চেতনাদীপ্ত আহত মন

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ১০:২৫ পিএম

২০০৫ সালে টোকিও বিশ^বিদ্যালয়ের বিশ^খ্যাত কম্পোজার প্রফেসর মাৎসুসিতা ইসাও-এর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বৌদ্ধ ধর্মগুরু ওয়াসেই হিরাই আমাকে তার বিভাগে নিয়ে গেলেন। কথা প্রসঙ্গে ইসাও আমাদের দেশের কম্পোজার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আমি বাংলাদেশের সংগীতকারদের মধ্যে থেকে কোনো নাম বলতে না পারলেও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচারে এ আর রহমানের নাম বললাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘এ আর রহমানকে আমি চিনি, সিনেমার গানের জন্য তোমাদের ওখানে বেশ জনপ্রিয়। তবে তিনি কম্পোজার নন।’ আমার তখনো কম্পোজারের পদ্ধতিবিদ্যা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা জন্মেনি। সেই কারণে কোনো বিতর্কে না গিয়ে জানতে চাইলাম ‘তাহলে তাকে কী হিসেবে চিনতে পারি? তিনি বললেন, ‘হতে পারে তিনি মোটিফ কোম্পাইলেশন করেন এবং মিউজিক ডিরেক্টরও বলা যেতে পারে।’ পরবর্তী সময় আমি এ আর রহমানের অনেক গান শুনেছি, মনে হয়েছে তিনি বিভিন্ন প্রদেশের দুর্লভ কিংবা জনপ্রিয় সুরকে নতুন কথায় যুক্ত করেন নিজস্ব শৈলীতে এবং ডিজিটাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে এমনভাবে ডিজাইন করেন, যা অভিনব ও শ্রুতিমধুর শোনায়। ছোট্ট একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশেই যে অজস্র লোকসুরভঙ্গি রয়েছে, সেই তুলনায় ভারত অনেক বৃহৎ ও বহুবিচিত্র। এ আর রহমান সেসব জনপদের মনোগ্রাহী সুর নিয়ে বেশির ভাগ কাজ করেছেন। শিল্পচর্চায় কম্পাইল্ড আর্ট একটা স্বীকৃত বিষয়। এমনকি জগদ্্বিখ্যাত কম্পোজাররাও কম্পাইল্ড মিউজিক করেন। কিন্তু তা কম্পোজিশনের সূত্র মেনেই করা হয়। বিশেষ করে হারমনি-কয়্যারের সময় যে ইন্টারভ্যালের সমন্বয় রয়েছে তা দিয়ে নতুন সুর কাঠামো তৈরি অথবা নতুনভাবের উদ্রেক করা সম্ভব, লেইট মোটিফ হিসেবে বা সাহিত্যে প্যারাফ্রেজিং হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই সুরকে আবার স্টাফ নোটেশনে লিখে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃক স্বীকৃতি নিতে হয়। তবে এ আর রহমান কম্পোজার নন বলে তাকে ক্ষুদ্রজ্ঞান করার সুযোগ নেই। কারণ আধুনিককালের সিনেমার সংগীত পরিচালকগণের কর্মপদ্ধতিও এর ব্যতিক্রম নয়। যেমন ধরুন, হ্যান্স জিমারম্যান, বারনেস্টাইন, ভেনগালিস, উইনটন মারসালেইস, লুদভিক এইনাউদি, জেমস ম্যাকমিলান কম্পোজার হয়েও কখনো কখনো ইলেকট্রনিক মিউজিকের আশ্রয় নেন। তা ছাড়া যে সব দেশে অর্কেস্ট্রা জাতীয় উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা আছে, সেসব অঞ্চলে ইলেকট্রনিক মিউজিকে প্রশ্রয় বেশি।

