মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন জাহিদ উদ্দিন। কাজ করেন স্থানীয় একটি বেকারি দোকানে। সপ্তাহ হিসেবে তিনি বেতন পান। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি দিনে ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম সয়াবিন তেল কিনে থাকেন। এক লিটার বোতলজাত তেল কেনার সামর্থ্য হয় না তার।
বুধবার (৯ আগস্ট) মিরপুরের একটি কাঁচাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসেন জাহিদ। সে সময়ে তার সাথে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জীবনযাত্রার সব খরচ বেড়েছে। গত এক বছরে তেলের দাম অনেক বেড়েছে। প্যাকেটজাত বা বোতলে বিক্রি হওয়া সয়াবিন তেলের দাম খোলা তেলের চেয়ে বেশি। আমি সপ্তাহে বেতন পাই। আমার মতো অনেক মানুষ আছে দিন আনে দিন খায়। তারা একবারে এক লিটার তেল কীভাবে কিনবে? আমার পক্ষে একবারে এক লিটার প্যাকেটাজাত সয়াবিন তেল কেনা সম্ভব না। সরকার খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এতে আমার মতো অনেকে চাপে পড়বে।
বর্তমানে বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৯ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে, খোলা সয়াবিন তেল এক লিটার ১৬৭ টাকা থেকে ১৫৯ টাকায় পাওয়া যায়। সয়াবিন তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় যাদের পক্ষে এক লিটার, পাঁচ লিটারের তেলের বোতল বা প্যাকেট কেনার সামর্থ্য নেই, তারা অল্প পরিমাণে খোলা তেল কিনে কাজ চালিয়ে নেন। সরকার আইন করে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধে নির্দেশ দিয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এ নির্দেশ কার্যকর হলে বিপাকে পড়বে সীমিত আয়ের মানুষ।
ভোজ্যতেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধে সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে আরও ছয় মাস সময় চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে।
অনেকে অভিযোগ করেছেন, খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ হলে যারা নিয়মিত এ তেল খায় তারা বাধ্য হয়েই প্যাকেটজাত সয়াবিন তেল কিনবেন। আর এতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে বাজারে সয়াবিন তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বছরে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা আছে। এই তেলের ৭০ শতাংশ পাম তেল। বাকি ৩০ শতাংশ সয়াবিন। সয়াবিনের ৫০ শতাংশ খোলা বিক্রি হয়। বাকি ৫০ শতাংশ বোতলজাত করে বিক্রি হয়। গত বছর এ সময়ে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১২০ টাকায় পাওয়া যেত। দেশে ভোজ্যতেলের বাজার প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। পাম অয়েল পরিশোধিত অবস্থায় এনে বাজারজাত করা হয়। সয়াবিন তেল অপরিশোধিত অবস্থায় এনে দেশে পরিশোধন করে বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে অনেক সময় বাজারে ভোজ্যতেলে কৃত্রিম সংকট তৈরী করা হয়। অন্যদিকে, আর্ন্তজাতিক বাজারে গত মাস থেকে ভোজ্যতেলের দাম কিছুটা কমলেও দেশের বাজারে দফায় দফায় বেড়েছে। আর এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। আমাদের দেশে ভোজ্যতেলের বাজার বড় বড় চার কম্পানির নিয়ন্ত্রণের। এরা হল- টি কে গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, এস আলম ও মেঘনা গ্রুপ। গত অর্থবছরে ৯০ শতাংশ ভোজ্যতেল আমদানি করেছে এ চার প্রতিষ্ঠান। এসব কোম্পানি দেশের মানুষের কাছে ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে এমন কারণ দেখিয়ে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়ে থাকে। বিশেষভাবে বাণিজ্যিক ও শিল্প সুবিধার ভিত্তিতে দেশে ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়। এতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের শুল্কে ছাড় মিলে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়, গত বছর শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে শিল্প সুবিধায় ১৮ লাখ ২১ হাজার টন (পরিশোধিত ও অপরিশোধিত) ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর আমদানি মূল্য হিসাবে দেখানো হয়েছে ১১ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে অপরিশোধিত (ক্রুড) সোয়াবিন ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৩২২ টন। টি কে গ্রুপ স্থানীয় বাজারে পুষ্টি ব্র্যান্ড নামে ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি অপরিশোধিত সয়াবিন তেল শুল্কায়ন করেছে ২ লাখ ৫১ হাজার টন। এর মোট মূল্য দেখিয়েছে ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। সিটি গ্রুপ দেশের বাজারে তীর ও সান ব্র্যান্ডের মোড়কে সয়াবিন তেল বিক্রি করে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি শুধু চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন শুল্কায়ন করেছে।
বাজারে তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খোলা তেল বিক্রি বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। এর জন্য আমরা আরও ছয় মাস সময় চেয়েছি। এর পরে বাজারে আর কোন খোলা সোয়বিন তেল বিক্রি করা হবে না।
খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভোজ্য তেল সরবাররি একাধিক প্রতিষ্ঠানের কয়েক দফা বৈঠক হয়। এসব বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে, প্রথম ধাপে শুধু খোলা সয়াবিন বিক্রি বন্ধ করা হবে। খোলা সয়াবিন পুরোপুরি মোড়কজাত করে বিক্রির পরে অন্যান্য ভোজ্যতেলও এ নিয়মের আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ খোলা পাম ও পাম সুপারের মতো তেলও মোড়কজাত করে বিক্রি করা হবে। ভোজ্যতেলের সব কয়টি পদই মোড়কজাত করে বিক্রি করা হবে।
গত মঙ্গলবার (১ আগস্ট) থেকে বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে। সরকারের এ নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে। গত মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে অধিদপ্তরের ৫২টি দল তদারকিতে নামে। যদিও অধিকাংশ দোকানে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি করতে দেখা যায়।
রাজধানীর মহাখালি কাঁচা বাজারের বিক্রেতা শাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোতলজাত সয়াবিনের দাম বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই খোলা সয়বিনের চাহিদা বেড়েছে। এখনো বেশির ভাগ ক্রেতাই খোলা সয়াবিন ব্যবহার করেন।
এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজারে খোলা অবস্থায় সয়াবিন তেল যাতে বিক্রি না হয়, সে জন্য সারা দেশে ৫২টি দল গত মঙ্গলবার থেকে তদারকি করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিচার্স ইন্সটিটিউ অফ বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈশ্বিক মন্দায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সাধারণ আয়ের মানুষ তিন বেলা খাবার খরচ যোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। আগে অনেকে মাসের বাজার একবারে করে রাখতেন। এখন আর তা পারছেন না। অনেকে আর্থিক সংকটে একবারে এক লিটার সয়াবিন তেলও কিনতে পারছেন না। খোলা তেল বিক্রি বন্ধে নির্দেশ কার্যকর করা হলে অল্প আয়ের সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়বে। তাদের ওপর চাপ হয়ে যাবে।
