গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার প্রতিনিধি ইকবাল মনোয়ারকে। এবার তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গণমাধ্যমে বিভ্রান্তমূলক মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগ এনে তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কুবি কর্র্তৃপক্ষ। ১০ আগস্ট লিখিত বক্তব্যসহ তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হতে বলা হয়েছে ইকবালকে।
গত ৬ আগস্ট কুবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. আমিরুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈনের বক্তব্যকে ‘বিকৃত করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তমূলক মিথ্যা তথ্য’ গণমাধ্যমে প্রকাশের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যসহ তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে ইকবালকে। তবে গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারেন না বলে মতামত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
পেশাগত কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তদন্ত কমিটি গঠনের আইনি ভিত্তি নেই দাবি করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তিনি সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে প্রতিবাদলিপি কিংবা কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বিধি লঙ্ঘন ছাড়া শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই।’
এদিকে কখন ও কার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে জানেন না ভুক্তভোগী ইকবাল মনোয়ার। তিনি বলেন, ‘কার ও কী অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। তদন্ত কমিটিতে কারা আছেন, তাও জানি না আমি। প্রশাসন আমাকে ফাঁসাতেই প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইকবালের বিরুদ্ধে কেউ লিখিত অভিযোগ করার বিষয়ে কিছু জানেন না তারা। প্রশাসন বরং স্বপ্রণোদিত হয়েই ইকবালের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইকবালের বিরুদ্ধে কারও লিখিত অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও কীসের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট করে বলছেন না কেউ। গত ২ আগস্ট প্রক্টরিয়াল বডি ইকবালকে বহিষ্কার করতে সুপারিশ করে প্রতিবেদন তৈরি করে। সে প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই কুবি প্রশাসনের ‘উচ্চপর্যায়ের সভায়’ ইকবালকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে সভার প্রধান ছিলেন স্বয়ং উপাচার্য নিজে। এ ছাড়া ‘উচ্চপর্যায়ের সভা’ নামেও কোনো কাঠামো এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই।
ইকবালকে বহিষ্কারসংক্রান্ত প্রক্টরিয়াল বডির প্রতিবেদন কোন বা কার অভিযোগের ভিত্তিতে করা হয়েছে, সে সম্পর্কে জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর কাজী ওমর সিদ্দিকীর কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া মেলেনি।
তবে ইকবালের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পক্ষপাতমূলক বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২ আগস্ট উপাচার্যের পক্ষে মানববন্ধনে অংশ নেন তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এনএম রবিউল আউয়াল চৌধুরী ও সদস্য প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকী। এ ছাড়া জবাব চেয়ে ইকবালকে দেওয়া তদন্ত কমিটির চিঠিতে ইতিমধ্যে বিষয়টিকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এ কমিটি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয় বলে দাবি করছেন ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
কুবি সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহমেদ ইউসুফ আকাশ বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সদস্যরা ইতিমধ্যে একটি পক্ষাবলম্বন করেছেন। এ ছাড়া অভিযোগটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধরেই চিঠি দিয়েছেন। অর্থাৎ তারা আগে থেকেই একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। এখন সে সিদ্ধান্তকে তদন্তের নামে বৈধতা দিতে চাচ্ছেন মাত্র। তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়।’
কুবি প্রশাসন ইকবালকে ইচ্ছাকৃতভাবে শাস্তি দিতেই এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মত দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসাইন। তিনি বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। অভিযুক্তকে কোনো কিছু না জানিয়ে যদি শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে এটা যে বিদ্বেষমূলক ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত তা সহজেই অনুমান করা যায়। ইচ্ছাকৃতভাবে শাস্তি দেওয়ার জন্যই এটি করা হয়েছে।’
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্যই করতে চান না রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আমিরুল হক চৌধুরী। অভিযোগ ও তদন্ত কমিটির বিষয়ে অন্তত ছয়টি প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরেই তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি নই।’
একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তার কার্যালয়ে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেননি।
