগের’ প্রতি সমর্থন জানায়।
কার্টিন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক হটওয়ে থেইন বলেন, মিয়ানমার বেপরোয়া, অর্থ সংকটে ভুগছে। বেইজিংয়ের বিনিয়োগ অর্থনৈতিকভাবে সহায়ক। এতে বিশ্ব মঞ্চে দেশটি জানান দিতে পারে, চীন এখনও তাদের বন্ধু।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের আগে ২০২০ সালে মিয়ানমারের ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ চীনের কাছে ছিল। এখন এটি সম্ভবত বেড়েছে। দেশটিতে চীনের বিনিয়োগের মধ্যে কাইয়ুফয়েতে একটি প্রধান বন্দর রয়েছে। তরল গ্যাস এবং তেল পরিবহনের জন্য ভারত মহাসাগরে চীনের প্রবেশাধিকার দিতেই এর নকশা করা হয়েছে।
ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের মিয়ানমার কান্ট্রি ডিরেক্টর জেসন টাওয়ার বলেন, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মিয়ানমার চীনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেনাবাহিনী বেইজিংয়ের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করবে এবং চীনের কৌশলগত উদ্যোগ সমর্থন করবে।
তিনি আরও বলেন, এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে ভারত ও চীনকে একে অপরের বিরুদ্ধে উসকে দিতে রশদ জোগাচ্ছে।
ইন্টেল ল্যাবের ড্যামিয়েন সাইমন বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে চীনা নজরদারি সম্পর্কে ভারতের উৎকণ্ঠা নিয়ে ভালোভাবেই অবগত ছিল। ভারতের সমর্থন পেতে বা সম্পর্ক উন্নয়ন করতে কোকো দ্বীপকে ব্যবহার করতে পারে মিয়ানমার জান্তা সরকার।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান