অবরোধে আদালত

সাক্ষী আসে আসামি আসে না, আসামি এলে সাক্ষী আসছে না

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০১:০৪ পিএম

রাজনৈতিক অবরোধের প্রভাব পড়েছে ঢাকার আদালতপাড়ায়। অনেক মামলায় সাক্ষী আসে আসামি আসে না। আবার আসামি এলে সাক্ষী আসছে না। শুনানি মুলতবি হওয়ায় নতুন তারিখ পড়ছে মামলাগুলোর। এতে ভোগান্তি ও আর্থিক খরচ বেড়েছে বিচারপ্রত্যাশীদের। বিচারকের ছুটি ও অসুস্থতাজনিত আদালতগুলো ছাড়া বেশিরভাগ আদালতে বিচারকাজ চললেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে শুনানি হচ্ছে কম।

গত সোমবার ঢাকার আদালত এলাকার অন্তত ১০টি আদালত ঘুরে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, আসামি, বাদীপক্ষ ও আদালতের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। দেখা গেছে, সকালে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে বেশিরভাগ (সিএমএম ছাড়া) আদালতের কার্যক্রম ওইদিনের মতো শেষ হয়ে গেছে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা বলেন, অবরোধের কারণে আদালতগুলোতে বিচারকাজ চললেও তা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম। আসামি, সাক্ষী ও বাদীপক্ষ অনেকেই আসছে না। আর যেসব ফৌজদারি মামলায় পুলিশ সাক্ষী তারাও অবরোধজনিত পরিস্থিতিতে সাক্ষ্য দিতে আসছে না। অন্যদিকে অনেকেই শুনানির ধার্য তারিখে এলেও শুনানি না হওয়ায় ফিরে যাচ্ছে।

বেলা ১১টার দিকে আদালত এলাকার রেবতী ম্যানশনের দোতলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এর এজলাসে গিয়ে দেখা যায় চিরাচরিত সেই ভিড় নেই। এই আদালতে মাদকের একটি মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের ধার্য দিনে হাজিরা দিতে আসেন এক আসামি মো. ইউসুফ (৫৮)। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তার আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ধানমণ্ডিতে একটি বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে চাকরি করেন তিনি। মালিককে বলে-কয়ে হাজিরা দিতে এসেছিলেন। হাজিরা না হলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে ৩০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। আইনজীবীকে ফি দিতে হবে। নতুন তারিখ পড়ায় মামলার খরচ আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বলেন, প্রতি কর্মদিবসে এই আদালতে অন্তত ৩৫টি মামলা শুনানি হলেও অবরোধের এ সময়ে শুনানি হচ্ছে অর্ধেকের কম। শুনানি না হওয়ায় অনেকে ফিরেও যাচ্ছেন। আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিচারক কিছু সময়ের জন্য বসেছিলেন। অবরোধজনিত কারণে বেশিরভাগ মামলায় বাদী ও সাক্ষী আসেননি। তাই নতুন করে তারিখ পড়ছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবনের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ দুপুর সাড়ে ১২টায় গিয়ে দেখা যায়, আদালত-সংশ্লিষ্ট দু-তিনজন কর্মচারী ছাড়া আর কেউ নেই। আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) মো. শামসুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্তত ৩০টি মামলায় সাক্ষীর জন্য তারিখ ধার্য ছিল। কিন্তু একজন সাক্ষীও আসেননি। সাক্ষীর জন্য সময় নেওয়া হয়েছে। আসামি যারা জামিনে আছেন তাদের কয়েকজন হাজিরা দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষও সময়ের আবেদন করে সময় নিয়েছে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২-এ গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের ভিড় নেই। আদালত-সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা বলেন, সোমবার ৬০টি মামলার শুনানির তারিখ ছিল। তবে, অবরোধজনিত কারণে মাত্র চারটি মামলায় সংক্ষিপ্ত শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় আংশিক সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অন্য মামলায় নতুন করে তারিখ পড়েছে। জামিনে থাকা আসামিরা শুধু হাজিরা দিয়েছেন।

দুপুর ১২টায় জেলা ও দায়রা আদালত ভবনের (পুরনো ভবন) চতুর্থতলায় যুগ্ম জেলা জজ পঞ্চম আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালের এজলাসের সামনের বারান্দায় কথা হয় চার নারীর সঙ্গে। তারা এসেছেন পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে। পারভীন আক্তার (৩৮) নামে এক নারী বলেন, একটি দেওয়ানি বাটোয়ারা মামলায় তারা বাদীপক্ষ এবং পরস্পরের আত্মীয়। লালবাগের পুরান থানা কেল্লার মোড় এলাকায় জমি নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে বাটোয়ারা মামলা চলছে ১১ বছর ধরে। অবরোধের মধ্যেও মামলার খবর নিতে তারা বাড়তি ভাড়া দিয়ে এসেছেন। চারজনের আসা-যাওয়া এবং দুপুরের খাবারসহ খরচ হয়েছে এক হাজার টাকা। আইনজীবীর ফি দিতে হবে। নতুন তারিখ পড়েছে। তাদের আইনজীবী রনজিত কুমার বসাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাদীপক্ষ মামলা নিয়ে একটু উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। যে কারণে অবরোধের মধ্যেও তারা এসেছেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একই ভবনের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩-এর সামনের বারান্দার বেঞ্চিতে এক যুবককে বসে থাকতে দেখা যায়। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার এই আসামি সংগত কারণে তার নামপরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। শুধু বলেন, একটি মামলায় হাজিরা দিতে খুলনা থেকে এই অবরোধের মধ্যেও তাকে আসতে হয়েছে। একই ভবনের পঞ্চমতলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ গিয়ে চিরচেনা ভিড় দেখা যায়নি। আদালতের একজন কর্মচারী বলেন, বিচারক অসুস্থ থাকায় এজলাসে বসেননি। কার্যতালিকায় থাকা সব মামলায় নতুন করে শুনানির তারিখ ধার্য হয়েছে। যারা এসেছিলেন তারা সবাই নতুন তারিখ নিয়ে ফিরে গেছেন।

গত বছরের মার্চে সাভার থানায় করা ডাকাতির মামলায় হাজিরা দিতে গতকাল ঢাকার একটি শিশু আদালতে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৯) আসে দুই কিশোর। তবে তাদের সঙ্গে কোনো অভিভাবক নেই। দুপুর ১২টার দিকে আদালত এলাকায় কথা হয় দুজনের সঙ্গে। সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে আসা এক কিশোর বলে, বাবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন। বাবা-মা কারোরই এই অবরোধের মধ্যে আসা সম্ভব হয়নি। অন্য কিশোর জানায়, সে সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় একটি স্টিল মিল কারখানায় কাজ করে। বাবা নেই। মা আসতে পারেননি। অবরোধের মধ্যে বাড়তি টাকা খরচ করে অনেক কষ্টে আসতে হয়েছে। বাসে করে এলেও মনে ভয় কাজ করছে। এক কিশোরের আইনজীবী মো. আতিকুর রহমান আতিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ হয়েছে। দুজনকে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় হাজির হতে হবে।

দুপুর ২টার দিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের (নতুন ভবন) নিচতলায় দ্বিতীয় অতিরিক্ত সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালতে গিয়ে দেখা যায় আরও আগেই আদালতের কার্যক্রম মুলতবি করা হয়েছে। আদালতের কর্মচারীরা বলেন, অবরোধের প্রভাবের কারণে বিচার কার্যক্রমের সময় কিছুটা সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এজলাসে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ভোরে ময়মনসিংহ থেকে পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ আদালত এলাকায় এসেছেন। একটি মামলায় ইতিমধ্যে আপস-মীমাংসা হয়ে গেছে। কিন্তু অবরোধের এ সময় আদালতে আসতে তাদের যথেষ্ট সময় ও বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আবদুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবরোধের মধ্যেও আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। কিছু আদালতে সাক্ষী হয়তো আসেনি। তবে, আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত