পাজেল লেখায় প্রবল আগ্রহ থাকায় বিভিন্ন দেশের পাজেল ম্যাগাজিন নিয়মিত সংগ্রহ করতেন তিনি। তার উদ্ভাবিত ‘ব্রেইন ইকুয়েশন’ নামক পাজেল সেসব বিদেশি ম্যাগাজিনে দেখতে না পারার সুপ্ত এক ব্যথায় সিদ্ধান্ত নেন পাজেলটিকে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়ার। এরপর কয়েকজন ডেভেলপারকে দিয়ে তৈরি করেন অ্যাপ, যা আইসিটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক ন্যাশনাল মোবাইল অ্যাপলিকেশন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়। এমন নাটকীয়তায় সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের নাম লেখান নাদিম মজিদ, সেটি ২০১৭ সালের মে মাসের কথা। তার সফটওয়্যার কোম্পানি ‘বাংলা পাজেল লিমিটেড’ তৈরি করছে নানা ধরনের অ্যাপ। সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন দিক, ক্যারিয়ার নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিইও নাদিম মজিদের সঙ্গে কথা বলেছেন অরণ্য সৌরভ
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শেখা কতটা যুগোপযোগী?
নাদিম মজিদ : এ সময় যারা স্কিলডপারসন হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চান, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট তাদের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে ধৈর্য, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা থাকলে দক্ষ হওয়া জরুরি।
শেখার মাধ্যম বা উপায় কী?
নাদিম মজিদ : সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট শেখার বেশ কিছু মাধ্যম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে যে কেউ ডব্লিউথ্রি স্কুল ওয়েবসাইট থেকে ফ্রন্টএন্ডের ল্যাঙ্গুয়েজ এইচটিএমএল, সিএসএস, জাভাস্ক্রিপ্ট অনুশীলন করে দেখতে পারে। এসব ল্যাঙ্গুয়েজে কেউ আগ্রহ পেলে সে ডাটাবেজ ডিজাইন শিখতে পারে। তারপর প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পাইথন, পিএইচপি, নোড জেএসের যে কোনো একটি পছন্দ করতে পারে। অন্যদিকে কেউ মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার হতে চাইলে অ্যান্ড্রয়েড স্টুডিও, ফ্ল্যাটার কিংবা সুইফট থেকে সুবিধাজনক যে কোনো একটি প্ল্যাটফরম বেছে নিতে পারে। গেইম ডেভেলপার হতে চাইলে সি শার্প এবং ইউনিটি শিখতে পারে।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কর্মক্ষেত্রে সফলতা কতটা।
নাদিম মজিদ : সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে দক্ষ লোকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আমরা জানি, সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ কমে আসছে। লোকবল কম লাগছে। যে কোনো তথ্য তাৎক্ষণিক পাওয়া যাচ্ছে। তাই, ছোট-বড় সব কোম্পানিই সফটওয়্যার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। চাহিদা অনুসারে দক্ষ জনবলের সংকট শুধু দেশে নয়, ইউরোপ আমেরিকায়ও রয়েছে। তবে নিজেকে দক্ষ জনবল হিসেবে তৈরি করতে পারলে এই ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো চাহিদা রয়েছে।
দেশে সফটওয়্যার শিল্পের সম্ভাবনা কতটুকু?
নাদিম মজিদ : বাংলাদেশে সফটওয়্যার শিল্পের ১০ ভাগও এখনো বিকশিত হয়নি। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেকাংশই এখনো অফলাইনে কাজ করছি। আমাদের এখনো মেসেঞ্জার, হোয়াটসআপ ব্যবহার করে কথা বলা, ঢাকাসহ কিছু শহরে উবার, পাঠাওয়ে রাইড রিকোয়েস্ট দেওয়া, ফুড ডেলিভারি অ্যাপে খাবার অর্ডার দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আমরা যেদিন বাসায় বসে প্রয়োজনীয় সব কাজ করে ফেলতে পারব, সেদিন সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশ শতভাগ সম্পন্ন হবে।
দেশে এই শিল্পের প্রতিবন্ধকতা কী কী?
নাদিম মজিদ : এ শিল্পের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের ম্যানেজমেন্ট পর্যায়ে থাকা ব্যক্তিদের আইটির প্রতি অনাগ্রহ এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চিন্তা না থাকা।
উত্তরণের উপায়?
নাদিম মজিদ : প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য বেশ কিছু কাজ করতে হবে। প্রথমত, সফটওয়্যার শিল্প দিয়ে কী কী করা সম্ভব তার সম্পর্কে হাতেকলমে না হলেও ভিডিও আকারে দেখাতে হবে। সফটওয়্যার ব্যবহার করার কারণে অন্যরা একই সেক্টরে কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তার কেইস স্টাডি সেক্টর বাই সেক্টর তুলে ধরতে হবে। দ্বিতীয়ত, যে কোনো সফটওয়্যার কোনো প্রতিষ্ঠানে চালু করার সময় এককালীন একটি খরচ রয়েছে। যেমন- সফটওয়্যার উপযোগী পিসি, ডিভাইসের ব্যবস্থা করা, জনবলকে প্রশিক্ষিত করা, সফটওয়্যার ইনস্টল করার প্রাথমিক খরচ ইত্যাদি। এ ধরনের খরচের ক্ষেত্রে সরকার ৫০% টাকা ভর্তুকি দিতে পারে। এতে যেমন আইটি সেক্টর ডেভেলপ হবে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোও স্মার্ট হবে।
বাংলা পাজেলের কাজগুলো
নাদিম মজিদ : আমরা গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জন্য আর্টিস্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরি করেছি। এ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুদের ডিজিটাল ভেরিফিকেশন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জন্য অবজেক্ট স্টোর ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের কাজ করেছি। এ সফটওয়্যার জাদুঘরের যে কোনো নিদর্শন অবস্থান ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।
কাজের ক্ষেত্র?
নাদিম মজিদ : গুগল, ফেসবুকের মতো বিদেশি সফটওয়্যার কোম্পানিতেই বাংলাদেশিরা চাকরি করছেন। বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা করে ইন্টারভিউ দিয়ে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। ভবিষ্যতে এসব কোম্পানি বাংলাদেশে অফিস খুলবে। সেখানেও আরও ভালো রকমের চাহিদা তৈরি হবে। মজার বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অধিকাংশ কাজ অন্য কোম্পানির মাধ্যমে আউটসোর্স করে থাকেন। এতে আমাদের দেশের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোও লাভবান হবেন। দেশীয় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো সরাসরি অ্যাপ ডেভেলপার নিয়ে কাজ করে থাকেন। তাদের প্রতিষ্ঠানে অ্যাপ ডেভেলপাররা সরাসরি নিয়োগ পায়। আবার, অনেক বড় কোম্পানির নিজস্ব আইটি টিম রয়েছে। সেখানেও অ্যাপ ডেভেলপারদের কাজের সুযোগ রয়েছে। অ্যাপ ডেভেলপাররা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ না করে দেশ-বিদেশের প্রতিষ্ঠানেও ফ্রিল্যান্সিং করার সুযোগ রয়েছে।
উপার্জন কেমন?
নাদিম মজিদ : বাংলাদেশে একজন অ্যাপ ডেভেলপার ২৫,০০০-৩০,০০০ টাকা বেতনে ক্যারিয়ার শুরু করে থাকেন। অভিজ্ঞতার সঙ্গে বেতনও বাড়তে থাকে।
কেউ সফটওয়্যার কোম্পানি তৈরি করতে চাইলে কী করতে হবে?
নাদিম মজিদ : সফটওয়্যার কোম্পানি তৈরি করার কাজ অন্যান্য কোম্পানির মতো একই ধরনের হয়। এ ক্ষেত্রে সফটওয়্যার তৈরি এবং বিক্রয়ে জোর দিতে হবে।
