খোলাবাজারে ডলার নজরদারির দায়িত্ব অ্যাসোসিয়েশনের কাঁধে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৫৮ এএম

যে কোনো মূল্যে রেমিট্যান্স সংগ্রহে ব্যাংকগুলোর সাম্প্রতিক সময়ের প্রতিযোগিতায় ডলার বাজার আবারও অস্থির হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শে ডলারের সংকট সামাল দিতে এমন প্রতিযোগিতার ফলে এক ধাক্কায় গ্রিনব্যাকটির দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। আর খোলাবাজারে ডলারটির দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২৮ টাকায় উন্নীত হয়। ডলারের এমন উল্লম্ফনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে আবারও সীমা বেঁধে দেয় ডলারের।

তবে এতে স্থির হয়নি বাজার। ব্যাংকের পাশাপাশি খোলাবাজারেও নির্ধারিত দরে ডলার মিলছে না। শুধুমাত্র কালোবাজারে উচ্চমূল্যে ডলার মিলছে। গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সাঁড়াশি অভিযান, লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিয়েও খোলাবাজারে ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণে মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে নজরদারির নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল মঙ্গলবার অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের ডেকে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর মানে হচ্ছে মার্কিন ডলারের দাম ১১৭ টাকার বেশি কোনো মানি এক্সচেঞ্জ রাখতে পারবে না। বৈঠকে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানি চেঞ্জারগুলোকে নির্দিষ্ট দামে ডলার ক্রয় ও বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্য মানি চেঞ্জারগুলো যাতে বেশি দামে ডলার না কেনে সেই বিষয়েও নজর রাখতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. হেলাল উদ্দিন সিকদার বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মানি চেঞ্জারগুলোকে ১১৫ টাকা ৫০ পয়সায় ডলার ক্রয় এবং ১১৭ টাকায় ডলার বিক্রয়ের নির্দেশনা দিয়েছে। গত সোমবার কোনো কোনো মানি চেঞ্জার এর চেয়ে বেশি দরে ডলার বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ। তাই আমাদের আজ (মঙ্গলবার) ডেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য হচ্ছে, মানি চেঞ্জারগুলো যেন নির্দিষ্ট দরেই ডলার বিক্রি করে। আর ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশনকে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই পদক্ষেপে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণ হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ১২০ টাকা বা ১২২ টাকায় যারা ডলার কিনছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ধরতে বলেছে। আর অনলাইনে যারা বেশি দরে ডলার বেচাকেনা করছে তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এটা হলে তো ভালোই হবে।

ডলারের মূল্য বেঁধে দেওয়ায় খোলাবাজারে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এই গ্রিনব্যাকটি মিলবে না বলে জানিয়েছেন একাধিক মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশনের অন্য এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার নির্দেশনার পরিবর্তনের কারণে আমরা বিপাকে আছি। আমাদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। এখন আবার আমাদের ওপরই নজরদারির দায়িত্ব পড়েছে। এখন ডলার বেচাকেনা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না। অন্য কোনো ব্যবসা থাকলে এই ব্যবসা ছেড়েই দিতাম। চিন্তা করছি কেউ নির্ধারিত দরে ডলার দিলে কিনব। না দিলে বসে থাকব। ব্যবসা করতে গিয়ে লাইসেন্স তো আর বাতিল করা যাবে না।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস বাংলাদেশ (এবিবি) ডলার সংক্রান্ত নির্দেশনা ঠিকমতো বাস্তবায়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানায়। এরপরই গতকাল মঙ্গলবার মানি এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনকে খোলাবাজারে ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে মাসের শুরুতে রেমিট্যান্সে যে ঊর্ধ্বগতি তৈরি হয়েছিল ডলারের দর কমিয়ে আনায় প্রবাসী আয়ে আবারও শ্লথগতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো এমন আভাসই দিচ্ছে। যদিও অনেক ব্যাংক এখনো ঘোষণার চেয়ে বেশি দামে প্রবাসী আয় কেনা অব্যাহত রেখেছে। গত সপ্তাহেও ১২৪ টাকা দরে প্রবাসী আয় কিনেছে কিছু বেসরকারি ব্যাংক। যাদের আমদানি ও বিদেশি ঋণের দায় মেটানোর চাহিদা বেশি, তারাই এভাবে ডলার কিনেছে। যদিও আমদানি দায় মেটাতে ডলারের আনুষ্ঠানিক দাম এখনো ১১১ টাকা।

ব্যাংকগুলোর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রবাসী আয় কেনার ক্ষেত্রে ডলারের দাম ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারের আড়াই শতাংশ প্রণোদনা। পাশাপাশি কোনো কোনো ব্যাংক আরও আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। ফলে ডলারের সর্বোচ্চ দাম দাঁড়ায় ১১৬ টাকা। তবে বেশিরভাগ ব্যাংক এ দরে ডলার পাচ্ছে না। রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংক অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে প্রবাসী আয় কিনছে। তবে তাদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ কমে গেছে। আবার বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংক এই প্রণোদনার পাশাপাশি আরও বেশি দামে প্রবাসী আয় কিনছে। এখন ১২২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত দরে ডলার কিনছে অনেক ব্যাংক।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ডলারের দর ঠিক করার পাশাপাশি রিজার্ভ থেকে প্রচুর ডলার বিক্রি করে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছর এরই মধ্যে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের মতো বিক্রি করা হয়েছে। গত অর্থবছর বিক্রি করা হয় ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। এর আগের অর্থবছর ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত