করোনার মধ্যে ২০২১ সালে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে যখন একের পর এক রেকর্ড হচ্ছিল, তখন তা নিয়ে অনেক গর্ব ও উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলেন সরকারের অনেক মন্ত্রী। এত রিজার্ভ নিয়ে কী করবে, তা নিয়েও রীতিমতো ভাবনায় পড়ে গিয়েছিল সরকার। রিজার্ভ থেকে ঋণ চাইলেন ব্যবসায়ীরা, সরকারি নানা প্রকল্পেও রিজার্ভ ব্যবহারের প্রস্তাব উঠেছিল। কিন্তু এক বছর পরই উল্টো পথে হাঁটা শুরু করে রিজার্ভ। তারও এক বছর পর রিজার্ভ ক্ষয়ের অবস্থা নিয়ে পুরো জাতিই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ থেকে যেসব খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তা এখন কমিয়ে আনতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল সোমবার ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (এআরএফ) নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। এ সময় গভর্নর বলেন, এখন থেকে রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে দেশের অভ্যন্তরে আর একটি ডলারও বিনিয়োগ করা হবে না। বরং রিজার্ভ থেকে যেই বিনিয়োগ করা হয় তাও কমিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ, ডেপুটি গভর্নররা এবং ইআরএফের সভাপতি মোহাম্মদ রেফায়েত উল্লাহ মিরধা, সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম প্রমুখ।
আবদুর রউফ তালুকদার বলেন, ইতিমধ্যে সাড়ে ৭ বিলিয়নের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) সাড়ে তিন বিলিয়ন করা হয়েছে। পায়রা বন্দরের ঋণ আদায়ে চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন ডলার আসবে। তখন রিজার্ভ বাড়বে। এজন্য দেশের রিজার্ভ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে গভর্নর বলেন, আমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা বর্তমানে একেবারে তলানিতে এসেছি। আর তো নিচে নামার পথ নেই। আমরা সুড়ঙ্গের কাছ থেকে আলো দেখতে পাচ্ছি। চলতি অর্থবছরে আমরা রিবাউন্স (ঘুরে দাঁড়াব) করব। ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি হবে ৮ শতাংশ। যা আগামী জুনে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সিন্ডিকেট হচ্ছে। সেজন্য মানুষের কষ্ট হচ্ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
অর্থ পাচারের জের টেনে আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, হুন্ডির চেয়ে ব্যবসার আড়ালে কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি অর্থ পাচার হয়। যেমন দুবাইতে ১৩ হাজার বাংলাদেশি কোম্পানি রয়েছে। এসব পাচারের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠান। একইভাবে পর্তুগালে আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে। অর্থের উৎস কিন্তু পাচার। আগে প্রতি মাসে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচার হতো। পরে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এলসির পরিমাণ কমেনি। এজন্য এলসি বিল ৮-৯ বিলিয়নের স্থলে ৪-৫ বিলিয়নে নেমেছে। এতে কিন্তু সরবরাহ কমেনি। তবে ডলার বাড়লে এলসির শর্ত তুলে দেওয়া হবে।
গভর্নর বলেন, রিজার্ভ থেকে আর কোনো ডলার বিক্রি করা হবে না। এত দিন রিজার্ভ থেকে ব্যাপক সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তবে সামনের দিনগুলোতে এ রকম সুবিধা আর দেব না।
এদিকে বর্তমানে পুনঃতফসিল করা ঋণের স্থিতি ২ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া বিশেষ নীতি সুবিধার কারণে ঋণ পুনঃতফসিলের পাহাড় তৈরি হয়েছে ব্যাংকগুলোতে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যেন কেউ পুনঃতফসিল সুবিধা কেউ নিতে না পারে সে বিষয়টি শক্তভাবে তদারকির পরামর্শ দিয়েছে ইআরএফ। এ ছাড়া বিলাসী পণ্য আমদানিতে যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা যেন ঠিকমতো তদারকির পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির আড়ালে কোনোভাবেই যেন অর্থ পাচার না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলেছে সংগঠনটি।
ব্যাংকগুলো সর্বশেষ ২০২২ সালে ৬৩ হাজার ৭১৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। তা অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, আবার ব্যাংকগুলো নিজেরাও পুনঃতফসিল করেছে। ফলে এসব ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। এরপরও গত বছরের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণের এই অঙ্ক ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পুনঃতফসিল করা ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত।
