একটা সময় পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ড শুধু উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। লংকাবাংলাই সর্বপ্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য ক্রেডিট কার্ড নিয়ে আসে। গত কয়েক বছরে এটি নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন আমরা গ্রামপর্যায়ে ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের এসইভিপি ও হেড অব রিটেইল বিজনেস খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক এ জেড ভূঁইয়া আনাস
খোরশেদ আলম বলছিলেন, আমাদের আর্থিক ব্যবস্থা ডিজিটাল হচ্ছে। আমরা বহুদূর এগিয়েছি। এটি বাড়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ডিজিটাল লেনদেন দুভাবে ভাগ করা যায়। একটি পেমেন্ট সিস্টেম, অন্যটি ফান্ড ট্রান্সফার। এর মধ্যে ফান্ড ট্রান্সফার ভালোই হচ্ছে। গার্মেন্টস সেক্টর থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলেও এ লেনদেন শুরু হয়েছে ব্যাপকহারে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন দ্রুতই বাড়ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লেনদেনের ৮০ শতাংশ হবে ডিজিটাল। কয়েক দিন আগে আমরা গ্রাহককে চেকের মাধ্যমে পেমেন্ট করতাম। বর্তমানে সেটি ডিএফটিএম মাধ্যমে পরিশোধ করছি। ডিজিটাল লেনদেনে আমরা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি এগিয়েছি। এখনো আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, আমাদের মার্চেন্ট লেভেল যেভাবে আধুনিক হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি।
অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ক্রেডিট কার্ডে পিছিয়ে আছে। যদিও এখন তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। দেশে এ ধরনের কার্ডের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খোরশেদ আলম বলেন, জনসংখ্যার বিচারে অনুযায়ী কার্ডের সংখ্যা কম। আগামীতে এটিকে বাড়িয়ে অন্তত চার কোটিতে নিয়ে যেতে হবে। ক্রেডিট কার্ড কম হওয়ার পেছনে যারা ইস্যু করছেন, তাদের গাফিলতি রয়েছে। যদিও এর পেছনে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি বিবেচনা করছে। ক্রেডিট কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো পুরাতন গ্রাহক ও যাদের হ্যান্ডসাম স্যালারি আছে তাদের বেছে নিচ্ছেন। এজন্য যে গ্রাহককে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি নিয়ে ঋণ দিতে চায় না আমরা তাদেরই টার্গেট করেছি। বিশেষ করে সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা আমাদের ক্রেডিট কার্ড হোল্ডার। আমাদের দেখে অনেক ব্যাংক এখন শিক্ষকদের টার্গেট করে কাজ করছে।
ইন্টার্ন ডাক্তারদের আমরা কার্ড দিয়েছি। দশম থেকে দ্বাদশতম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদেরও আমরা কার্ড দিয়েছি। এমনকি যাদের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা তারাও আমাদের কার্ড পেয়েছেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংকাররাই মূলত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক। তাদের লক্ষ্য করে যদি আমরা কাজ করতে পারি তাহলে ক্রেডিট কার্ডের বাজার আরও বড় হবে। ক্রেডিট কার্ড যদি আপনি যথাযথভাবে ব্যবহার করেন, সময়মতো বিল পরিশোধ করেন তাহলে আপনি কখনই বিপদে পড়বেন না। কিন্তু যদি ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা নিয়ে আপনি জমি কেনেন কিংবা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসান করেন, তাহলে আপনি কার্ডের বিল দিতে সমস্যায় পড়বেন এবং এটি আপনার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
আগে একটা ধারণা ছিল যে, এলিট শ্রেণির মানুষজনই শুধু কার্ড ব্যবহার করবেন। কিন্তু সেটি এখন পরিবর্তন হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে গ্রামাঞ্চলেও ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করছি।
ক্রেডিট কার্ডে সুবিধা প্রসঙ্গে খোরশেদ আলম বলেন, ভোগ্যপণ্যের সব প্রোডাক্ট আপনি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কিনতে পারবেন। মাছ, মাংস, ওষুধ, ঘরের আসবাবপত্র, এমনকি পার্লারে বিল পরিশোধও করা যায়। বিয়ের সময় অনেকেই অর্থসংকটে পড়েন। সে ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ডের সহায়তা নিতে পারছেন। আমাদের শিখা কার্ড রয়েছে। কাস্টমারদের ন্যানো লোন দেওয়ার জন্য কাজ করছি। কারও পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে তার ডাক্তারের খরচ মেটানো, অপারেশন করাতে হলে আমরা সেই সুবিধাও দিয়ে থাকি। আমরা বিভিন্ন সেক্টরের লোকজনের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট করেছি। যদি কেউ আমাদের কার্ড দিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করে তাহলে সে ক্ষেত্রে আমরা তাদের পার্সেন্টেজ হারে ডিসকাউন্ট সুবিধা দিয়ে থাকি, শূন্য শতাংশ সুদে। ক্রেডিট কার্ড এমন একটি প্রোডাক্ট, আপনি চাইলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই ব্যবহার করতে পারবেন।
অনেক সময় আমরা বিভিন্ন অফার বা বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে থাকি। লেনদেনের টাকা প্রতি মাসে বেতন থেকেও অল্প অল্প করে কেটে নেওয়ার সুবিধা রেখেছি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সে পুরো টাকাটা পরিশোধ করে দিলে কোনো সুদ থাকবে না। কোনো কার্ডহোল্ডার যদি রেগুলার তারিখে পরিশোধ করে দেন তাহলে তিনি ঋণগ্রস্ত হবেন না। তারাই শুধু ঋণগ্রস্ত হন যারা টাকা খরচ করছেন আবার সময়মতো ঋণ পরিশোধ করছেন না।
ক্রেডিট কার্ডে খেলাপি প্রসঙ্গে লংকাবাংলার এ কর্মকর্তা বলেন, বরাবরই আমাদের কার্ডে খেলাপির হার ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। কিন্তু কভিডের মধ্যে এটি বেড়ে যায়। অনেক কার্ডধারী রয়েছেন যারা করোনার কারণে চাকরি হারিয়েছেন। তারা চাকরি হারানোর আগে প্রত্যেক মাসে কার্ড থেকে টাকা উত্তোলন করেছেন এবং সেটি স্যালারি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করতে পেরেছেন। তাদের অনেকের চাকরি হারিয়ে বেতন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। আবার কেউ কেউ খেলাপি হয়ে গেছেন। কেউ হয়তো করোনায় মারা গেছেন কিংবা কারও হয়তো বেতন কমে যাওয়ার কারণে খেলাপি হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এ বছরের জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসেই খেলাপির পরিমাণ কমছে।
কার্ডের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে খোরশেদ আলম বলেন, ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে সার্ভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আমরা যে সফটওয়্যারটি ব্যবহার করি সেটার নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আমাদের একটি দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি ইউনিট আছে। তারা প্রতিনিয়ত গবেষণার মাধ্যমে ঝুঁকি প্রশমনের কাজ করছে। এখন পর্যন্ত আমাদের ক্রেডিট কার্ডে কোনো ধরনের সাইবার হামলা কিংবা এ ধরনের কোনো কিছু হয়নি। তবে ছোটখাটো জালিয়াতির কিছু ঘটনা ঘটেছে। এজন্য আমরা প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের সচেতন করছি কার্ডের পিন কারও সঙ্গে যাতে শেয়ার করা না হয়। এমনকি লংকাবাংলা থেকে ফোন দেওয়া হলেও দেবেন না। লংকাবাংলা কখনই গ্রাহকের কাছে পিন চাইবে না। তবে কেউ কেউ লংকাবাংলার কাস্টমার কেয়ারের নাম ভাঙিয়ে গ্রাহকদের ফোন করে পিন নম্বর চায়। এজন্যই আমরা গ্রাহকদের সতর্ক করছি যে কাউকে পিন নম্বর না দেওয়ার জন্য। সম্প্রতি আমরা কার্ডের বিল জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্ড নম্বরের পরিবর্তে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর তৈরি করেছি। এতে গ্রাহক সেই অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করে টাকা জমা দেবেন। এতে অন্য কেউ গ্রাহকের কার্ড নম্বর জানতে পারবে না।
