কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রাকে। সরকার পরিবর্তনের নির্বাচনেও এর অপব্যবহার ডেকে আনতে পারে বিপদ। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
মানুষের ওপর যন্ত্রের আধিপত্যের স্মারক হিসেবে ধরা হয় একটি দাবা খেলাকে। ১৯৯৭ সালে আইবিএম কম্পিউটার ‘ডিপ ব্লু’র সঙ্গে ওই খেলায় লড়েছিলেন গ্যারি কাসপারভ। ওই ম্যাচ নিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই হয়েছিল। ‘ডিপ ব্লু’র কাছে সেবার হার মানতে হয়েছিল ‘দাবার ঈশ্বর’কে। প্রথমবার কাসপারভ জিতলেও হেরে যান পরের দুটিতে। বাকি তিনটি ড্র হয়। সেই থেকে যন্ত্র মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে বলে শঙ্কা শুরু হয়।
এরপর পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র ২৬ বছর পার হলেও ‘যন্ত্র’ অভিনব সব পদ্ধতিতে মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এমনকি রাজনীতিতেও যন্ত্র হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিতে পারে বলে শঙ্কা তীব্র হচ্ছে। আসন্ন মার্কিন নির্বাচন যে আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রচুর পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। যে কারণে তারা শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষত ২০২২-এর শেষে চ্যাটজিপিটি ছিল নতুন অগ্রগতি। এর মাধ্যমে একেবারে সাধারণ কাজেও এআইর ব্যবহার বিস্তৃতি পায়। যে কোনো ব্যবহারকারীর সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়। এই এআই ব্যবহারকারীর মনোভাব সংরক্ষণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে যার মাধ্যমে সে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ এবং ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তুলতে থাকে। এখন দেখা যায় যে, মাত্র কয়েক বছরে অনলাইনের ছবি, লেখা, ভিডিওর বড় একটি অংশ কৃত্রিমভাবে তৈরি হচ্ছে।
আর এর ফলে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে রাজনীতির পরিসরেও। নির্বাচনে এই এআই কতভাবে যে ব্যবহার করা সম্ভব হবে, তা আতঙ্ক তৈরি করছে রাজনীতিকদের মনে।
প্রভাব
গত সপ্তাহেই এ নিয়ে একটি কলাম প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রযুক্তিবিষয়ক কলামিস্ট জেওফ্রি এ ফ্লাওয়ার কলামটি লেখেন। লেখাটি নিউইয়র্কের মেয়র এরিক অ্যাডামসের প্রচার কৌশল নিয়ে শুরু হয়। এরিক অ্যাডামস স্প্যানিশ বলতে পারেন না। কিন্তু পরে দেখা গেল তিনি ওই ভাষাতেই কথা বলছেন।
কলামে বলা হয়, শুধু স্প্যানিশ নয়, তিনি ম্যান্ডারিন চায়নিজ, উর্দু ভাষায়ও কথা বলছেন। অথচ কোনো ভাষাই তিনি জানেন না। তাকে এ সুবিধাটা করে দিয়েছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এরিক অ্যাডামস ইংরেজিতেই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন শহরে যখন সেটি বাজানো হয়, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দৌলতে ভাষান্তর করে দেওয়া হয়। ‘ইলেভেনল্যাবস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মেয়রকে এ কাজটি করে দেয়। সাধারণ মানুষ বিষয়টি বুঝতেও পারেনি। তাদের কেউ কেউ মেয়রকে কাছে পেয়ে বলেও দেয়, ‘তুমি যে স্প্যানিশে কথা বলতে পারো আমরা কিন্তু ভাবতেও পারিনি।’
জেওফ্রি ওই কলামে বলছেন, বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এআই বাস্তবতাকে বিকৃত করে আমাদের গণতন্ত্রকে বদলে দেবে। যে ভবিষ্যৎ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। এআই ব্যবহার করা হচ্ছে কণ্ঠ তৈরিতে, তহবিল সংগ্রহের ই-মেইল এবং ‘ডিপফেক’ ইমেজ তৈরি করতে, যা আগে কখনো ছিল না।
তিনি ২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নির্বাচনী কর্মকর্তা, প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের প্রতারণার কাজে এআই ব্যবহার না করার অনুরোধ জানান। তিনি অবশ্য বলেন, আমি নিষেধাজ্ঞার পরামর্শ দিচ্ছি না, বরং রাজনীতিবিদদের কিছু সাধারণ মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দিনের রাজনীতিকে কতটা বিভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট করতে পারে তার নজির দেখা যায় চলতি বছরের মার্চেই। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ছবি ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায়। যা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়। ছবিগুলো এআই দিয়ে এমনভাবে তৈরি হয়, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প আসল না নকল তা বোঝার উপায় ছিল না। এই প্রযুক্তির এমন অপব্যবহার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই তৈরি করা ছবি বা লেখা দিয়ে মিথ্যা তথ্য বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। ট্রাম্পের ছবিগুলো এআই উৎপাদিত বিষয়বস্তু কীভাবে জনমতকে চালিত করতে বা ব্যক্তিকে অসম্মান করতে পারে তার সর্বশেষ উদাহরণ।
এর আগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চলে। তার বিকৃত ছবি ও ভাস্কর্য তৈরি হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেসব জিনিস আরও বিচিত্র উপায়ে সামাজিক মাধ্যমে চলে আসতে পারে। এক মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে কোনো ভুল তথ্য। গুজব ছড়িয়ে পড়তে পারে সর্বত্র।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। ইউরোপী ইউনিয়নের নির্বাচনেও এ নিয়ে কথা উঠেছে। ইইউর সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইএনআইএসএ বলেছে, এআই চ্যাটবট, ডিপফেক এবং অনুরূপ প্রযুক্তির বৃদ্ধি ঘটেছে। ইউরোপে সাইবার নিরাপত্তা হুমকি আছে। সরকার এবং বেসরকারি খাত, বিশেষ করে মিডিয়ার আগামী বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে উচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, যাতে অনলাইনে এআই উৎপাদিত বিভ্রান্তিকর তথ্য খুঁজে বের করা যায়। গুজবে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
যেভাবে কাজ করবে
দ্য কনভারসেশন ডটকম-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, মার্কিন নির্বাচনের আগে প্রযুক্তিবিদরা যদি এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাণ করেন, যার প্রধান লক্ষ্য থাকবে যে প্রার্থী তাদের পরিষেবা কিনবেন তাকে জিতিয়ে দেওয়া।
যেমন বর্তমানে বিজ্ঞাপনদাতারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহারকারীর ব্রাউজিং হিস্ট্রি অনুযায়ী বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে থাকে। এভাবে ওই এআই ব্যবহার করে ভোটরদের আচরণ বুঝে তাদের এক এক করে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবে। প্রতিটি ভোটদাতার ওপর তাদের নজর থাকবে।
এটি বর্তমান অত্যাধুনিক অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। এর ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল লেখা তৈরি করবে সোশ্যাল মিডিয়ায়, ই-মেইল তৈরি করবে। ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী ছবি এবং ভিডিও দেখাবে।
তারা ভোটদাতার আগ্রহ বুঝে মনোভাব পরিবর্তনের জন্য একের পর এক লেখা ও ছবি পাঠাতে থাকবে। এরপর রয়েছে মেসেজ আদান-প্রদান। প্রায় সব ভোটারের সঙ্গে যার মাধ্যমে প্রার্থীর হয়ে এই এআই কথা বলে যেতে পারবে।
চলতি বছরের মে মাসে জোশ হাওলি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ‘ওপেন এআই’র প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। অল্টম্যান উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি উদ্বিগ্ন যে, কিছু লোক ভোটারদের বিভ্রান্ত, প্ররোচিত করতে এআই ব্যবহার করতে পারে।
তিনি বলেছিলেন, গত কয়েক মাসে বেশ কিছু এআই মডেল বাজারে এসেছে। এআই কোম্পানিগুলোকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠন হওয়া প্রয়োজন। চ্যাটজিপিটি এবং অন্য অনুরূপ প্রোগ্রামগুলো অবিশ্বাস্যভাবে মানুষের মতোই বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে পারে, তবে এটি অনেক ভুল তথ্যও দিতে পারে।
মনোপলি
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কল্পনা করুন যে, শিগগিরই রাজনৈতিক প্রযুক্তিবিদরা এমন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুললেন, যা ভোটারদের চিন্তা, ভোট দেওয়ার মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফরমে এক সময় বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো ভোট চেয়ে। এখন এআই প্রযুক্তি সেখানে প্রভাব খাটাতে পারবে। তারা ভোটারদের আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরোধী না। তারা যা বলছেন সংক্ষেপে সেটি হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিস্তৃত প্রযুক্তি যদি সমাজের মূল মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা ব্যাপক ক্ষতির কারণ হবে। তারা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে এবং সমাজের নেতৃত্বও নিয়ে নিতে পারে কোথাও কোথাও। তারা বলছেন, আমরা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আছি, যেখানে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কী ধরনের ব্যবহারকে আমরা উৎসাহ দেব।
এ ছাড়া আরও একটি বিপদের কথা তারা বলছেন, প্রায় সব এআই ব্যবস্থা বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যাদের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফ্ট, গুগল, মেটা, ওপেনএআই। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবহারকারীরা প্রভাবিত হয়ে আসছে। তারা নির্ধারণ করে দেয় কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহারকারীরা জড়িত থাকবে। তারা তাদের করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য নষ্ট হয় এমন সুবিধা সাধারণ মানুষের জন্য রাখবে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনকল্যাণকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) বর্ণবাদ ও ঘৃণাকে প্রতিফলিত করতে পারে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এসব ফিল্টার করা।
মোকাবিলা
মেটার গ্লোবাল প্রধান নেক ক্লেগ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেছেন, ফেসবুকে ঘৃণামূলক বক্তব্য ফিল্টার করা হয়। ফেসবুকে স্ক্রল করলে প্রতি ১০ হাজার বিট সামগ্রীর মধ্যে এক বা দুটি বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এটি কখনো শূন্যে পৌঁছাবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে ফেসবুক ঘৃণামূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।
মার্কিনিরা যদি এআইকে দেশের সুস্থ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করতে চায় তাহলে তাদের ভাবতে হবে কীভাবে নির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। যেমন তারা যদি প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়, তাহলে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ই-মেইল। তবে সব নাগরিকের সব ই-মেইল জনপ্রতিনিধির কাছে যায় না। মাঝখানে যারা থাকেন তারা অনেক ই-মেইল ফেলে দেন। তাদের কাছে যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তা রেখে বাকিগুলো ঝুড়িতে ছুড়ে দেন। এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। যার কাজ হবে প্রচুর সংখ্যায় ই-মেইল সংগ্রহ করা এবং তা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে উত্তর দেওয়া। এভাবে এআই জনসম্পৃক্ত হতে পারে।
