অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ১০:৩০ পিএম

বাংলা ভাষার প্রবাদ বাক্যগুলো অসাধারণ। জীবনের অভিজ্ঞতার নির্যাস যেন প্রকাশিত হয় একেকটি প্রবাদবাক্যে। যেমন মোটে মায়ে রান্ধে না, তপ্ত আর বাসি। অর্থাৎ মা তো ভাতই রান্ধে না,  তার আবার গরম আর ঠাণ্ডা ভাত।  কিংবা ভাতের হাঁড়ির একটা চাল টিপলেই বোঝা যায়, চাল সেদ্ধ হয়েছে কি না? সম্প্রতি জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন দেখে এই প্রবাদটি মনে পড়লে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হবে না। বিগত সাধারণ নির্বাচনগুলোর যে চেহারা দাঁড়িয়েছে তার আবার উপনির্বাচন। আর একটি নির্বাচন দেখে ভবিষ্যৎ নির্বাচন সম্পর্কেও আঁচ করা যায়। কেমন দাঁড়াতে পারে তার চেহারা আর নির্বাচন নিয়ে শাসক দলের পরিকল্পনা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেমন হতে পারে তার মহড়া কি দেখা গেল এই উপনির্বাচনে? নাকি মানুষ বলবে, জাতীয় নির্বাচন নিয়েই সন্দেহ, তার আবার উপনির্বাচন?

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে অনুষ্ঠিত হলো এই উপনির্বাচন। ইভিএম না ব্যালট এই বিতর্ক আপাতত স্থগিত। ফলে এই উপনির্বাচনে ভোট হয়েছে কাগজের ব্যালটে। রাজধানীর গুলশান, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন। একদিকে প্রবল ধনী, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ভোট, হাঁসফাঁস করা মধ্যবিত্ত, জীবনের চাপে চ্যাপ্টা হওয়া নিম্ন মধ্যবিত্ত আর বস্তিবাসী বিপুল ভোটার এই মিলে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৫ হাজার ২০৫ জন। এই আসনে ১২৪টি ভোটকেন্দ্র আর ৬০৫টি ভোটকক্ষ নির্ধারণ করা হয়েছিল ভোট গ্রহণ করার জন্য।  

নির্বাচনী সহিংসতা আমাদের দেশের নির্বাচনে কিছুটা হয়েই থাকে। নির্বাচনে টাকার খেলা হয়, প্রচার প্রচারণা, নানা ধরনের কৌশলের নামে কারসাজি হয়, এটা প্রায় গা-সহা হয়ে গেছে। নির্বাচনে মানি, মাসল আর মেনিপুলেশনের কাছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যে পিছু হটে তা দেশের মানুষ দেখে এবং জানে। সমর্থকরা সংঘাতে লিপ্ত হলেও নির্বাচনের প্রচারণা ও নির্বাচনের দিনে প্রার্থীকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এবং সম্মান দেখানোর একটা সংস্কৃতি চালু ছিল। তাই নির্বাচনের দিনে প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা খুব একটা বেশি ঘটেনি। ২০১৮ সালে বরিশালে মেয়র নির্বাচনের দিনে ভোট জালিয়াতির প্রতিবাদ করায় বাসদের মনীষা চক্রবর্তীর ওপর হামলা হয়েছিল। সেই ঘটনার কোনো প্রতিকার হয়নি বা নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২৩ সালেও বরিশালে মেয়রপ্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। সর্বশেষ উপনির্বাচনে এমপি প্রার্থী হিরো আলমের ওপর হামলা ব্যাপক প্রচারিত হয়েছে।   

উপনির্বাচন নিয়ে নির্বাচনী কেলেংকারি ও আন্দোলন কম হয়নি। ১৯৯৪ সালের মাগুরা জালিয়াতিপূর্ণ  উপনির্বাচন করে বিএনপিকে এর দায় এখনো বহন করতে হচ্ছে। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর উপনির্বাচনগুলো দেখলে এ কথা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ক্ষমতায় থেকে উপনির্বাচন করতে হলে ক্ষমতাসীন দলের সবার আগে বিসর্জন দিতে হবে লজ্জা। কিন্তু লজ্জাহীনতারও তো একটা সীমা থাকে। ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন দেখিয়েছে এর কোনো সীমা নেই।     

নির্বাচনের পর রাত ৯টার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তা এই উপনির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করেন। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আরাফাত ২৮ হাজার ৮১৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলম পেয়েছেন ৫ হাজার ৬০৯ ভোট। জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিকদার আনিসুর রহমান পেয়েছেন ১ হাজার ৩২ ভোট। হিসাব অনুযায়ী এই উপনির্বাচনে ভোট পড়ার হার ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ। 

শুধু এই নির্বাচন নয়, এ যাবৎকালে অনুষ্ঠিত সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যাচ্ছে। যা নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী বাংলাদেশের জনগণের মানসিকতার সঙ্গে মিলছে না। গত কয়েকটি নির্বাচনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের ভূমিকা দেখে মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা এর অন্যতম কারণ বলে মনে হতে পারে।  বিএনপির সংসদ সদস্যদের ছেড়ে দেওয়া ছয়টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন হয়েছে গত ১ ফেব্রুয়ারি। এসব আসনে গড়ে ভোট পড়েছিল ২৮ শতাংশ। অবশ্য এর আগে কেএম নূরুল হুদা কমিশনের সময় ২০২০ সালের মার্চে ঢাকা-১০ উপনির্বাচন হয়েছিল ইভিএমে। সেই নির্বাচনে মাত্র ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পড়েছিল।    

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ক্ষমতায় থেকে যে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা অহরহ বলছেন, তাদের উন্নয়ন দেখে জনগণ মুগ্ধ আর প্রতিপক্ষ ক্ষুব্ধ। বিরোধী দলগুলোর পক্ষে আর জনমত নেই, জনগণ সব সরকারের সমর্থক হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচনে এই নেতাদের  দলের লোকেরাও কেন ভোট দিতে আসে না তার কারণ কী? বিপুল প্রচারের পরও সরকারদলীয় প্রার্থী মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে কেন্দ্রে (৬৩ নম্বর) ভোট দেন, ওই কেন্দ্রে সকাল ৯টা পর্যন্ত ভোটের হার ছিল শূন্য দশমিক ৬১ শতাংশ। দুপুর পৌনে ১২টায় তা দাঁড়ায় ৩ শতাংশে। এ অবস্থা চললে তো ভালো দেখায় না। তাই বেলা ২টার পর সরকারদলীয় প্রতীকের ব্যাজধারীরা কেন্দ্রে প্রবেশে করেন। এরপর বেলা সোয়া ৩টা পর্যন্ত তাদের পরিশ্রমের ফলে দেখা যায়, সেখানে ভোটগ্রহণের হার বেড়ে ১০ শতাংশ হয়েছে। এ নিয়ে কিছু সাংবাদিক প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চাইলে গুলশান থানা নির্বাচনী কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বরত নেতা প্রতীকের ব্যাজধারীদের ভোট কেন্দ্রে প্রবেশের বিষয়ে বলেন, ‘এটা কোথায় না হয়, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও তো এটা হয়।’ কী অকপট স্বীকারোক্তি!

আবার নির্বাচনে আলোচিত প্রার্থী হিরো আলমকে যখন কয়েকজন হামলা করতে এলো, তখন একাধিক পুলিশ সদস্য নিরাপত্তা দেওয়ার মতো করে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু একটু পরেই হামলাকারীদের সংখ্যা বেড়ে গেলে পুলিশ সদস্যরা সেখান থেকে সরে গেলেন। প্রার্থীকে চড়-থাপ্পড়, লাথি দেওয়া দেখেও  সরে যাওয়া একজন পুলিশ সদস্যকে সাংবাদিক যখন জিজ্ঞাসা করলেন, প্রার্থীকে মারধর করা হচ্ছে, আপনারা কী করছেন? তখন সেই পুলিশ সদস্য তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের সীমার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা ইনার কর্ডনে। আউটার কর্ডনের বিষয় আমাদের না।’ ঠিকই তো। হামলাকারীরা বেআইনি কাজ করলেও, পুলিশ তো সীমা লঙ্ঘন করতে পারে না। 

ঘটনা এখানেই শেষ নয়, প্রার্থীর ওপর  হামলাকে ‘নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। ফলে  প্রশ্ন উঠল, কারা চেয়েছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। নিশ্চয়ই বিরোধী পক্ষ। কিন্তু হামলার ফুটেজ দেখে পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করল, তারা সবাই সরকারদলীয়। তাহলে, ভোটকেন্দ্রে ঢুকে যাওয়া, প্রার্থীর ওপর হামলা করা আর নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে যে কথা বলা হয়েছে  আর বাস্তবে যা ঘটেছে তার হিসাব মেলানো কি কঠিন? 

নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কার? বলা হয় নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকেন, তারাও নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকার কথা। সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যে রূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেই রূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন।’ এই ক্ষমতা হাতে নিয়ে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন এবং ভোটার ও প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, এটা প্রত্যাশা করা অনুচিত কি? কিন্তু ভোটার তো দূরের কথা, প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়েই যে দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে তাতে নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিতে হবে এই ভেবে, যদি ভোটাররা ঘরে বসে থাকেন তাহলে তাদের দোষ দেওয়া যাবে কি? 

সে কারণেই হয়তোবা নির্বাচনের দিন ঢাকা-১৭ আসনের ৮৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোটার তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়েছেন ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে। এ অবস্থা চললে ভবিষ্যতেও জান ও মান রক্ষার্থে ভোটার ও প্রার্থীরা ঘরে থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করে নেবেন। নির্বাচন কমিশনের কাজ হবে, এত কিছুর পর যেসব সাহসী মানুষ ভোট ম্যানেজ করেছেন তাদের কষ্টের ফল হিসেবে নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করে নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা। ফলে যে কোনোভাবেই নির্বাচন হলে, তাতে গণতন্ত্র চর্চা হয় না এই কথাটা কখনই যেন ভুলে না যাই। যেমন আকাশে লাল আভা দেখলেই ভোর হয় না, অস্তগামী সূর্য সন্ধ্যার আকাশকেও রক্তিম করে।     

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত