বর্তমান সরকারের শেষ একনেকে এসে অনুমোদন পেয়েছে ‘যশোর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা’ প্রকল্পটি। একনেক সভায় উত্থাপনের সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। কিন্তু দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে সেখানে কিছু চাষের জমি অধিগ্রহণ বাদ দিতে বলা হয়েছে। এতে ব্যয় কমেছে ২৫০ কোটি টাকা। সভা শেষে প্রকল্পটি ১ হাজার ৬৪২ কোটি টাকায় অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ২৩ অক্টোবর দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বিল ভরাট করে ইপিজেড’। পরিবেশ আইনকে অবজ্ঞা করে প্রকল্প প্রস্তাবের বিষয়টি উঠে আসে ওই খবরে। ষাটের দশক থেকে জলাবদ্ধতার শিকার ভবদহ বিলের অংশ ধলার বিলের ৫৬৫ একর জমি ভরাট করে ইপিজেড তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্র্তৃপক্ষের (বেপজা)। গতকাল বৃহস্পতিবার একনেক সভায় কিছু জমি বাদ দিয়ে সেটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
একনেক সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্পশক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) আবদুল বাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনাদের পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর আমরা সব নথি ঘেঁটে দেখেছি। আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও ব্যাপক কনসালটেশন হয়েছে। এরপর স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন পেশাজীবীদের সঙ্গেও কনসালটেশন হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ইআইএ প্রতিবেদনটি ভালোভাবে দেখেছি। পত্রিকায় যে খবর এসেছে, সেখানে জলাভূমির বিষয়টি এসেছে। জলাভূমিকে কীভাবে অক্ষুণœ রাখা যায়, সেটি লে-আউট প্ল্যানে করা আছে। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবও আজকে এটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি সেখানে এক কিলোমিটারেরও বেশি খাল খননের বিষয়টি বলেছেন।’
গত ২৩ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর গত ৪ নভেম্বর ওই এলাকা পরিদর্শন করেছে পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা। তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, এলাকার কৃষক, মাছচাষিসহ সাধারণ জনগোষ্ঠীর কোনো মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এই অঞ্চলের পরিবেশ সংগঠক, পরিবেশবিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজের কোনো পরামর্শও গ্রহণ করা হয়নি।
বেলা বলছে, পরিবেশ আন্দোলনকারীদেরও এই বিলে ইপিজেড হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি রয়েছে। তারা মনে করছে, এটি বাস্তবায়িত হলে জলাধার কমে আসবে এবং জলাবদ্ধতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এমনিতেই বিভিন্ন কল-কারখানার বর্জ্যরে কারণে ভৈরব নদ দূষিত হচ্ছে। ইপিজেডের বর্জ্য দূষণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সংগঠনটির প্রতিবেদনে আরও উঠে আসে, বিদ্যমান আমডাঙ্গা খালটিকেই এখনো সঠিক ব্যবস্থাপনায় আনা সম্ভব হয়নি। এখনো খালটি সংকুচিত ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। এটি প্রশস্ত করার দাবি রয়েছে এলাকাবাসীর। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমডাঙ্গা খালের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্জ্যরে সুব্যবস্থাপনা না হলে সংকট বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যাঘাত ঘটবে। এলাকায় ধান ও মাছ চাষের ওপর প্রভার পড়বে।
২৫০ কোটি টাকা ব্যয় কমানোর বিষয়ে আবদুল বাকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেখানে রাস্তার পাশে কিছু জমি আছে, সেগুলো বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেগুলোর দামও বেশি, বর্তমান প্রেক্ষিতে তা কেনা উচিত হবে না। তাই সে অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন বা জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। জলাধার আইন লঙ্ঘন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। শাস্তির পাশাপাশি আইন অমান্যকারীর নিজ খরচে সেটা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কঠোর বিধানও রয়েছে আইনে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রস্তাবিত যশোর ইপিজেড স্থাপনের জন্য অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের ধলার বিলে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ইউনিয়নের মাগুরা, রাজাপুর, প্রেমবাগ, চেঙ্গুটিয়া, আরাজি বাহিরঘাট, বালিয়াডাঙ্গা, মহাকাল ও আমডাঙ্গা মৌজার ৫০৩ একর বা ১৫ হাজার বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হবে।
যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার তথ্যমতে, ইপিজেডের জন্য নির্ধারিত স্থানের অধিকাংশ জমিই ব্যক্তি মালিকানার। এর মধ্যে মাত্র দুই একর খাসজমি।
কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বেপজার ৩৪তম গভর্নর বোর্ডসভায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যশোর জেলায় একটি ইপিজেড স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
