দেশ রূপান্তরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী জাফর আলম।
দেশ রূপান্তর : দেশের আর্থিক লেনদেন কতটা ডিজিটাল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
জাফর আলম : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের দেশে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়েছে, যেখানে দৈনিক মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ৪৮ লাখ মানুষ ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত আছে। যদিও এ সংখ্যা খুবই কম। তবে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। গত মার্চেই ৪ লাখ নতুন গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এই হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ নতুন গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হচ্ছেন। দেশে প্রায় ৩ কোটি ডেবিট কার্ড ও ২২ লাখ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী আছেন। এসবের সঙ্গে এটিএম, পস, সিআরএম, সিডিএম, আরটিজিএস, ইএফটিএন ইত্যাদির ব্যবহার ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করছে বলে আমি মনে করি। আসলে প্রযুক্তিকে আমাদের ধারণ করতে হবে। এ হিসেবে আমরা যথাযথভাবে এগোচ্ছি বলে মনে হয়।
দেশ রূপান্তর : লেনদেনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন হচ্ছে ক্রেডিট কার্ডে। এই সেবার ভবিষ্যৎ কেমন?
জাফর আলম : বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ক্রেডিট কার্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষজন তাৎক্ষণিক টাকার চাহিদা মেটাচ্ছে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। এখন কার্ডে ব্যাংকের বুথ থেকে নগদ টাকা তোলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের কেনাকাটা ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যাচ্ছে। আর কোনো মুনাফা বা সুদ ছাড়া টাকা পরিশোধে সর্বনিম্ন ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ দিন পর্যন্ত সময় মিলছে। এসব কারণে দেশে দিনে দিনে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে লেনদেনও।
দেশ রূপান্তর : দেশে ডেবিট কার্ডের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা অনেক কম। এর কারণ কী?
জাফর আলম : ডেবিট কার্ড দিয়ে নিজের ব্যাংক হিসাবের টাকা খরচ করা হয়। আর বেশির ভাগ ব্যাংক হিসাব খোলার সঙ্গেই গ্রাহকদের ডেবিট কার্ড দিয়ে থাকেন। ক্যাশ টাকা বহনের ঝামেলা মানুষ এখন এড়িয়ে চলতে চায়। আর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে গ্রাহকদের ব্যাংকের টাকা খরচ করতে হয়। ক্রেডিট কার্ডের খরচ করা টাকার ওপর মুনাফা বা সুদ গুনতে হয়। তাই দেশে ডেবিট কার্ডের তুলনায় ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা কম।
দেশ রূপান্তর : আয়কর বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করায় ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে কি না?
জাফর আলম : ক্রেডিট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের আয়কর বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করা একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না।
দেশ রূপান্তর : কোন শ্রেণি-পেশার গ্রাহক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন? শহরের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক সীমাবদ্ধ কেন? পুরো দেশে ক্রেডিট কার্ড ছড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না কেন?
জাফর আলম : চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ আর্থিকভাবে সচ্ছল যেকোনো মানুষ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। শহরের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা বেশি। আর্থসামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে শহরের বসবাসকারী মানুষই সাধারণত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। এসআইবিএল সব সময় ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকবান্ধব। গ্রাহকের বিভিন্ন সুবিধার কথা চিন্তা করে আমরা সর্বদা ভালো কিছু করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমাদের মার্চেন্ট আউটলেটে ডিসকাউন্ট, ইএমআই ও শূন্য শতাংশ আই পে সুবিধা চালু আছে। আরও বেশি সুবিধা দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আমাদের কার্ডসেবা প্রদানের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছি। মানুষ এখন নগদ টাকা বহন করতে চায় না। গ্রামেও এর চাহিদা তৈরি হবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ইসলামি শরিয়াহসম্মত ও সুদমুক্ত কার্ড হওয়ায় আমাদের কার্ডের বাজার সম্প্রসারণে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আশা করছি, আগামীতে আমাদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা আরও বাড়বে। সেই টার্গেট নিয়েই আমরা কাজ করছি।
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকের নিরাপত্তা কতটা? গ্রাহকের কী ধরনের সচেতনতা প্রয়োজন?