এখন আসি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গান নিয়ে এ আর রহমানের সুর প্রসঙ্গে। গত ১০ নভেম্বর প্রাইম ভিডিও ওটিটিতে গানটি প্রচারের পর বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সংগীতানুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠেছে। কারণ গানটির সুনির্দিষ্ট সুর থাকা সত্ত্বেও এ আর রহমান ভিন্ন সুরে কেন গানটি করলেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক রাজা কৃষ্ণণ মেনন-এর বানানো ‘পিপা’র কাহিনি ১৯৭১ সালের ‘ইন্ডিয়া-পাকিস্তান’ যুদ্ধকে মুখ্য করে। এ আর রহমান কিন্তু এই স্টাইলেই কাজ করেন। বঙ্কিমের বন্দে মাতরমের সুরও কিন্তু ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল বা বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসুর সংগ্রহ করে তিনি ভিন্ন একটা স্থাপত্য গড়েন, যা তার নিজের মতো এ আর রহমানীয় হয়ে ওঠে। এভাবে কাজ করার জন্য সিনেমার সিকোয়েন্সও অনেকটা দায়ী। পিপা ছবিটি এখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে একটি প্রশ্ন এখানে তুলতে চাই, ছবিতে কী ধরনের দৃশ্য রয়েছে এবং তার ওপর ভিত্তি করে সুরটি খাপ খেল কিনা, এইদিকগুলোর সামঞ্জস্য বিধান করাই ফিল্ম মিউজিসিয়ানের মূল লক্ষ্য থাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ স্বদেশি গানটিরও সুনির্দিষ্ট স্বরলিপি আছে, কিন্তু জহির রায়হানের চলচ্চিত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ভিন্ন সুরে উপস্থাপিত হয়েছে, তখনো কিন্তু এই গান আমাদের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু জাতীয় সংগীতের সুর নির্ধারণের সময়ে রবীন্দ্রসুরকে গ্রহণ না করে বরং মুক্তিবাহিনীর গাওয়া সরল সুরকেই গ্রহণ করা হয়েছিল।

এই গান নিয়ে কপিরাইট প্রসঙ্গও উঠে এসেছে, কিন্তু কেন তা আমার বোধগম্য নয়, এ আর রহমান তো আর নজরুলের সুর নিজের নামে চালাচ্ছেন না। এমনকি সুরের বিকৃতি কীভাবে ঘটালেন তাও স্পষ্ট নয়। বিকৃতি তখনই বলা যেত নজরুলের প্রতিষ্ঠিত আকর সুরের কাঠামোকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কিছুটা বদলে দিতেন। আরেকটি দিক হলো, এ আর রহমানের সুর নজরুলের সুর থেকে আরও উন্নত বা পরিণত হলো কিনা, তা নিয়ে কথা হতে পারে। যেমনটি ঘটেছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের ক্ষেত্রে। আবদুল লতিফের সুরের পর আলতাফ মাহমুদের সুর অধিক গ্রহণীয় হয়েছিল। কিন্তু লতিফের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তো আলতাফের এই কাজটিও কিন্তু ধৃষ্টতা বলে সমালোচনাযোগ্য। কারণ গানটির সুরের পাইওনিয়ার হিসেবে এখন আর লতিফের নামটি যুক্ত হয় না।

নজরুলের এ ধরনের গান লেখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস জড়িয়ে আছে এবং সেই সময়ে স্বদেশি আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় এক ধরনের সুরের প্রচলন দেখা যায়, যা মার্চের সুরের সঙ্গে সারিগান বা শ্রম সংগীতের দ্রুত লয়ের ব্যবহার অভিযোজিত হয়েছে। দেখা যাবে ‘কারার ওই লৌহ কপাট’-এর মতো ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’, ‘চল চল চল’, ‘শিকল পরা ছল’ ইত্যাদি গানেও একই ধরনের সুরের মোটিফ লক্ষণীয়। ছন্দের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মার্চের সুর মূলত ২ বা ৪ মাত্রার হয়ে থাকে, কিন্তু এই সুরগুলো মার্চের মতো গতিসম্পন্ন হলেও তা ৩ বা ৬ মাত্রার ঝুমুর ছন্দে গঠিত। এ আর রহমান এই ভঙ্গির লয় এবং ছন্দ থেকে অবশ্য সরে যাননি। নজরুল এক্ষেত্রে লোকসুরকে উতরিয়ে এমন এক আধুনিকতার জগতে বাংলার সুরকে প্রবেশ করিয়েছিলেন সেই দার্শনিক অবস্থান থেকে ‘কারার ওই লৌহ কপাটের’ সুরটি অনন্য। এবং গানটি হারমনিক অর্কেস্ট্রা দিয়ে আরও সুবিন্যস্ত করা সম্ভব। যেমন আমরা লক্ষ করি, কোরিয়ার ‘আরিরাং’ গানের ক্ষেত্রে, ৫ মিনিটের একটি গানকে প্রায় বিশ মিনিটের অর্কেস্ট্রা তৈরি করছিল নিউ ইয়র্ক ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রা, যা কোরিয়ানসহ সবার কাছে প্রশংসিত হয়ে আছে। কিন্তু এ আর রহমান নতুন কিছু করতে গিয়ে আবার লোকসংগীতেই ফিরিয়ে নিয়েছেন, যা শ্রোতাদের খটকা লেগেছে, আবার এই সুরটি বাংলার ভেতরের নয়, বীরভূম বা আসাম অঞ্চলের সুরের ফ্লেবার কিছুটা পাওয়া যায়। ফলে এই সুরের গান বাংলার মানুষের কাছে খটকা লাগলে অবাঙালি ভারতীয় কিংবা বিশে^র যে কোনো প্রান্তের মানুষের কাছে চিত্তাকর্ষক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফিল্মের বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধরনের কাজ ভারতীয়দের ও পাকিস্তানিদের মধ্যে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি, গজল, ভজন কিংবা ভাংরা প্রচুর গান এ রকম সুর বদল করে বাণিজ্যিক সিনেমায় ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। এই বাণিজ্যধর্মিতার সঙ্গে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক আদর্শগত অবস্থানের টানাপড়েনই মূলত বাঙালির চেতনাদীপ্ত মনকে আহত করেছে। কিন্তু এ কথা সত্য যে, বাংলা গানকে সর্বভারতীয় করার ক্ষেত্রে গানটির মূল সুর কতটা ভূমিকা রাখত তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। কারণ ভিন্নভাষীদের কাছে গানের কথা বা কাব্যিক মর্ম যখন সুরের থেকে বেশি গুরুত্ব বহন করে না, সেই পরিস্থিতিতে মূলসুর কতটা চিত্তগ্রাহী করবে, অথবা এ আর রহমানের সুর সেই তুলনায় সার্থক হয়ে উঠতে পারে কিনা, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে সংগীতায়োজনে তেমন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ধরা পড়েনি। এ কারণেও সমালোচনা এসেছে সংগীতবোদ্ধাদের কাছ থেকে, তবে আমি মনে করি যেহেতু লোকসুরের আদলে করা, ফলে অতিরঞ্জিত বাদ্যের আয়োজন করেননি। তবে নজরুলের গানের বাংলা স্বরলিপি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বরলিপি নেই (যদিও ২০১০ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমি নোটেশন করেছিলাম, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গণসংগীত গ্রন্থে তা সংকলিত আছে।) বাংলা স্বরলিপি দিয়ে তো আর নন-বাঙালি সংগীতকারদের সঠিক সুরে সংগীত আয়োজনে বাধ্য করা চলে না বা বাংলাদেশের নজরুল সংগীতের স্বরলিপি সম্পর্কে ভারতীয় বাঙালিরা কতটুকু জ্ঞাত তা নিয়েও সংশয় আছে। বাংলাদেশের অনেক উদ্দীপিত তরুণ এই গান করেছে, সেখানেও গিরিন চক্রবর্তীর গাওয়া সুরের হুবহু রূপ থেকে অনেকটা সরে যেতে দেখা গেছে। অন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, যেমন ফুয়াদের বানানো এস ডি বর্মণের ‘নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক’ গানটি। বাণিজ্যিক পৃথিবীকে গ্রহণ করতে হলে বা পুঁজিবাদী পণ্যচরিত্রে মিশে যেতে চাইলে এই বিসর্জন দিতেই হবে। তবে এই কঠিন বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার যাথার্থ্য ঠিক রাখতে হলে একাডেমিক প্রক্রিয়াকে মানসম্মত করতে হবে। এখনো তিনশ/চারশ বছর আগের পশ্চিমা সংগীত শোনা যায় অকৃত্রিমরূপে। সেই মনটিভেরডি, বাখ, শোবার্ট প্রমুখের সংগীত কর্মগুলোর কোনো পরিবর্তন হয় না। প্রতিবাদ, নিন্দা কিংবা স্মারকলিপির অনুশীলনের মধ্যে না থেকে বরং প্রয়োজন সঠিক নিয়মের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। বাংলাদেশে নজরুল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন ধরে স্বরলিপি প্রণয়নের কাজ চলছে, এই বইয়ের ওপরে লেখা রয়েছে ‘নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি’। কিন্তু নজরুল ইসলামের গীতের সুরকার যিনি তার সুরই তো স্বরলিপিকার করেছেন। অথচ সেই তথ্য প্রচ্ছদের শিরোনামে নেই। এতে করে সর্বসাধারণের কাছে মনে হবে সুরগুলো হয়তো নজরুলেরই। এ ছাড়া স্বরলিপিতে লয় বা প্রিলিউড-ইন্টারলিউড অংশের স্বরলিপি দেওয়া নেই বা কোনো নির্দেশনাও নেই, ফলে গানগুলো পূর্র্ণাঙ্গ রূপকে ধারণ করতে পারেনি। বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পদ অফুরন্ত। কিন্তু তার মূল্য নির্ধারণে গুণমান নিয়ন্ত্রণ না করলে বুনো ফল ভেবে যে যার মতো ছিঁড়ে নেবে। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত