চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভি। তিনি শেখ যায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান ট্রাস্ট ও সৌদি আরব সংসদীয় মৈত্রী গ্রুপের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ চেয়ারম্যান। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন কওমি মাদ্রাসার সনদের কার্যকারিতা, মাদ্রাসাপড়–য়াদের বিদেশে উচ্চশিক্ষাসহ সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ
দেশ রূপান্তর : একজন আলেম হয়ে টানা দুবার জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনার অনুভূতি কী?
ড. আবু রেজা নদভি : আলেম হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্য হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। সংসদে যাওয়ার পর ধর্মীয় যত বিষয় আছে সব নিয়েই কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যখন যে আবদার নিয়ে গেছি, তিনি পূরণ করতে চেষ্টা করেছেন। কারণ তিনি দীর্ঘ নয় বছর ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, অতঃপর ২০১৭ সালের ১১ এপ্রিল আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর নেতৃত্বে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের সঙ্গে এক বৈঠকে কওমি মাদ্রাসার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে শিক্ষা সূচনা হয়েছে কওমি মাদ্রাসার মাধ্যমে। এটা যদি শুরু না হতো তাহলে আমরা কেউ শিক্ষিত হতে পারতাম না। ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূত্রপাত ওলামায়ে দেওবন্দের আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া হয় কওমি মাদ্রাসায়।’
দেশ রূপান্তর : আলেম হিসেবে জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্রভাবে কোন বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন?
ড. আবু রেজা নদভি : ধর্মীয় সব বিষয়েই কথা বলেছি। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সনদের স্বীকৃতি, আলেম-ওলামাদের নানা প্রসঙ্গ বিশেষ করে আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) সম্পর্কে কয়েকজন এমপি কর্র্তৃক কটূক্তি করা হলে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ করেছি।
দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম (আইআইইউসি)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, এটি কি ক্ষমতাবলে হয়েছেন?
ড. আবু রেজা নদভি : ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক ইসলামিক ইউনিভার্সিটি যখন শুরু হয়, তখন থেকে আমি এর সঙ্গে জড়িত। প্রথমেই আমি বিদেশ বিভাগের পরিচালক ছিলাম। পরে সেখানে লেকচারার হই। সেই সময় আইআইইউসির গুরুত্বপূর্ণ যত পর্ষদ যেমন, সিন্ডিকেট, ট্রাস্টিজ বোর্ড, একাডেমিক কমিটি, ফাইন্যান্স কমিটি ও বিদেশ কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সদস্য ছিলাম। কিন্তু চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াত ষড়যন্ত্র করে আমাকে সব কমিটি থেকে বাদ দিয়ে দেয়। শুধু লেকচারার পদে রেখেছিল। সেটা থেকে বাদ দিতে পারেনি। পরে দেখা গেল তাদের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-পরিস্থিতি, একাডেমিক পড়াশোনাসহ সবকিছুই নিম্নমুখী। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব ডোনার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনুদান দিয়েছে, তারা এখান থেকে সরে গেছেন। আমি এমপি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী যখন দেখলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার অবদান বেশি, তখন তিনি আমাকে ট্রাস্টিজ বোর্ডের চেয়ারম্যান বানিয়েছেন।
দেশ রূপান্তর : ট্রাস্টিজ চেয়ারম্যান হওয়ার পর উল্লেখযোগ্য কী কী পরিবর্তন আনতে পেরেছেন।
ড. আবু রেজা নদভি : চেয়ারম্যান হওয়ার পর একাডেমিক, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রিসার্চসহ সবক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। আগে ভার্সিটির ভেতর কোনো পাকা রাস্তা ছিল না। আমার ডিও লেটারের ওপর এলজিআরডি মন্ত্রণালয় সব রাস্তা পাকা করে দিয়েছে। ভার্সিটির ভেতর যে পাহাড়ি খাল আছে, সেটার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ছাপ্পান্ন কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১২টি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স হয়েছে। সম্প্রতি আইআইইউসিকে ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলি অব মুসলিম ইয়ুথ (ওয়ামি) মেম্বারশিপ সার্টিফিকেট প্রদান করেছে।
