১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে জাপানের আধুনিক জুজুৎসু সংস্থা কোদোকানের ৫ দান বেল্টপ্রাপ্ত জুজুৎসু শিক্ষক শিনজো তাকাগাকি শান্তিনিকেতনে যোগদান করেন। তিনি আসার দুমাস পর (১৩৩৭-এর পৌষ মাসে) রবীন্দ্রনাথ তাকে তার রুমালে একটি গান লিখে উপহার দিয়েছিলেন : ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান, সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়োনা ম্রিয়মাণ। মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’ স্বদেশ পর্যায়ের গানটি ১৩৩৮ সালে কলকাতার নিউ এম্পেয়ার রঙ্গমঞ্চে প্রথম গাওয়া হয়। এই গানটির বাণীর মধ্যে যেকোনো পর্যায়ে পরাধীন বা স্বৈরশাসনাধীন বাঙালির আত্মশক্তি বিকাশের সর্বকালীন প্রেরণা ও প্রাসঙ্গিকতা পরিলক্ষিত হয়।
১৯৪৭ পূর্ব ভারতবর্ষে ও পরবর্তী ২৪ বছরের পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে এবং এমনকি ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় ও পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক (রাজনৈতিক নির্বুদ্ধিতা কিংবা দুরভিসন্ধি সিদ্ধ, স্বৈরাচার সৃজিত) সমস্যা সংকটকালে স্বাধীন নাগরিকরা প্রতিবাদে সঙ্কোচবোধ করে নিত্যনৈমিত্তিক অপমানিত বোধ করেছে। তাদের মনের মধ্যে সংশয়-সন্দেহবোধ ঢুকিয়ে তাদের নিজেদের অধিকার ও দাবি পেশের ক্ষেত্রে বিহ্বলতায় বারবার বিমূর্ত বিমলিন করেছে স্বার্থবাদীরা। ন্যায়ের-অন্যায়ের অপমৃত্যু আর অন্যায়ের উদগ্র বাহু বিস্তারিত হয়ে তাদের জীবনযাপন, মানবিক মূল্যবোধ চর্চায় বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সেই অব্যক্ত বেদনাবোধের প্রকাশ ঘটেছে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলকে ডুবিয়ে দিয়েছে, ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলনে কায়েমি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে আন্দোলন করেছে, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামের সূচনা ঘটে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তার পরিণতি লাভ করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী পাঁচ দশকে জনগণ বা আমজনতা সব অধিকার অর্জন করতে পারেনি, যার জন্য তারা একাত্তরে রক্ত দিয়েছিল অকাতরে। মনে হবে এখনো তারা সেই আগের (১৯৩০, ১৯৪৭, ১৯৬২) পর্যায়ে বয়ে গিয়েছে। আত্মত্যাগের সুফল জুটেছে টিনের ঘর থেকে পাকা দালানে, খালি থেকে পায়ে জুটেছে জুতা, পোশাক-আশাকে আচার-আচরণে স্মার্টনেস এসেছে বা আসছে। কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে কতখানি তাৎপর্যবহ হতে পেরেছে তার খতিয়ান বা হিসাব মেলেনি। মাথা পিছু আয় ৩ হাজার ডলারের কাছাকাছি, যার বাস্তব উপস্থিতি উপলব্ধির চত্বরেই পৌঁছাতে পারেনি। দুইশ বিলিয়নের বিদেশি সাহায্য, একশ পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স, একশ বিলিয়ন ডলারের এফডিআই এই মাটিতে প্রথিত হয়ে সত্যিই কি কোনো কার্যকর পরিবর্তন সূচনা করতে পেরেছে? পরিবর্তন যা করেছে বা হয়েছে তা বাংলাদেশের কৃষকরা করেছেন। যারা কোনো আন্দোলন বা বিশ্ব সম্মেলন বা স্বীকৃতি আদায়ে চতুরতার আশ্রয় নেয় না।
ভালো ও মন্দের কুস্তি খেলা চলছে। ভালোকে কোরামিন দিয়ে বাঁচাতে হচ্ছে। মন্দ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে সাজঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন চরকির মতো ঘুরছে শাটল ককের মতো, কূটনামির দ্বারা চলছে বাগ্্যুদ্ধের রাজনীতি।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং পুনর্বাসন, পরবর্তীকালে দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোকে স্বাবলম্বী করে তোলা ও নানান সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ ও ধার-কর্জ করতে হয়েছে। এ সাহায্য গ্রহণের সময় খাতভিত্তিক প্রয়োজন ও উপযোগিতার ভিত্তিতে শর্তাদি যথাযথ বিবেচনা ও পরীক্ষা পর্যালোচনা, যথাসময়ে সুদক্ষতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের দ্বারা দ্রুত রিটার্ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং অর্জিত অগ্রগতি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য।
বিদেশি ঋণের সুদের কিস্তি ও রেয়াতকাল শেষে আসল পরিশোধের ক্রমবর্ধমান বোঝা এখন বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেটের অন্যতম ব্যয় খাত। ক্রমান্বয়ে বিদেশি দায় পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। বর্তমানে যেসব হার্ডটার্মের, সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট প্রকৃতির ধারকর্জ করা অব্যাহত আছে তাতে সামনে দায়-দেনা পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ না বাড়লে বৈদেশিক দায়-দেনা পরিশোধের সহনীয় মাত্রা এক সময়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বিদেশি সাহায্য গ্রহণকারী অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার কথা নয়, যদি বিদেশি সাহায্য প্রয়োজনীয় সময়ে গ্রহণ করে উপযুক্ত খাতে দ্রুততার সঙ্গে ব্যয় ও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সংসারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে নিজের সীমিত সম্পদকে অধিকতর উপযোগী অবস্থায় পাওয়ার জন্যই তো ঋণ বা সাহায্যের প্রত্যাশী হওয়া। গৃহীত সাহায্য ও ঋণ যদি তার ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে তথা স্বয়ম্ভর ও উৎপাদনমুখী অবস্থার পরিণতিতে না পৌঁছে দেয় তাহলে এক সময় কর্জের টাকা সুদসহ শোধ করতে হলে তো ত্রাহি মধুসূদন পরিস্থিতির উদ্ভব হবেই, যেমনটি হয়েছে দূরের ও কাছের বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশ ও অর্থনীতিতে। গোষ্ঠী, পারিবারিক ও স্বৈরতান্ত্রিক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বেশ কয়েকটি হতভাগ্য অর্থনীতির দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেউলিয়া হওয়ার উদাহরণও আছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, এমন অবস্থায় পড়েনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র নামে খ্যাত নব্য শিল্পায়িত দেশগুলো। তাদের সফলতা ও ব্যর্থতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রেক্ষাপটে।
একটা উন্নয়নশীল দেশকে দেখতে হবে কোন সেক্টরে কি পরিমাণ সাহায্য কেন বা কত দিনের জন্য নেওয়া হবে আর নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত সেই অগ্রগতি অর্জন। ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে গৃহীত মোট প্রকল্প ঋণের শতকরা ২৪.২৮ ভাগ ব্যবহৃত হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে, শতকরা ২১.৭৮ ভাগ পরিবহন ও যোগাযোগ (সড়ক সেতু, রেলওয়ে, টিঅ্যান্ডটিসহ) খাতে। বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাণ কৃষি ও পানিসম্পদ খাতে ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র ১২.৪৭ ভাগ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মতো সামাজিক খাতগুলোয় ব্যবহারের পরিমাণ একুনে ১৫.