মায়ের সম্মান ও মর্যাদা সবসময়ের

আপডেট : ১৩ মে ২০২৩, ১১:২৬ পিএম

ইসলাম সর্বদা মাকে সম্মান এবং তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাকে ওয়াজিব করেছে। সুতরাং মায়ের সম্মানের জন্য বছরে কোনো একটি দিনকে নির্দিষ্ট করা দরকার নেই। মা-বাবা কিংবা পরিবারকে সম্মান দেখানোর জন্য বছরের একটি দিনকে নির্দিষ্ট করা বাহুল্য বিষয়। এটা হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, তার কোনো সাহাবি করেননি, কোনো আদর্শবান সন্তান এটা করতে পারে না। সুতরাং তা পরিহার করে এমন আনুষ্ঠানিকতানির্ভর মর্যাদা প্রদর্শন ও সম্মান জানানো থেকে সতর্ক থাকা দরকার। মায়ের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়ে শরিয়ত যে বিধান দিয়েছে, এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ওয়াজিব।

ইসলামি শরিয়ত সর্বদা মাকে সম্মান করার বিধান দিয়েছে এবং তার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জন্য উৎসাহ দিয়েছে। কাজেই মাকে সম্মান করা, তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তার প্রতি অনুগ্রহ করা এবং তার কথা শোনার ব্যাপারে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তার ওপরই সীমাবদ্ধ থাকা মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব।

এ সম্মান শুধু মায়ের জন্য নয় বরং মা-বাবা উভয়কে সম্মান, তাদের প্রতি অনুগ্রহ এবং সার্বিক দিক দিয়ে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার বিধান ইসলাম দিয়েছে, সেই সঙ্গে তাদের অবাধ্যতা, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা থেকে সতর্ক করার সঙ্গে সঙ্গে মায়ের যথাযথ হক আদায়ের ব্যাপারে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

কেননা মা সন্তানকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এবং সন্তানকে গর্ভেধারণ, দুধপান করানো এবং লালন-পালনের ক্ষেত্রে অধিক কষ্ট করেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, একমাত্র তারই ইবাদত করো এবং মা-বাবার প্রতি অনুগ্রহ করো।’ -সুরা আল ইসরা : ২৩

তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্টবরণ করে গর্ভে ধারণ করেন এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।’ -সুরা লোকমান : ১৪

কোরআন মাজিদে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে।’ -সুরা মুহাম্মদ : ২২

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহিহ সনদে এসেছে, তিনি বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় পাপ সম্পর্কে বলব না? এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তারা বললেন হ্যাঁ, বলুন ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং মা-বাবার অবাধ্য হওয়া, তিনি হেলান দিয়ে বসা ছিলেন অতঃপর সোজা হয়ে বসে বললেন, খবরদার! মিথ্যা বলা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া।’ -সহিহ বোখারি : ২৬৫৪

এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। অতঃপর তোমার নিকটতম প্রতিবেশী তারপর তোমার নিকটতম।’ -সহিহ বোখারি : ৫৯৭১

বর্ণিত হাদিসে ‘আসসাহাবা’ শব্দের অর্থ- ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং সদাচরণ। উল্লিখিত হাদিসে ন্যায়পরায়ণতার অধিকতর অধিকারী হিসেবে মাকেই সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর কারণ, সন্তানের জন্য মাকেই সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ, সন্তানের জন্য সবচেয়ে বেশি দয়া, স্নেহ এবং যত্ন, সন্তানকে দুধপান ও লালন-পালন, সন্তানের অসুখের সময় সেবাযতœ ও সজাগ থাকতে হয়। এভাবে সন্তানের সবক্ষেত্রে ও সর্বাবস্থায় বেদনা ও কষ্ট মাকেই সহ্য করতে হয়। তাই ইসলাম মায়ের সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতার অধিকার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থায় সাব্যস্ত করা হয়েছে।

এ কারণেই মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সর্বশ্রেষ্ঠ আচার-ব্যবহারের অধিকারী হলেন মা। সুতরাং তার সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম হলো- তার সাহায্য ও সেবাযত্ন করা, তার পানাহারের প্রয়োজন পূরণ করা, তার সঙ্গে নম্রভাবে বিনয়ীর সুরে কথা বলা, তার প্রয়োজন ও পছন্দমতো তাকে উপহার প্রদান করা, তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা, তিনি দূরে থাকলে তার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে সাক্ষাৎ করা, তার সঙ্গে সদাসর্বদা সুসম্পর্ক রাখা। মায়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিন্ন করা বৈধ নয়, তাকে কষ্ট দেওয়া, তাকে বিরক্ত করা এবং তাকে অসন্তুষ্ট করা উচিত নয়। তিনি অসুস্থ বা পীড়িত হলে তার আরাম-আয়েশ ও শান্তি লাভের ব্যবস্থা করার জন্য সজাগ থাকা, তার জন্য দোয়া করা। কেননা সমস্ত জাগতিক বিষয়ে তার সঙ্গে ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সদাচরণ ও সুসম্পর্ক স্থাপন করে রাখাই হলো তার অধিকার।

মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মায়ের হকের অধিক গুরুত্বের ব্যাপারে বহু আয়াত এবং হাদিস রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করবে, সে ব্যক্তি স্পষ্ট প্রমাণ পাবে যে, সর্বদা মাতা-পিতার প্রতি সম্মান, তাদের প্রতি অনুগ্রহ এবং সব আত্মীয়ের প্রতি অনুগ্রহ করা ওয়াজিব এবং তাদের অবাধ্য হওয়া ও আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা সবচেয়ে দূষণীয় এবং কবিরা গোনাহের অন্তর্ভুক্ত। যা দয়াময় আল্লাহকে রাগান্বিত করে ও জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। এমন কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা অপরিহার্য।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত