‘আজ ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আছে। সাভারের অনেক নেতাকর্মীই আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অনেকের কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স ও গাড়ি-বাড়ি হয়েছে। কিন্তু আমি আওয়ামী লীগের জন্য শরীরে শত শত স্প্লিন্টার নিয়ে অতি কষ্টে দিন পার করলেও সাভারের কোনো নেতাকর্মী আমার খোঁজ নেয় না।’
নিজের চিকিৎসার সুব্যবস্থা না হওয়ায় আক্ষেপ করে এভাবেই কথাগুলো বলেন ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হওয়া মাহবুবা পারভীন, যিনি শরীরে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন প্রাণঘাতী গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্লিন্টার। যেগুলোর জ্বালায় ও পোড়ায়, সারা রাত ঘুমাতে পারেন না। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও যেন প্রতিদিনই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কবে দেহে শান্তি পাবেন, সেই প্রতীক্ষায় দিন গুনছেন।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় আহত হন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মাহবুবা পারভীন। কেমন আছেন জানতে চাইলে এখনো শরীরে ১ হাজার ৭৯৭টি স্প্লিন্টার বহন করে চলা মাহবুবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্প্লিন্টারের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারি না। রাতেও দুই-তিনবার গোসল করতে হয় শরীর ঠাণ্ডা রাখতে। শত শত স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে রোগেশোকে কোনোরকমে দিন পার করছি। আমার শরীর এত খারাপ হয়েছে যে, আমি উঠে দাঁড়াতেও পারছি না। অনেকেই আমার ইন্টারভিউ নিতে আসতে চাইলেও অসুস্থতার জন্য কাউকেই আমি সময় দিতে পারিনি। আজকে আমার একটি গাড়ি নেই বলে রাত-বিরাতে অসুস্থতা বেড়ে গেলেও হাসপাতালে যেতে পারি না। এ ছাড়া বিভিন্ন দিবসসহ দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য আমার মন হাহাকার করে। কিন্তু যাতায়াতের মাধ্যম না থাকায় আমি ঘরেই পড়ে থাকি।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য প্রতি মাসে তাকে ১০ হাজার করে টাকা দেন এবং সেই টাকায় কোনোমতে ওষুধ কিনে খান বলে জানান মাহবুবা। বললেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছেন শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু সেই সামর্থ্য না থাকায় আমি বিদেশ গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারছি না। আজকে ১৯ বছর ধরে আমি শরীরে স্প্লিন্টারের খোঁচা সহ্য করে চলেছি। কিছুই করতে পারিনি। এখন আমার আর কিছু করার নেই। অনেক কঠিন অবস্থায় আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতাল থেকে ব্যাংকক গিয়ে ব্রেনের (মস্তিষ্কের) চিকিৎসা করাতে বলেছে। সেখানে ছাড়া নাকি এ চিকিৎসা ভালো হয় না। অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসার বিষয়টি আমি কখনো প্রধানমন্ত্রীকে জানাইনি। সাভারে এত নেতাকর্মী কোটিপতি হলেও আমার চিকিৎসা ও যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা কেউ করেনি। আমাকে চিকিৎসা নিতে হয় ঢাকায় গিয়ে, আমার কর্মস্থলও ঢাকায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে। একটি গাড়ি হলে আমি চিকিৎসাও করাতে পারব এবং ঢাকায় গিয়ে অফিস করতে পারব।’
ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে দলের নেতাকর্মীসহ ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ দলের কয়েকশ নেতাকর্মী আহত হন। হামলার পর আইভি রহমানের পাশে মৃতের মতো যে তিন নারী রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন, তাদের একজন সাভারের মাহবুবা পারভীন।
সেদিনের ভয়াবহতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মাহবুবা পারভীন। একপর্যায়ে বলতে থাকেন, ‘সেদিন গ্রেনেড হামলার পর আইভি রহমানের পাশেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিলাম। বেঁচে আছে নাকি মরে গেছি কেউ বুঝতে পারেনি। আমাকে মৃত মনে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের লাশঘরে নিয়ে ফেলে রাখা হয়। টানা ছয় ঘণ্টা লাশঘরে পড়ে থাকার পর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আশিষ কুমার মজুমদার লাশ শনাক্ত করতে গিয়ে আমাকে জীবিত দেখতে পান। ৭২ ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফেরে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে ভারত পাঠান। সেখানে চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও শরীরে থাকা ১ হাজার ৭০০ স্প্লিন্টার বের করতে পারেননি চিকিৎসকরা। এখনো আমি সেই স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘২১ আগস্ট এলেই সেদিনের ভয়াবহতার স্মৃতি মনে পড়ে। এখনো আঁতকে উঠি। কান্নায় চোখ ভিজে যায়। ওইদিনের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলেই ভয়ে শরীর অবশ হয়ে যায়। আজও ভয়াল সেই স্মৃতি আমাকে মৃত্যুর মতো তাড়া করে বেড়ায়।’