৭৭ ভাগ। তাহলে দেখতে হবে জ্বালানি বিদ্যুৎ এবং যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগকৃত বিপুল ঋণের টাকা বাঞ্ছিত ও টেকসই উন্নয়নে সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে কিনা। উন্নয়নকে অর্থবহ করতে হলে এ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তিকে কখনো সখনো ধারকর্জ করে চলা কোনো কোনো অর্থনীতিতে উন্নয়নের বিশেষ সাফল্য বিবেচনা করে তা ফলাও করে প্রচারের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। আবার সময়ে সময়ে দাতাদেশ ও সংস্থার আরোপিত নানান সংস্কার কর্মসূচির প্রেসক্রিপশন পালনেও বৈদেশিক সাহায্য নেওয়ার প্রবণতা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে বিদেশি কনসালট্যান্ট দিয়ে দেশের মানবসম্পদের দক্ষতা ও কর্মক্ষমতাকে বাড়ানোর প্রয়াসের নামে প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে বরং বিদেশি সাহায্যনির্ভর ও আরামপ্রিয় করে তোলার আত্মঘাতী অবস্থা উপযুক্ত পর্যালোচনায় আনা হয় না। যেহেতু যেকোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ঋণ অনুদানের দায়ভার বহন করতে হবে রীতিমতো তিন জেনারেশন পর্যন্ত সব সাধারণ নাগরিককে, সেহেতু বৈদেশিক সাহায্য আর কতদিন, কেন, কোন কাজে এবং কী শর্তে নেওয়া হচ্ছে, হবে বা হবে নাÑ এসব নিয়ে মিডিয়া এমনকি জাতীয় সংসদে আলোচনা- বিতর্ক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণসচেনতা বৃদ্ধি এবং জনমত যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
গণতন্ত্রে মানুষই বড় কথা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এই মানুষের কল্যাণ ভাবনাতেই নিবেদিত। এই মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের দ্বারা, আবার সব মানুষের দ্বারা কর্তব্যকর্ম সূচারুরূপে সম্পাদনের মাধ্যমে সমাজ সমৃদ্ধি লাভ করে। আবার এই মানুষের দায়িত্বহীনতার কারণে সমাজের সমূহ ক্ষতি সাধিত হয়। অবস্থা ও সাধ্য অনুযায়ী উৎপাদনে একেকজনের দায়িত্ব ও চাহিদার সীমারেখা বেঁধে দেওয়া আছে কিন্তু এ সীমা অতিক্রম করলে বাজার ভারসাম্য বিনষ্ট হবেই। ওভারটেক করার যে পরিণাম দ্রুতগামী বাহনের ক্ষেত্রে, সমাজে সম্পদ অর্জন ও ভোগের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রমণে একই পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে থাকে। সমাজে নেতিবাচক মনোভাবের উপস্থিতি, অস্থিরতা ও উন্নয়ন অপারগতার যতগুলো কারণ এ যাবৎ চিহ্নিত বা শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে এই সম্পদ অবৈধ অর্জনরোধে অপারগতা, ন্যায্য অধিকার বঞ্চিতকরণে প্রগলভতা এবং আত্মত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতিই মুখ্য। গণতন্ত্রের বিকাশ ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যা শুভ ও কল্যাণকর নয়।
দেখা যাচ্ছে, কার্যকারণের সঙ্গে ফলাফলের আন্তঃযোগাযোগ বা আন্তঃসম্পর্ক পরস্পর প্রযুক্ত ও নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল। যেকোনো পর্যায়কে তাই বিছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই, দীর্ঘমেয়াদে অর্জিত সাফল্যকে একটি সীমাবদ্ধ সময়ের অবয়বে শুধু নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখার, প্রচারের ও প্রগলভতা প্রকাশের সুযোগ নেই। সামষ্টিকতার সামষ্টিকতাই থাকে না, যদি কাজ আর ইফেক্টের মধ্যকার পরস্পর প্রযুক্ততার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে নৈর্ব্যক্তিক বিশ্লেষণে যাওয়া না হয়, যদি শুধু খ-িত দৃষ্টিতে দেখা হয় একটি সম্পূর্ণ বিষয়কে। অর্থনীতির ক্ষতিকর যেকোনো অপপ্রয়াসের সামনের ও নেপথ্যের উভয় কারণের প্রতি দৃষ্টিদান সমাধান প্রত্যাশা ও প্রয়াসকে পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারে। কার্যকারণ ছাড়া কোনো কিছু উদ্ভব হয় না। শুধু উদ্ভূত পরিস্থিতি কিংবা উপস্থাপিত ফলাফলকে সমালোচনার কাঠগড়ায় না এনে একই সঙ্গে কী কারণে এই পরিস্থিতির উদ্ভব কিংবা এই ফলাফলের উপলক্ষকেও বিচার-বিশ্লেষণের আর্জিতে আনার আবশ্যকতা অনস্বীকার্য।
লেখক: কলাম লেখক ও উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক