দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই এমন নির্বাচন সম্ভব। নির্বাচনব্যবস্থাকে টেকসই ও আমূল সংস্কারের কাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই করেছেন। আওয়ামী লীগই করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়ন করতে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রাক-তথ্যানুসন্ধানী দলকে এসব কথা জানিয়েছে আওয়ামী লীগ।
এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে প্রতিনিধিদলকে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ১৯৭২ সাল থেকে নির্বাচন নিয়ে ৬৬ আইন ও অধ্যাদেশ হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে হয়েছে। পাঁচটি অধ্যাদেশ জারি করেছে বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বাকি ছয়টি করেছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সরকার।
গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর শেরাটন হোটেলে ঢাকা সফররত রিকার্ডো চেলারির নেতৃত্বে ইইউর ছয় সদস্যের তথ্যানুসন্ধানী দলের সঙ্গে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তারা দাবি করেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে ইইউ প্রতিনিধিদল কোনো কথা বলেনি। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী তা জানতে চেয়েছে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের কাছে। আলোচনায় তারা বিএনপির দেওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই করার জন্য ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতারা দাবি করেন, নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে আমরা যা বলেছি তাতে ইইউ প্রতিনিধিদল আশ্বস্ত হয়েছে। নির্বাচন ও নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি সমালোচনা, সমস্যা থেকেই থাকে এমন যুক্তিও তুলে ধরেন। তাদের এই যুক্তির সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদল একমত পোষণ করেছে। তারা স্বীকার করেছেন, পৃথিবীর কোথাও একেবারেই নিখুঁত নির্বাচনীব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে সুইজারল্যাণ্ডের তুলনা তো চলবে না।
আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের দাবি, ইইউ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলেছেন, পৃথিবীর সব দেশেই নির্বাচনীব্যবস্থা ও নির্বাচন নিয়ে ছোটখাটো সমস্যা থাকে। পশ্চিমা বিশ্বেও নির্বাচনীব্যবস্থা নিয়ে অনেক সমস্যা আছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ইইউ প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, ঢাকা সফরের সার্বিক বিষয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক, তাদের অবস্থান লিখিত আকারে ইইউর প্রতিনিধিদল তাদের সরকারকে অবহিত করবে।
আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানিয়েছেন, বৈঠকে তারা ভোটের সময় বিএনপির সহিংসতার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ২০১৪ সালেও ভোট বন্ধে বিএনপির অগ্নি-সন্ত্রাসের কথা জানিয়েছেন। ২০০১ সালে বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়ায় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বিএনপি-জামায়াতই ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগ ঘটায়নি। নির্বাচনের আগের ও পরের সহিংসতার ইতিহাস বিএনপি-জামায়াতের আছে, আওয়ামী লীগের নেই।
অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে ইইউ প্রতিনিধিদল তেমন কিছু বলেনি দাবি করে আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বলেছি কোনো দল নির্বাচনে এলে তাকে আমরা স্বাগত জানাব। এতে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে। কোনো দল যদি নির্বাচনে আসতে না চায়, তাহলে সংবিধান বা আইন মোতাবেক সেই দলকে জোর করে নির্বাচনে আনার সুযোগ কারও নেই।’ তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদল একমত হয়েছে বলে ওই নেতা দাবি করেন।
আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা দাবি করেছেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ উঠলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান জবাব দেন। তিনি বলেছেন, ২০১৪ সালে বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে সরকার। নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়। বিএনপি তা প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন ঠেকাতে আগুন-সন্ত্রাস করে। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে হত্যা করে ও ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন করে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে টাকার বিনিময়ে একটি আসনে তিন/চারজন করে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। নিজেরা নিজেরা মারামারি করে নির্বাচন বিতর্কিত করতে সরে দাঁড়ায়।
আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পরিকল্পনা, বাংলাদেশের নির্বাচনীব্যবস্থা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের উপযোগী কি না ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিবন্ধকতাগুলো কী আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের কাছে জানতে চেয়েছে ইইউ প্রতিনিধিদল। সরকারি দলের প্রতিনিধিরা ইইউ প্রতিনিধিদলকে প্রশ্ন করার কথা বললে তারা বলেন, ‘আপনারাই বলুন। আমরা শুনব।’
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, তারা বলেছেন, ইইউ প্রতিনিধিরা শুধু শুনেছেন। তারা আরও বলেন, বিদেশে যেসব মিথ্যা তথ্য দিয়েছে বিএনপি এবং তাদের যেসব দাবি রয়েছে, তারা সেগুলো তুলে ধরে খণ্ডন করেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য অ্যাম্বাসাডর জমির, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ, আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মি আহমেদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য তারানা হালিম ও মোহাম্মদ এ আরাফাত।
বৈঠকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ইইউ প্রতিনিধিদলকে আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর প্রস্তাব দেন। ইইউ প্রতিনিধিদলকে তিনি বলেন, আপনাদের টিম আসুক। স্বচক্ষে দেখুক, প্রধানমন্ত্রী যে কথা দিয়েছেন তিনি তা রেখেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগোচ্ছে ইইউ প্রতিনিধিদের তারা সেটা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সংবিধান ও বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের মাধ্যমে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) পৃথক করা হয়েছে। আগে বাংলাদেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের একক ক্ষমতা ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাই গত বছর এ আইন সংশোধন করে ইসিকে স্বাধীন করে দেন। যেখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেই।
তারা জানান, সর্বশেষ সংসদ অধিবেশনে আরপিও সংশোধনী বিল পাসের কথা তুলে ধরে ফারুক খান ইইউকে প্রতিনিধিদলকে বলেন, ভোটের সময় পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর কেউ হামলা করলে শাস্তির বিধানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভোটের কারচুপি করেছিল। সে সময় ব্যালট পেপারে শুধু সিল থাকলেও চলত। সেই নিয়মের পরিবর্তন আনা হয়েছে নতুন আইনের মাধ্যমে। এখন ব্যালট পেপারে শুধু সিল থাকলেই হবে না, স্বাক্ষর থাকার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। ভোট কারচুপি বন্ধ করা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই হয়েছে এগুলো। সম্প্রতি শেষ হওয়া পাঁচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়েছে, সেটাও তুলে ধরা হয় ইইউ প্রতিনিধিদলের কাছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম ইইউ প্রতিনিধিদলকে বলেছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারলেই সুষ্ঠু নির্বাচন এবং জিতলে সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, এ অবস্থান থেকে বিএনপিকে সরে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের এমন অনেকগুলো সংসদীয় আসন রয়েছে যে, যতবারই নির্বাচন হয়েছে ততবারই আওয়ামী লীগ পাস করেছে। সেখানে আওয়ামী লীগ জিতলেও বিএনপি বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। ইইউ প্রতিনিধিদলের কাছে তিনি দাবি করেন, নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশিদের কাছে বিএনপি যেসব তথ্য-ডেটা দিয়েছে সেগুলো একপেশে। তাদের দেওয়া তথ্য-ডেটাগুলোও পক্ষপাতদুষ্ট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এগুলো যাচাই-বাছাই করার আহ্বান জানান তিনি।
সূত্র জানায়, ইইউ প্রতিনিধিদলকে তারানা আরও বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকারের যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেখানে বিএনপি ভোট বর্জন করলেও দলটির তৃণমূলের নেতারা ভোট করেছেন, কোথাও কোথাও জিতেছেনও। এতেই প্রমাণ হয় বিএনপির তৃণমূল নেতারা বিশ্বাস করেন শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় এবং সম্ভব। এ ছাড়াও ভোটের সময় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। নির্বাচন ভবন থেকে সেটা সরাসরি মনিটর করা হবে। সেখানে কোনো কারচুপি হয়েছে কি না তা সবাই দেখতে পারবে।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনের দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ এ আরাফাত কথা বলেছেন বলেও সূত্র জানায়। সূত্র মতে, আরাফাত বলেছেন, সরকারি দলের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে তিনি কোনো ধরনের অগ্রাধিকার পাচ্ছেন না। অন্যান্য প্রার্থী নিয়ম ভঙ্গ করে পোস্টার লাগিয়েছেন।
