প্রেমাদাসা ময়দান থেকে হোয়াইট হাউজ

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:১১ এএম

একই দিনে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩-এর তিনটি সুসংবাদ হজম করার মতো পর্যাপ্ত ‘পাচক রস’ সবার থাকার কথা নয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত-বাংলাদেশ অন্তরঙ্গ সম্পর্কের বর্ণনায় অন্যরকম ইঙ্গিত দিলেও, দ্বিপক্ষীয় পররাষ্ট্র নীতির দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সেই বর্ণনা থেকে দেশটাকে অনেকটাই রক্ষা করেছেন, দুর্জনেরাও এটা স্বীকার করবেন।

এশিয়া কাপে বরাবরের মতো উপরে উঠে ছিটকে পড়লেও, দেশে ফেরার আগে কলম্বোর প্রেমাদাসা ক্রিকেট মাঠে সুপার ফোরের শেষ খেলায় শুভমান গিলের সেঞ্চুরিকে কেবলই এই তরুণ ডানহাতি ব্যাটসম্যান (নাকি ব্যাটার, ব্যাটার লিখতে এখনো যে অস্বিস্তবোধ হয়) ও অফ-ব্র্যাক বোলারের হা-হুতাশের জন্য সংরক্ষিত রেখে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় আম্পায়ারের পক্ষপাতিত্ব ও স্বৈরাচারের শিকার হয়েও ইন্ডিয়ান (নাকি ভারতীয়) ক্রিকেটে বহু বছর পর একটি ঘা দিতে পেরেছে। ক্রিকেট পিচের ভেতর ও বাইরের খবর যারা রাখেন,  কাজে না লাগা এই সেঞ্চুরিকে শুভমানের সম্ভাব্য শ্বশুর শচীন টেন্ডুলকারের মিরপুর ক্রিকেট ময়দানে ২০১২ সালের কাজে না লাগা আর একটি সেঞ্চুরির সঙ্গে ব্র্যাকেটবন্দি করেছেন, বাংলাদেশ  সেবারও ভারতকে হারিয়েছে। ম্যাচ শুরুর মাত্র ক’ঘণ্টা আগে শচীনের লাস্যময়ী কন্যা সারা টেন্ডুলকার ও শুভমান গিলের শীতল হয়ে যাওয়া সম্পর্কটির আকস্মিক নতুন মোচড়ের সংবাদ নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে যায় এবার শচীনের কন্যাসূত্রে শুভমান গিলের শ্বশুর হওয়া আটকায় কে? সেবার ইন্ডিয়ার ২৮৯ রানের বড় সঞ্চয় চারটি বল হাতে রেখেই বাংলাদেশ টপকে যায়। বাংলাদেশ প্রশ্নে শচীন-শুভমান কীর্তির ঐক্যকে, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে শ্বশুর-জামাই হওয়াটাকে এগিয়ে দেবে এ প্রত্যাশা তো করা যেতেই পারে। এমন কি যারা ক্রিকেটের ‘কমভক্ত’ তারাও এই সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাবেন।

প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে এশীয় কাপ উদযাপন করতে দেশি-বিদেশি সাংবাদিক যারাই গিয়েছেন কলম্বোর পথেঘাটে সফর করে প্রত্যেকেই তাদের ডেসপাচের শেষে একটি পাদটীকা যোগ করতে ভুল করেননি, দেউলিয়া হয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কা সত্যিই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। 

দ্বিতীয় শুভ সংবাদটি দিয়েছে, বহু দূরের স্ক্যানডিনেভিয়ান দেশ সুইডেনের নোবেল ফাউন্ডেশন। তারা ডিনামাইট ব্যাপারি আলফ্রেড নোবেলের ফিক্সড ডিপোজিট দিয়ে এই ওঠানামার অস্থির বাজারেও  বেশ বড় অঙ্কের সুদ কামিয়েছেন বলে পুরস্কারের অর্থমূল্য এক দফাতেই ৮৪০০০ ইউরো বাড়িয়েছেন। বাংলাদেশি টাকায় বাড়তিটাই এক কোটি ছুঁইছুঁই। কিন্তু তাতে কী? যেকোনো দুর্মুখ এ কথা বলতেই পারেন। আসলে তাতে কিছু তো এসে যায়, মানি ম্যাটার্স। একটা লেগে গেলে আর টাকাটা বাংলাদেশে ঢুকলে আমাদের  ফেড়ারেল রিজার্ভ কিছুটা তো সমৃদ্ধ হবে। সব মিলিয়ে  নোবেল বিজয়ীর এবার মিলবে ৯২৪০০০ ইউরো। ডক্টর ইউনূস কত পেয়েছিলেন? এবার বড় কোপ মারতেই হবে, হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এবারই টাকার অঙ্কে ডক্টর ইউনূসকে মার দেওয়ার সুবর্ণ মওকা! আগামী অক্টোবরের প্রথম দশ-বারো দিন টেলিফোন এনগেজড্ রাখা সমীচীন হবে না। ফোন আসতে পারে। তবে যাদের সুদ শুচিবাই আছে, তারা যেন আগেভাগে স্টেটমেন্ট দিয়ে দেন সুদের টাকার পুরস্কার চাই না।

প্রথম দুটি সংবাদের দালিলিক ভিত্তি আছে, তৃতীয়টি আটলান্টিকের ওপার থেকে বয়ে আসা মহাসাগরীয় হাওয়া থেকে পাওয়া। এটি  সেলফি বিষয়ক। জোসেফ রবিনেট বাইডেন সিনিয়র এবং ক্যাথেরিন ইউজেনিয়ার সুযোগসন্ধানী পুত্র জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র  দিল্লি সফরে এসে যে ঐতিহাসিক সেলফিটি তুলেছিলেন নিজের মার্কিন মসনদ টিকিয়ে রাখতে এবং আগামীতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রতিহত করতে তা ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করবেন, এমনই শোনা যাচ্ছে। তিনি বিপাকে পড়েছেন পুত্রের হান্টার বাইডেনের কারণে। আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম কোনো  প্রেসিডেন্টপুত্র ফৌজদারি মোকদ্দমায় আদালতে সোপর্দ হলো। ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের ফেডারেল কোর্ট ভাঙ (নাকি অন্য কোনো মাদক) খাওয়ার সময় হাতে বন্দুক রাখার অপরাধে হান্টারের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছে। তিন কাউন্ট অপরাধে সর্বোচ্চ মোট ১৫ বছরের কারাদ এবং আড়াই লাখ টাকা অর্থদন্ড হতে পারে। আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বুড়ো প্রেসিডেন্ট আরও ১৫ বছর টিকে পুত্রের কারামুক্তি উদযাপন করবেন সে সম্ভাবনা নেই জেনেই সেলফি  টেকনিকে সব ধরনের বৈতরণী পার হয়ে হোয়াইট হাউজের দখল ধরে রাখার কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছেন, বিরোধীদের অভিযোগ।  হান্টার বাইডেনের অপকর্মটি বেশ পুরনো, বাবার শপথেরও আগেকার। কিন্তু এখন কেন সামনে আসছে? বাংলাদেশ মডেল অনুসরণ করছে নাকি? রিপাবলিকানরা নাকি বুড়ো বাইডেনের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট মোশন আনতে যাচ্ছে (ইমপিচমেন্টের  কেতাবি বাংলা হচ্ছে অভিশংসন আর আমেরিকান দুষ্ট বালকের ব্যাখ্যা হচ্ছে ‘টু টার্ন দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইনটু অ্য পিচ’।) এত সোজা নয়, উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন হোয়াইট হাউজ ইন্টার্ন মনিকা লিউনস্কির নীল স্কার্টে ভালোবাসার স্বাক্ষর রাখার পরও, শপথ নিয়ে সত্য-মিথ্যার ককটেল বানাবার পরও ইমপিচমেন্ট উৎরে গেছেন, আর এ বছর দেশবাসীর সঙ্গে ২৩ জুলাই নবযুগের উর্বশী ও মেনকা হিসেবে মনিকার ৫০তম জন্মজয়ন্তী পালন করেছেন। মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমরা আপনার মঙ্গল কামনা করি। সেলফি কার্ডটি প্রতিরক্ষা বর্ম হিসেবে এখনই ব্যবহার করতে শুরু করুন। নতুবা পস্তাবেন, আমাদের দীনবন্ধু মিত্র, নাম শুনেছেন তো,  ‘নীলদর্পণ’-এ বলে দিয়েছেন : কাঙালের কথা বাসি হলে খাটে।  এটাই আপনার ট্রাম্প কার্ড।

মিস্টার প্রেসিডেন্ট

মাত্র কদিন আগে আমেরিকার ইন্ডিপেডেন্স ডে স্পিচ দিতে গিয়ে  জো বাইডেনের সেলফি-প্রবণতা আগাম আঁচ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে বলেছেন, মিস্টার বাইডেন ইজ অ্যা ডেঞ্জারাস ইডিয়ট। আর একজন বলেছেন, মিস্টার প্রেসিডেন্টের মাথা মোটা। চর্মকার আর খৎনাকার, সুইপার আর প্রেসিডেন্ট অব দ্য ইউনাইটেড স্টেট অব আমেরিকা তাদের মধ্যে কোনো তফাত নেই। মিস্টার টম, মিস্টার ডিক, মিস্টার হ্যারি এবং মিস্টার প্রেসিডেন্ড! একবারও কেউ তাকে বলে না এই হতভাগ্য পৃথিবীর ভাগ্যবিধাতা, উত্তর আমেরিকার নয়নমণি, সিয়াটল থেকে মিয়ামি, সান ডিয়েগো থেকে অগাস্টা, স্যাক্রামেন্টো থেকে বাল্টিমোর দিকে দিকে একি শুনি,  জো বাইডেনের জয়ধ্বনি, বাইডেন ভাই যেখানে, আমরা আছি সেখানে; বাইডেন ভাই এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে; বাইডেন বাইডেন হু হা হু হা।

সেই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, বাংলা বিহার উড়িষ্যার, সরি, এশিয়া ইউরোপ, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ দুই আমেরিকার অধিপতি বাইডেন, যার পূর্ণ নাম জোসেফ রবিনেট বাইডেন জুনিয়র সেই জো বাইডেনকে যেসব আহাম্মক ইডিয়ট বলেছে, এফবিআই দিয়ে ধরে এনে ক্রসফায়ারের মাধ্যমে তাদের জনমের শিক্ষা দেওয়া উচিত। হে মহামান্য জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভুবনেশ্বর ভাগ্যবিধাতা, আপনাকে কাগজে কলমে মাথা মোটা বলায় যে অপমান আপনি বোধ করেছেন, তার প্রতিশোধ যদি নিজ হাতে নিতে না পারি তাহলে আত্মঘাতী হয়ে শহীদ হয়ে যাব। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে আপনার মাথা মোটা না সরু এ প্রশ্ন কেউ যদি করে, তাহলে ইন্ডিয়ান গডের কসম, তার একদিন কি আমার একদিন। এমন করে জো বাইডেনের পক্ষে বলার মতো একজন মন্ত্রীও নেই তার কেবিনেটে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানেন, হোয়াইট হাউজে প্রতিদিন ৪০ হাজার চিঠি আসে। এর অর্ধেক অর্থাৎ ২০ হাজার চিঠিতে বলা হয় বাইডেন একটা ইডিয়ট। তিনি এটাও জানেন ঐতিহ্যগতভাবে প্রেসিডেন্টকে নির্বোধ, মাথা মোটা, হাবা, গাধা এ ধরনের গাল দেওয়া হয়ে থাকে। এ ধরনের গাল খেয়েছেন জন এফ কেনেডি। চিঠিপত্রের ব্যাপারটা ফাঁস করেছিলেন বারাক ওবামা নিজেই। পত্রলেখকরা তাকে অপরচুনিস্ট ব্ল্যাক বলেছেন এবং এমনকি তার দ্বিতীয় কন্যাটির জনক তিনি নন, অন্য কেউ, এ কথাও বলেছে। বাপ-মা তুলে গাল দেওয়া তো একটা ডাল-ভাতের মতো ব্যাপার। তবে সেখানে প্রেসিডেন্টকে গালাগাল থেকে সুরক্ষা করার কোনো আইন নেই।

সব প্রেসিডেন্টই জানেন, দেশবাসীর গালি যাতে তাকে বিচলিত করতে না পারে সে জন্য এসব চিঠি তার পক্ষে হোয়াইট হাউজ স্টাফরাই পড়েন এবং তারা বিচলিতও হয়ে থাকেন। মাঝে মধ্যে হয়তো ঠিকানাও টুকে রাখেন ‘শালাকে দেখে নেওয়া হবে একহাত।’ নাকি শ্রীকান্তের সেই ডায়ালগ ঝাড়েন : আওর মারো শালাকো মার ডালো। আর বেছে বেছে ১০টা চিঠি প্রেসিডেন্টকে পড়তে দেওয়া হয়। সেসব চিঠিতে সম্ভবত লেখা থাকে মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনার মাথা ঠিকই আছে, দূর থেকে একটু মোটা মনে হলেও স্ল্যাইড ক্যালিপার্স বসিয়ে মাপলে দেখা যাবে, একেবারে পারফেক্ট।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র এগিয়ে এসে সংক্ষুব্ধ বাইডেন সমালোচককে ঠাণ্ডা করতে চেষ্টা করেন এবং বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিস্টার প্রেসিডেন্টকে মাথা মোটা বলা দোষের কিছু নয়। এটাই গণতান্ত্রিক অধিকার। যেকোনো নাগরিক তা প্রয়োগ করতে পারেন প্রেসিডেন্টের শরীরের যেকোনো অঙ্গ, যা তার অপছন্দ, তাকেই মোটা কিংবা চিকন, লম্বা কিংবা খাটো বলতেই পারেন। এতে মিস্টার প্রেসিডেন্ট কিছু মনে করেন না। কেন মনে করেন না সেটাও আপনার জানা দরকার এবং তা হচ্ছে মিস্টার প্রেসিডেন্টের গায়ের চামড়া সত্যি সত্যি মোটা। কাজেই গলা ঝেড়ে কেশে ইডিয়ট কিংবা মাথা মোটা কথাটা বলে ফেলুন, টেনশন লাঘব হবে। আমেরিকান প্রেসিডেন্টদেরও হোয়াইট হাউজের দখল ধরে রাখার বাতিক রয়েছে, এমন কি নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও। যেতে চাননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। জিজ্ঞেস করেছেন, না গেলে কী হবে?

হোয়াইট হাউজে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মচারী ফিসফিস করে বলেছেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, ২০ জানুয়ারি ২০২১ সকাল পর্যন্ত  কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দুপুর হয়ে গেলেই, হোয়াইট হাউজে ক্রিমিনাল ট্রেসপাসার হিসেবে আপনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। ২০ জানুয়ারি সকালেই হোয়াইট হাউজের হেলিপ্যাডে ঘূর্ণায়মান পাখার তলদেশে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প হেলিকপ্টারে চড়ছেন।

লেখক: সাহিত্যিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত