এসএসসি পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়নে অবহেলা করায় পরীক্ষকের দায়িত্বে থাকা ৩৯ জন শিক্ষককে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। তারা আগামী পাঁচ বছর বোর্ডের অধীনে কোনো পাবলিক পরীক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ৫ সেপ্টেম্বর কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের নামের তালিকা প্রকাশ করে ঢাকা বোর্ড। কর্তৃপক্ষ জানায়, পরীক্ষার খাতা দেখায় অবহেলা আর সহ্য করা হবে না। এসব পরীক্ষক খাতা দেখায় অবহেলা করায় চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বহু শিক্ষার্থীর ফল ফেল আসে। পরে খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করে দেখা যায়, তারা পাস করেছে। বোর্ড পরীক্ষা খাতা দেখায় অবহেলার কারণে বোর্ড কর্তৃপক্ষ অন্তত কিছু একটি করেছে, এটি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। ২৮ জুলাই চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর ঢাকা বোর্ডে ৭৩ হাজার শিক্ষার্থী ফল পুনর্নিরীক্ষার বা খাতা চ্যালেঞ্জের আবেদন করে। ২৮ আগস্ট খাতা চ্যালেঞ্জের ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, এ বোর্ডে ফেল থেকে পাস করেছে ১০৪ জন শিক্ষার্থী। আর নতুন জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৬২ জন পরীক্ষার্থী। এ বোর্ডের মোট ৩ হাজার ৮৫ জন পরীক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে। ঢাকা বোর্ডের ৭৩ হাজার ৪৬ জন পরীক্ষার্থী এক লাখ ৯১ খাতা পুনর্নিরীক্ষার আবেদন করেছিল। খাতা দেখায় মূল্যায়নে দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার কারণে কালো তালিকাভুক্ত হওয়াদের তালিকায় আছেন বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক, ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষক, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক, গণিতের পরীক্ষক, উচ্চতর গণিতের পরীক্ষক, বিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষক, রসায়ন, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের পরীক্ষক। বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে শুধু অভিজ্ঞ কিংবা নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হলেই চলে না, সর্বোপরি যারা সিনিয়র এবং পেশার প্রতি যাদের কমিটমেন্ট আছে এবং যারা প্রাইভেট কম পড়ান তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
১৯৯১ সালে আমি ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করি। ঢাকা বোর্ড থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা পরীক্ষণের জন্য চিঠি পেলাম। সে এক আলাদা আনন্দ ও নিজেকে অনেক সম্মানিত বোধ করছিলাম। চিঠিতে লেখা সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে বোর্ড অফিসের সম্মেলন কক্ষে এক আলোচনা সভা ও খাতা পরীক্ষণের নিয়মকানুনের ওপর একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে। আমি ওই তারিখে সকাল ৮টায় বোর্ডে হাজির হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সকাল সাড়ে ৮টায় কেন, আধা ঘণ্টা আগে উপস্থিত হই এবং আরও ভেবেছিলাম যে, ঢাকা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষ নিশ্চয়ই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোনো কক্ষ এবং শিক্ষকদের বসার স্থানও সে রকম উন্নতমানের হবে। কারণ এখানে বসেই সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সকাল সাড়ে ৮টা তো দূরের কথা, দুপুর ১২টার দিকে দেখলাম দু’একজন শিক্ষক হাতে একটি করে চটের বস্তা নিয়ে আস্তে আস্তে সম্মেলন কক্ষের দিকে আসছেন। আর সম্মেলন কক্ষটি এসি তো দূরের কথা, ভাঙাচোরা শব্দ করা ফ্যান আর বসার জন্য বিয়ের ডেকোরেটর থেকে সম্ভবত ভাড়া করা কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার। গ্রীষ্মকাল, বেশ গরম পড়ছিল। দুপুর ১টার দিকে মিটিং শুরু হলো। মাননীয় পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এসে শিক্ষকদের সামনে কথা বলা শুরু করলেন। অমনি সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু শিক্ষক দাঁড়িয়ে বললেন, ‘গত বছর খাতা দেখার বিল এখনো পাইনি, এবার বিল না পাওয়া পর্যন্ত কোনো খাতা নেব না।’ শুরু হলো চিৎকার-চেঁচামেচি। মোটামুটি উপস্থিত সবাই তাতে অংশ নিলেন। একপর্যাযে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তার অসহায়ত্বের কথা বললেন। শিক্ষার এই করুণ হাল দেখে পুরোটাই আশা ভঙ্গ হয়েছিল আমার। তখন ভেবেছিলাম আমার দেশের শিক্ষার এই করুণ হাল! কবে দূর হবে এসব? সেখানে শিক্ষকদের বসার ভালো ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয় অনেকটাই স্মার্ট হতে পারত। এতদিনে হয়তো অনেক পরিবর্তন হয়েছে! পরের বছর ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষক। ঢাকা সিটির দুটি কলেজের খাতা পেলাম। খাতা পাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে ঢাকা থেকে ১৮-২০ জন শিক্ষার্থীর একটি দল ঘাটাইলে চলে গেছে। ক্যান্টনমেন্ট বিধায় ভেতরে কেউ যায়নি বা যেতে পারেনি। আমাদের কলেজেরই লোকাল এক ছাত্রের মাধ্যম খবর পাঠাল, তাদের পাস করিয়ে দিলে তারা সবাই মিলে মোটা একটি অঙ্কের টাকা আমাকে দেবে। আমি ওই ছেলেকে বলেছিলাম জীবনে কী হবো জানি না, আমার মনের এখন যে অবস্থা সেটি কতদিন থাকবে তাও জানি না, তবে মনে রেখো আমাকে এসব বলে লাভ নেই।
তারপর ক্যাডেট কলেজে যোগদান করি, সিলেট ক্যাডেট কলেজ। তারপর কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজে বদলি হই। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে খাতা আনতে গিয়ে প্রতি বছরই একই চিত্র, বরং আরও ভয়াবহ চিত্র দেখতাম। একবার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হাতজোড় করে শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন আর বলছেন, ‘এই চেয়ারে আপনারা আসেন, বসেন, দেখেন কত কঠিন। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া আমি কীভাবে কাজ করব?’ বুঝলাম কলেজ থেকে ডেপুটেশনে যাওয়া শিক্ষকগণ যত বড় পদেই থাকুন না কেন, তারা অনেকটাই অসহায়।
কুমিল্লা থেকে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে চলে এলাম, আবার ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষক। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে চাকরি ইস্তফা দিয়ে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যোগদান করলাম। অর্থাৎ ঢাকা বোর্ডেরই পরীক্ষক। প্রতি বছরই বোর্ডে খাতা আনতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতাম। ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শিক্ষকদের খাতা মূল্যায়নের বিভিন্ন কা-কারখানা প্রমাণসহ দেখাতেন। কিছু শিক্ষক বোর্ডের খাতা নিয়ে পাশের দেশে চলে গেছেন, জীবনে আর ফিরে আসেননি। এক শিক্ষক খাতা নিয়ে লঞ্চে উঠেছিলেন, লঞ্চডুবি হয়েছে সঙ্গে খাতা ডুবিও হয়েছে। স্বভাবতই, ফল বিড়ম্বনা। আমার জানা এক শিক্ষক উচ্চ মাধ্যমিকের ইংরেজি খাতা দেখিয়েছিলেন তার স্ত্রীর দ্বারা, যিনি নিজেও ওই বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন এবং ইংরেজিতে ফেল করেছিলেন। এক পরীক্ষক এক বান্ডেল খাতা বাসে ফেলে রেখে বাসায় চলে গেছেন। বাসের কন্ডাক্টর রাতের বেলা গাড়ি পরিষ্কার করার সময় বান্ডিলটি পান এবং পরদিন সকালে পরিচিত কারোর সঙ্গে আলাপ করার পর এক সাংবাদিকের হাতে খাতার বান্ডেল তুলে দেন। তিনি জায়গামতো বান্ডিলটি পৌঁছে দিয়েছিলেন, ফলে মন্ত্রণালয় থেকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে ডেকে পাঠিয়েছেন তৎকালীন মাননীয় মন্ত্রী।
বোর্ডগুলো স্বায়ত্তশাসিত কিন্তু নিজেদের সেই স্বায়ত্তশাসন তারা কতটুকু কাজে লাগাতে পারে বা লাগায় সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। দেখা যায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ বা ইশারা ছাড়া তারা কিছুই করতে চায় না। ফলে একটি ট্র্যাডিশন হয়ে গেছে এবং মন্ত্রণালয়ের আমলারা সেভাবেই আচরণ করেন বোর্ডের সঙ্গে।
জীবনে কিছু পরীক্ষককে দেখেছি সর্বোচ্চ সততার সঙ্গে, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন করেছেন যাদের অনেকেই আজ পৃথিবীতে নেই। আবার এমন কিছু পরীক্ষককেও দেখেছি যারা বলতেন খাতায় বেশি বেশি নম্বর দেবেন। বেশি নম্বর দিলে রিস্ক কম। কেউ আপনাকে কিছু বলবে না। কিন্তু যদি কম দেন তাহলেই দেখবেন যত ঝামেলা। অর্থাৎ মূল্যায়ন কিন্তু হচ্ছে না এসব শিক্ষকদের কাছে। আবার কিছু পরীক্ষক বোর্ডের খাতা বারবার নিয়ে আসতেন। তারা বলতেন, একটি খাতা ফেলতে পারলেই তো ১২-১৫ টাকা খাড়া। এত সময় নষ্ট করার কী আছে। শেক্সপিয়ারের ‘এস’ দেখলেই নম্বর দিয়েছি। এর ফলে আমরা দেখি যেসব শিক্ষার্থী ফেলের খাতায় থাকত তারাও কল্পনার বাইরে নম্বর পেয়ে পাস করে। এখন যেটি হয়েছে, শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই নাকি ফেল করানো যাবে না! ফলে শিক্ষকরাও সেই রকম করেন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আমরা মূল্যায়ন নিয়ে যত আলোচনা, যত কথা বলি, কীভাবে শিক্ষার্থীদের শেখানো হবে বা তারা কীভাবে শিখবে, এসব নিয়ে সিকিভাগের এক ভাগ কথাও বলি না। যদি শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয় শেখাতেই না পারি, তাহলে কী মূল্যায়ন করব?
লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