জাফর আলম : এসআইবিএল শরিয়াহভিত্তিক একটি আধুুনিক ব্যাংক। এর ক্রেডিট কার্ডও সম্পূর্ণ শরিয়াহ কমপ্লায়েন্ট। গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ডের সঙ্গে সাপ্লিমেন্টারি কার্ড নিতে পারেন, যা বিনা মূল্যেই দেওয়া হয়। এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ই-কমার্স লেনদেনও টু ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন দ্বারা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড শরিয়াহসম্মত ও সুদমুক্ত হওয়ায় এর বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। সমাজে সর্বস্তরের গ্রাহক আমাদের ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করছেন। আমরা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবীদের জন্য ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করছি।
দেশ রূপান্তর : এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুবিধা কী?
জাফর আলম : তুলনামূলকভাবে আমাদের ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে প্রফিট রেট, ফি ও অন্যান্য চার্জ অনেক কম। শরিয়াহসম্মত হওয়ায় আমাদের কার্ডে কোনো হিডেন চার্জ নেই। গ্রাহকরা বাংলাদেশের যেকোনো এটিএম থেকে কম খরচে ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা তুলতে পারেন। সব ধরনের পিওএস (পয়েন্ট অব সেল) মেশিনে আমাদের কার্ড ব্যবহার করা যায়। এসআইবিএলের কার্ডে বিভিন্ন নির্বাচিত মার্চেন্ট আউটলেটে প্রায় সময়ই বিভিন্ন ধরনের ইএমআই সুবিধায় শূন্য শতাংশ আই-পে সুবিধা দেওয়া হয়, যা গ্রাহককে সহজেই আকৃষ্ট করছে। এ ছাড়া এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ডের পেমেন্ট সিস্টেমও অত্যন্ত নমনীয়, অর্থাৎ গ্রাহকরা পেমেন্ট দিতে সর্বোচ্চ ৫০ দিন পর্যন্ত মুনাফা ফ্রি সময় পান। এই সময়ের মধ্যে পেমেন্ট দিলে কোনো ধরনের মুনাফা চার্জ ধার্য করা হয় না। গ্রাহকরা কার্ড দিয়ে ব্যালান্স ট্রান্সফারের সুবিধা ভোগ করতে পারছেন খুব সহজেই। সেই সঙ্গে তারা বিভিন্ন নির্বাচিত আউটলেটে ডিসকাউন্টসহ ইএমআই সুবিধাও পাচ্ছেন। ব্যাংকের প্লাটিনাম কার্ডধারীদের জন্য বিনা মূল্যে প্রায়োরিটি পাস কার্ড দেওয়া হয়, যা দিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বলাকা ভিআইপি লাউঞ্জে ও বিশ্বব্যাপী নির্বাচিত লাউঞ্জে বিনা মূল্যে প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়া যায়। গ্রাহকরা এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে দেশে ও বিদেশে এটিএম থেকে নগদ উত্তোলনের সুযোগ পান। বর্তমান সময়ে ক্রেডিট কার্ড হলো বিপদের বন্ধু। কারণ আমাদের কার্ড দিয়ে গ্রাহক প্রয়োজনের মুহূর্তে যখন-তখন যেকোনো সময়ে এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারছেন। বিভিন্ন পিওএস মেশিনে ব্যবহার করতে পারছেন, দেশে ও দেশের বাইরে ই-কমার্স লেনদেন করতে পারছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ডিসকাউন্ট, ইএমআই ও শূন্য শতাংশ আই-পে সুবিধা পাচ্ছেন, ব্যালান্স ট্রান্সফারের মাধ্যমে কার্ড থেকে টাকা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে নিয়ে নগদ ব্যবহার করতে পারছেন। কাজেই এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড আসলেই মানুষের বিপদের বন্ধু, সব সময়ের সঙ্গী।
দেশ রূপান্তর : বিভিন্ন উৎসবে গ্রাহকদের নানা অফার দিচ্ছেন। এতে ব্যবসা কতটা বাড়ে?
জাফর আলম : আসলে ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে এসব অফারের সম্পর্ক নেই। গ্রাহকদের সুবিধার্থে এ ধরনের অফার দেওয়া হয়ে থাকে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে আমরা বিভিন্ন শপিং মল, ইলেকট্রনিক ও ফার্নিচার শোরুম, হোটেল ও রেস্তোরাঁর সঙ্গে চুক্তি করছি। গ্রাহকরা তাদের কেনাকাটায় আরও বেশি ডিসকাউন্ট, ইএমআই ও শূন্য শতাংশ আই-পে সুবিধা পেতে পারেন, সে ব্যাপারে কাজ করছে এসআইবিএল। এসআইবিএলের গ্রাহক তাদের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা এবং প্রয়োজন মেটাতে পারছেন।
দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জাফর আলম : আপনাদেরও ধন্যবাদ।