গত ২২ বছরে এই ইউনিভার্সিটির সঙ্গে বিদেশিদের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সেটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটির ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হয়েছে। এতে ত্রিশটি দেশের প্রায় ৪২ জন ভিভিআইপি ডেলিগেশন এসেছেন। আগামী অক্টোবরের ২৪-২৫ তারিখে পৃথিবীর ২০০টি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানাইজেশন ‘রাবেতা আল জামিয়াতিল ইসলামিয়া’র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আইআইইউসিতে। এই সংস্থার প্রধান সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মুহাম্মদ বিন সালমানের প্রধান উপদেষ্টা রাবেতা আলম আল ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল ড. আব্দুল করিম আল ইসা, সেক্রেটারি জেনারেল মিসরের সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. সামে আস শরীফ। তারাও সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। নিশ্চয়ই এটা দেশের জন্য বড় প্রাপ্তি।
দেশ রূপান্তর : সরকার কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদের সরকারি স্বীকৃতি দিয়েছেন। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
ড. আবু রেজা নদভি : কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন স্বীকৃতি আর হয়নি। যা কেবিনেট মিটিং এবং স্থায়ী কমিটির মিটিংয়ে পাস হয়ে পরে সংসদে পাস হয়। পরবর্তী সময় যে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাস, চার মাজহাব এবং চার তরিকার বিশ্বাসের কথা দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। শুধু কওমি শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করতে স্বীকৃতি দেওয়া। সমৃদ্ধ একটা অংশকে বাদ দিয়ে দেশ চলতে পারে না। কওমিরা মেধাবী, কওমি আলেমরা লাখ লাখ ছাত্রদের বিনামূল্যে পড়াশোনা করাচ্ছে; তাদের মূল্যায়ন দরকার। এ জন্য স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশ রূপান্তর : কওমি সনদের স্বীকৃতি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে না দিয়ে একটি সংস্থার অধীনে কেন দেওয়া হলো?
ড. আবু রেজা নদভি : প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সার্টিফিকেট দিতে। কিন্তু আলেমরা তা মানেননি। তাই স্বাধীন কর্তৃপক্ষ আল হাইয়াতুল উলইয়া গঠন করে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : এই বোর্ডের ক্ষমতা কেমন?
ড. আবু রেজা নদভি : আল হাইয়াতুল উলইয়া শক্তিশালী একটা বোর্ড। এটা চাইলে অনেক কিছু করতে পারবে এখন দরকার দাওরায়ে হাদিসের নিচের দিকে ক্লাসগুলোর স্বীকৃতি নেওয়া। আলেমদের থেকে দাবি উঠলে, আমরা প্রস্তাব পেশ
করতে পারব।
দেশ রূপান্তর : কওমি সনদ নিয়ে আইআইইউসিতে কেউ ভর্তি হতে পারবেন?
ড. আবু রেজা নদভি : অবশ্যই পারবে। কওমি মাদ্রাসার সনদ নিয়ে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ ছাত্র আইআইইউসিতে ভর্তি হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও। এর জন্য তাদের এগিয়ে আসতে হবে, আবেদন করতে হবে। প্রথমেই হয়তো হবে না, এ জন্য কিছু আইনি ধাপ মোকাবিলা করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : অনেকে কওমি সিলেবাসের সংস্কারের দাবি করছেন, আপনার কী মত?
ড. আবু রেজা নদভি : একটা সময় ছিল কওমি মাদ্রাসায় বাংলা অংক ইংরেজি পড়ানো হতো না। এখন আর সে অবস্থা নেই। এসএসসি পর্যন্ত স্কুলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিলেবাস তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং সংস্কারের প্রয়োজন মনে করছি না।
দেশ রূপান্তর : আরবের স্কলার ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আপনার ভালো সম্পর্ক। সেটাকে দেশের জন্য কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন?
ড. আবু রেজা নদভি : আরব বিশ্বের সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে, এটা সবাই জানেন। নানা কারণে বিভিন্ন দেশের সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে হয়। ওইসব জায়গায় আমি বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রীকে একজন সত্যিকারের মুসলমান হিসেবে উপস্থাপন করে থাকি। কারণ, এর আগে জামায়াত-বিএনপি সরকার ইসলামের নাম ও লেবাস ধারণ করে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি করেছে। তারা আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুকে ইসলামবিরোধী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে বিদেশে। এ কারণে সে সময়ে দেশের ও দলটির ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে। এর মোকাবিলায় আমি আমার মতো করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বদরবারে বিশেষ করে আরব বিশ্বে তুলে ধরছি অনবরত। সম্প্রতি তিন ভাষায় (বাংলা, ইংরেজি ও আরবি) বঙ্গবন্ধুর জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছি।
দেশ রূপান্তর : আপনার বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম সম্পর্কে কিছু বলুন।
ড. আবু রেজা নদভি : আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১ হাজার মসজিদসহ প্রায় ৩০ হাজার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এই সংস্থা ত্রাণ বিতরণ, শিক্ষা কার্যক্রম ও রোহিঙ্গা পুনর্বাসন ইস্যুতে কাজ করে যাচ্ছে।
