আমলার দাপট দাপটের আমলা

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৩, ০৮:১৭ পিএম

আমলার দাপট বা দাপটের আমলা, যেভাবেই বলা হোক না কেন এসব আমলারা কখনো জনবান্ধব রাজনীতিক হতে পারেন না। তারা চাকরি জীবনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যেভাবে নক্ষত্র দূরত্বে থাকেন রাজনীতিক জীবনেও এর ব্যতিক্রম হয় না। পুরোদস্তুর রাজনীতিক হওয়ার চেষ্টা করলেও তারা তা পারেন না।

ডজন ডজন দাপটের আমলা রাজনীতিতে এলেও তারা পেছনেই পড়ে ছিলেন। কেউ কেউ মন্ত্রী হলেও তারা শেষ পর্যন্ত ছিলেন জনবিচ্ছিন্নই। তারা মন্ত্রীত্বকেও চাকরিই মনে করেন। কিছু আমলা জানেন না কোথায় থামতে হয়। তাদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা রাজা বাকি সবাই প্রজা। আর কিছু আমলা চাকরিতে থেকেই হম্বি-তম্বি শুরু করেন। ক্ষমতার শক্তি তারা হজম করতে পারেন না। চাকরিতে থাকাকালে রাজনীতির সাথে সরকারের কর্মচারীদের সংশ্লিষ্টতার কোনো সুযোগই নেই। সেখানে আমলা গায়ের জোরে এমপিদের সাথে বিতর্কে জড়ান।

কর্মচারী সে যেখানেই হোক যে ফরম্যাটেই হোক দাপুটে হলে সেবাপ্রত্যাশীদের কপালে যেমন দুঃখ নেমে আসে তেমনি কর্মচারীর প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের অবনমন হয়। কেননা দাপুটে আচরণের কারণে সেবাপ্রত্যাশী এবং কর্তৃপক্ষ কারো জন্যই সুখের হয় না । তখন সে দাপটকে তাড়ানোর জন্য সবাই উপায় খোঁজে, এড়িয়ে চলে।

নামের কারণে খাজা মিয়া প্রশাসনে এমনিতেই পরিচিত। তথ্য মন্ত্রণালয়ে সচিবগিরি করে এখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আছেন। অবসরে যাবেন আগামী বছর জুলাই মাসে। তার আগেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে না রেখে নিজ নির্বাচনী এলাকার এমপির সাথে অসম লড়াইয়ে নেমেছেন। দুটি কারণে এ লড়াই অসম। এক তিনি চাকরি করছেন। এ কারণে তিনি আচরণবিধি দিয়ে বাধা পড়ে আছেন। দুই চাকরি না করলেও তার পক্ষে তিন বছর আগে নির্বাচন করা সম্ভব না।

খাজা মিয়া প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি করে সচিব হয়েছেন। চাকরির কারণে এখন অনেক কিছুই তার হাতের মুঠোয়। সার্বক্ষণিক গানম্যানের নিরাপত্তায় থাকেন। জুনিয়র অফিসাররা স্যার স্যার বলে মুখে ফেনা তোলেন। মাঝে মধ্যে সরকার প্রধানের সাথে দাপ্তরিক বিষয়ে বৈঠক করেন। তবে দপ্তরের মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয় নিয়মিতই। কিন্তু যখন চাকরি থাকবে না তখন একজন সাধারণ নাগরিকে পরিণত হবেন। তখন পাবেন না গানম্যানের ছায়া। লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড করে রাজনীতিতে নামলে আমলার অবস্থানটা পরিস্কার হয়। তা না করে বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করে তিনি তার অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। এ কারণেই দেরিতে হলেও ওএসডি হয়েছেন।

হাল আমলে সাবেক স্বাস্থ্য সচিব আবদুল মান্নানও তার নির্বাচনী এলাকার এমপি নূর মোহাম্মদের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কে জড়িয়েছেন। এ বিতর্ক শুরু হয়েছে তিনি সচিব থাকা অবস্থাতেই। আবদুল মান্নানও প্রশাসনে পরিচিত মুখ। তিনি বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের সচিব ছিলেন। সেখান থেকে স্বাস্থ্য সচিব হয়েছিলেন। বর্তমান এমপিও একজন সাবেক আমলা। নূর মোহাম্মদ ছিলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আবদুল মান্নানের হয়ে তার অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। তারা আবদুল মান্নানকে আগামী নির্বাচনে এমপি হিসেবে দেখতে চান। ফেসবুক পেজে এ ধরনের একটি পোস্টে বিভিন্ন জন নেতিবাচক ও ইতিবাচক দুই ধরনের মন্তব্যই করেছেন। সেখানে আবুল কাশেম নামে একজন লিখেছেন, ‘সচিব হলেই ভালো রাজনীতিক হওয়া যায় না। যেমন সাবেক স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী বিশিষ্ট আমলা মহিউদ্দিন খান আলমগীর। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। তাদের দিকে একটু চিন্তা করলেই অনুমান করা যায় যে, শুধুমাত্র ভালো তুখোড় আমলা হলেই ভালো মন্ত্রী বা এমপি হওয়া যায় না। রাজনৈতিক দূরদর্শী হতে হবে।’

বিএনপি সময়কার মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুল হালিম জামালপুরের একটি আসনে নির্বাচন করবেন বলে একই ধরনের আচরণ করেছেন তৎকালীন এমপি সুলতান মাহমুদ বাবুর সাথে।

এক সময়ের দাপুটে আমলা এম কে আনোয়ার সকাল ৯টায় মন্ত্রণালয়ে ঢুকতেন, বের হতেন ৫টায়। চাকরি জীবনের ৯টা-৫টা অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি। খ্যাতিমান এ আমলার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় বিতর্কের ভেতর দিয়ে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য বিতর্কিত কোনো আমলাকে দলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তে আস্থা রেখে তাকে দলে নেয়নি আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাকে লুফে নেয় বিএনপি। তাকে কৃষি মন্ত্রী করা হয়। তিনি আমলার স্টাইলে মন্ত্রণালয় চালিয়ে কৃষি খাতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি। এ খাতে পরিবর্তন এসেছে রাজনীতিক মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে।

তবে প্রশাসন ক্যাডারের জুনিয়র কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্ন ধারনা কাজ করছে। তারা মনে করেন, অবসরের পর নিয়মমাফিক রাজনীতি হতেই পারে। এ ধারা থেকেই একজন আবুল মাল আবদুল মুহিত, ড. মশিউর রহমানদের মতো নেতৃত্ব আসতে পারেন। তবে আমলাদের নির্লজ্জতা দেখানো উচিত না। এসব কেউই ভালোভাবে নেয় না। নিজের যোগ্যতা দিয়েই রাজনীতিতে জায়গা করে নেওয়া উচিত। কারণ যারা বছরের পর বছর ধরে রাজনীতি করে তারা হঠাৎ করে আসা কাউকে সহজে মেনে নিতে পারেন না। জোর করে মানাতে গেলে সংঘর্ষ হবেই। ব্রিটেনে ২০ বছর চাকরি করলে ভলেন্টিয়ার হিসেবে কোনও দল বা সংগঠনের ব্যানারে আমলারা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে পারে, কিন্তু রাজনীতি করতে পারে না। আমলার প্রভাব থাকতেই পারে, যা তার কর্মদক্ষতা , ব্যবহার ও ইন্টেগ্রিটির সমন্বয়ে হবে। এভাবে আমলা শ্রদ্ধা ও সমীহ আদায় করে নেবেন। জোর বা ক্ষমতা প্রয়োগ করে নয়। আধুনিক আমলাতন্ত্রে আমলার দাপট সর্বদা পরিত্যাজ্য।

বাংলাদেশের প্রশাসন রাজনীতিকে অবনমিত করে। কারণ আগে অগণতান্ত্রিক সরকার ছিল, তখন রাজনীতিকরা ত্যাজ্য ছিল, অবহেলার ছিল। আমলাদের আচরণ ছিল গণতন্ত্রের বিরোধী। স্বৈরশাসন বাংলাদেশের আমলাদের বেশি পছন্দ। ভারতের আমলারা সিস্টেমের ভিতরে প্রবেশ করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেন। সেখানে দৃষ্টিকটু পরিস্থিতি তৈরি হয় না। এটা ভারতীয় আমলাদের কারিশমা। সেখানে রাজনীতিকরা আমলাদের নির্বাচনে নিতে আমলাদের পক্ষ নিয়েছে। আমলাদের উচিত রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা। যেটা ভারতের আমলারা করে। সেখানেও সংঘর্ষ হয়। রাতারাতি বদলি হয়, অনেকের চাকরি চলে যায়।

বাংলাদেশে এমপি হবার বা এমপি পদে বহাল থাকার যে যোগ্যতা সংবিধানে উল্লেখ আছে সে অনুযায়ী নির্বাচন করতে আমলাদের কোনও বাধা নেই। এটা তার অধিকার, বাঁধা দিলে সংবিধান বিরোধী হয়। রাষ্ট্রের জন্য খুব প্রয়োজন হলেও আইনি কারণে আমলাকে রাজনৈতিক দলগুলো তিন বছরের আগে নির্বাচনে দাঁড় করাতে পারে না। কোনও অপরাধ ছাড়াই আমলা এ শাস্তি ভোগ করেন। এর পরিবর্তন আনা দরকার, যা উচ্চ আদালতের বিবেচনায় আছে। ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর সরাসরি পররাষ্ট্র সচিবের চেয়ার থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এ রকম আরো কয়েকজন আছেন। এসব মন্ত্রীদের দিয়ে ভারত সারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করছে। বাংলাদেশেও এ সুযোগ থাকতে পারে। এতে আমলারা নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত