বছরে শতকোটির ছাই রপ্তানি বিএসআরএমের

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৩, ০৫:৪৮ এএম

পরিবেশের জন্য বড় হুমকি বায়ুদূষণ। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। বায়ুদূষণের বড় কারণ শিল্পকারখানার ধোঁয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে শিল্পায়নের বিকল্পও নেই। সে কারণে বিকল্প ভাবনা ছাড়া উপায় থাকে না। তাই পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও শিল্পকারখানার ধোঁয়া পরিশোধন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক শিল্পকারখানা সেটা মানছে না।

অনেকেই যেখানে মানছে না, সেখানেই এগিয়ে এসেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় রড নির্মাণকারী শিল্পগ্রুপ বিএসআরএম (বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড)। রড নির্মাণে যেমন দেশের পথিকৃৎ এই শিল্পকারখানাটি, তেমনি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণেও বিএসআরএম সবার আগে বসিয়েছে ‘এয়ার পলিউশন কন্ট্রোল সিস্টেম ইউনিট’। ২০১৫ সালে বিএসআরএম তাদের চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজীদ এলাকার দুটি কারখানায় এবং মিরসরাইয়ে তাদের সবচেয়ে বড় কারখানাটিতে সংযোজন করে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট। সাধারণত স্ক্র্যাপ থেকে স্টিল তৈরির বিলেট প্রস্তুতের সময় যে ধোঁয়া বের হয় সেই ধোঁয়া বায়ুম-লে ছেড়ে দেওয়ার আগে এই ইউনিটের মাধ্যমে তা পরিশোধন করা হয়। পরিশোধনের সময়ই দূষণমুক্ত বাতাস বায়ুম-লে চলে যায় এবং ছাঁকনিতে আটকা পড়ে দূষণকারী উপাদানগুলো, যা জমা হলে দেখতে কালো ছাইয়ের মতো হয়।

কী পরিমাণ ছাই পাওয়া যায়?

বিদেশ থেকে আমদানি করা স্ক্র্যাপ লোহা গলিয়ে বিলেট প্রস্তুত করা হয়। এই বিলেট থেকেই পরে বিভিন্ন মাপের রড তৈরি করা হয়। সাধারণত এক টন বিলেট তৈরিতে ১ হাজার ২০০ কেজি স্ক্র্যাপ লোহা গলাতে হয়। বিএসআরএম প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ টন বিলেট প্রস্তুত করে এবং তা থেকে প্রায় ১২ হাজার টন ছাই উপজাত হিসেবে পাওয়া যায়। এসব ছাই রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আয় করে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রতিষ্ঠানটির খরচ হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আট বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ছাই রপ্তানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসব ছাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, স্পেন, তুরস্ক ও ভারতে রপ্তানি হয়। কালি ও প্রিন্টারের কার্টিজ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এই ছাই ব্যবহার করা হয়।

বিএসআরএমের বক্তব্য

পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্ল্যান্ট বসানোর কথা উল্লেখ করে বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পরিবেশ রক্ষা করেই শিল্প উৎপাদন করি। তাই আমরা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে তা বিদেশে রপ্তানি করছি। এতে পরিবেশ যেমন দূষণের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে, তেমনিভাবে দেশও বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য

স্টিল কারখানা থেকে যে ছাই সংগ্রহ হয়, সেগুলোতে জিংকের পরিমাণ বেশি থাকে। আন্তর্জাতিক বাজার জিংকসমৃদ্ধ ছাইয়ের দাম বেশি। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) বেগম শাহনাজ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা শিল্পকারখানাগুলোতে এয়ার পলিউশন কন্ট্রোল সিস্টেম বসানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। অভিযানও চালানো হয়। একই সঙ্গে যারা বসাচ্ছে, তারা যাতে তা চালু রাখে সেটা নিশ্চিত করার জন্যও আমরা কাজ করছি।’

চট্টগ্রামের পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণাগারের উপপরিচালক ও রসায়নবিদ মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘বিএসআরএম স্টিল কারখানাগুলোর মধ্যে এটি মডেল হিসেবে কাজ করছে। আমরা অনেককে বলি, তাদের অনুসরণ করতে। এই পদ্ধতিতে দূষিত বায়ু পরিশোধন করে উপজাত হিসেবে যে ছাই পাওয়া যায় তা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আহরিত হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণও হচ্ছে স্টিল কারখানাগুলো। এসব কারখানায় লোহা গলানোর সময় যে কালো ধোঁয়া নিগর্ত হয় তা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত