নবী জীবন বর্ণনায় নারী সাহাবিদের অবদান

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৩৯ পিএম

ইসলামি ইতিহাসের প্রথম দুই শতাব্দীতে রাসুলের জীবনীগ্রন্থকে মাগাজি (রাসুল সা. যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন সেসবকে মাগাজি বলে) বলা হতো। কারণ শুরুর দিকে রচিত রাসুলের জীবনীগ্রন্থগুলোতে তার জীবনের অন্যান্য দিকের তুলনায় যুদ্ধের নানা ঘটনার বর্ণনা বেশি থাকত।

সেকালে শাসকদের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং বিজয়লাভ করাই ছিল অন্যতম কীর্তি। যুদ্ধ ছিল শাসকের জন্য গর্ব ও মর্যাদার প্রধান কারণ। এ বিষয়টি বিবেচনা করে শুরুর দিকে রাসুলের জীবনীগ্রন্থকে মাগাজি বলা হতো। তাদবিনে সিয়ার ওয়াল মাগাজি

পরবর্তীকালে যখন যুদ্ধ-সংগ্রামের পাশাপাশি তার জীবনের অন্যান্য দিক নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হলো, তখন সিরাত শব্দটির প্রচলন হয়। ইবনে হিশাম সর্বপ্রথম নবীর জীবনীর জন্য ‘সিরাত’ শব্দটি ব্যবহার করেন। দ্য এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম

বর্তমানে সিয়ার-মাগাজি শুধু সিরাহর একটি উপ-অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যার দ্বারা নবী মুহম্মদ (সা.)-এর সামরিক অভিযানের কাহিনি বোঝায়। সিরাতের এই উপ-অংশ বর্ণনায় নারী সাহাবিদের অনন্য অবদান রয়েছে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি ছিল না। বনু কুজাআহ গোত্রের উম্মে কাবশা রাসুলের দরবারে এসে অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, বসে যাও লোকেরা বলবে মুহম্মদ মেয়েদের নিয়ে যুদ্ধ করছে। ইবনে সাদ তাবকাত

এজন্য শুরুর দিকে কোনো যুদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল না। ইসলাম প্রভাবশালী হয়ে যাওয়ার পর, তাদের অনুমতি মিলে। স্বয়ং রাসুল (সা.) নিজ থেকে কিছু নারীদের যুদ্ধে নিয়ে যেতেন। যেমন হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মে সুলাইমকে এবং কিছুসংখ্যক আনসার নারীকে যুদ্ধে নিয়ে যেতেন। তারা মুজাহিদদের পানি সরবরাহ করতেন এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। সুনানে আবু দাউদ

উমাইয়া বিনতে কাইস। গিফারি গোত্রের এক মহিলা। তিনি এক মজলিসে খাইবার যুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেন, গিফার গোত্রের কিছু মহিলাসহ আমি রাসুলের দরবারে উপস্থিত হই। আমরা সমবেত কণ্ঠে বলি, আমরাও আপনার সঙ্গে লড়তে চাই এবং নিজেদের শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী মুজাহিদদের সাহায্য করতে চাই। তিনি আমাদের অনুমতি দিলেন। পথে আমার ঋতুস্রাব হয়। রাসুল (সা.) আমাকে লবণমিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল করার নির্দেশ দেন। খাইবার গিরিপথ বিজয়ের পর আমাকে গনিমতের অংশ দেওয়া হয়।

এ কথা বলে তিনি নিজের গলার হার ধরে বলেন, এই যে হার আপনারা দেখছেন; এটি রাসুল (সা.) আমাকে দিয়েছেন। তিনি নিজ পবিত্র হাতে আমাকে পরিয়ে দিয়েছেন। রবের শপথ এ হার আমার গলা থেকে কোনোদিন পৃথক হবে না। তিনি আমৃত্যু এ হার গলায় রেখেছেন। মৃত্যুর আগে যেন এ হারসহ তাকে কবরে দাফন করার অসিয়ত করেন। ইবনে সাদ তবকাত

নারী সাহাবিরা যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি লাভের পর যুদ্ধে আঘাতপ্রাপ্তদের সেবা করতেন। মশক ভরে পানি আনতেন। আহতদের পানি পান করাতেন, ছাতু গুলিয়ে দিতেন, তীর উঠিয়ে দিতেন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করতেন। এ ছাড়া মালপত্র ও সাওয়ারির রক্ষণাবেক্ষণ এবং সবার খাবার তৈরির কাজও করতেন।

যেমন রুবাইয়া বিনতে মুআউয়াজ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমরা যুদ্ধের ময়দানে নবী কারিম (সা.)-এর সঙ্গে থেকে লোকদের পানি পান করাতাম, আহতদের পরিচর্যা করতাম এবং নিহতদের মদিনায় পাঠাতাম।’ সহিহ বোখারি

উম্মে আতিয়্যাহ আল আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি তাদের সাওয়ারি ও মালপত্র রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পশ্চাতে থাকতাম, তাদের খাবার তৈরি করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং রোগীদের দেখাশোনা করতাম।’ সহিহ মুসলিম

আবার কঠিন পরিস্থিতিতে কিছু বীরাঙ্গনা অসীম সাহসের ডানা মেলে শত্রুপক্ষকে কুপোকাত করেছেন।

উম্মে সাদ জামিলা বিনতে সাদ বর্ণনা করেন, আমি উম্মে আম্মারাহ বিনতে কাব বিন আমরের কাছে গিয়ে বলি খালা! উহুদ যুদ্ধে আপনি যা কিছু দেখেছেন আমাকে বলেন, তিনি বললেন, খুব ভোরে আমরা উহুদের দিকে চলে যাই এবং আমার সঙ্গে পানিভর্তি মশক ছিল। সে সময় যুদ্ধ চলছিল। মুসলমানদের অবস্থা খুব ভালো ছিল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাহাবিরা ছিলেন। হঠাৎ অবস্থার পরিবর্তন হয়। আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে যাই এবং তাকে নিরাপত্তা দিতে থাকি। উম্মে জামিলা বলেন, আমি উম্মে আম্মারার কাঁধে গভীর ক্ষতের চিহ্ন দেখতে পাই। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এটি কীসের। তিনি বললেন, রাসুল (সা.)-কে একাকী পেয়ে ইবনে কুমাইয়া ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে চেয়েছিল।

তার মোকাবিলায় মুসআব বিন উমাইর একটি দল নিয়ে আসেন, আমিও তাদের দলে ছিলাম। আমার এই জখম তার আঘাতের। তবুও আমি লাগাতার আক্রমণ করেছিলাম, তবে শত্রুর শরীরে লোহার বর্ম ছিল। তবকাতে ইবনে সাদ

নারী সাহাবিরা পরবর্তীকালে নিজেদের এসব ঘটনা বর্ণনা করেছেন। পরস্পরের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। নিজেদের পরিবার, সন্তানাদি ও আত্মীয়দের কাছে মসজিদ, পাড়া-মহল্লা ও ইলমি হালকায় উপযুক্ত স্থানে আলোচনা করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত