যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন দেশটির নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ক্যামেরন ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়েছিলেন তিনি। এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ক্যামেরন বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে আমাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আমি তা সানন্দে গ্রহণ করেছি।
ক্যামেরন এমন সময়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন, যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। সম্প্রতি লন্ডনে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বড় ধরনের মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। এর পাল্টা সমাবেশও হচ্ছে। এমনই এক সময় দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে সুয়েলা ব্রেভারম্যানকে সরিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের প্রতি বাড়তি সহানুভূতি দেখিয়েছে বলে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ব্রেভারম্যান। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটসহ নানা ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। বিশ্বজুড়ে বড় এই পরিবর্তনের সময়ে মিত্রদের পাশে দাঁড়ানো, অংশীদারত্ব শক্তিশালী করা এবং আমাদের মতামতগুলো সবার কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা আমাদের দেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’
ক্যামেরন এমন সময়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন, যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোয় ক্ষোভ বাড়ছে। প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকটে ক্যামেরন যুক্তরাজ্যের স্বার্থ কতটা অক্ষুন্ন রাখতে পারবেন? সৌদি আরবের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তার রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর আগে ক্যামেরন গাজা উপত্যকাকে একটি বন্দিশিবির বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ‘দ্বিরাষ্ট্র’ সমাধানের পক্ষে কথা বলেছেন। যদিও ক্যামেরন একজন ইসরায়েলপন্থি, এতে সন্দেহ নেই। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল ভূখণ্ডে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস। এর দুদিন পরেই অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। তখন ইসরায়েলের পক্ষে নিজের সমর্থন জানিয়েছিলেন ক্যামেরন। ২০১৪ সালেও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনী। ওই সময় হামলা বন্ধের লক্ষ্যে জোটসঙ্গীরা ইসরায়েলকে অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স পুনর্মূল্যায়ন করতে সরকারকে চাপ দেয়। ক্যামেরনের নেতৃত্বে থাকা কনজারভেটিভ পার্টি তা প্রত্যাখ্যান করে। যুক্তরাজ্য সরকার ইসরায়েলকে অবিচল সমর্থন জোগালেও লন্ডনের রাজপথে ফিলিস্তিনপন্থিদের মিছিলে জনসমাগম ক্রমেই বাড়ছে। সেই তুলনায় ইসরায়েলপন্থিদের সমাবেশে ভিড় বেশ কম। এর জের ধরে মন্তব্য করেই সমালোচনা, তর্কবিতর্কের মুখেই সুয়েলাকে সরে যেতে হয় আর এর পরপরই ঋষি সুনাক সরকারে যুক্ত হন ক্যামেরন। ক্যামেরনের প্রশাসনে ফেরার বিষয়ে লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বেন হুইথাম বলেন, এটা নিশ্চিত যে চলমান সংঘাতে ক্যামেরন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে থাকবেন না। তবে তার কথায় আরও সমঝোতামূলক সুর আশা করা হয়েছিল। বেন হুইথাম আরও বলেন, কনজারভেটিভ দলের অন্য জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের মতো তিনিও ইসরায়েলের আত্মরক্ষা এবং গাজায় ব্যাপক হামলা চালানোর অধিকারের পক্ষে রয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে ক্যামেরনকে প্রশাসনে যুক্ত করার উদ্দেশ্য হলো, কনজারভেটিভ পার্টিতে বিদ্যমান বিভাজন কমিয়ে আনা। সৌদি আরবের বর্তমান শাসক পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে ক্যামেরনের। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ক্যামেরনের কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বেশ পোক্ত-এমনটা জানিয়েছেন বেন হুইথাম। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ক্যামেরন ইসরায়েলের সমালোচনা করেছিলেন। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে দেশটির বসতি স্থাপনকে বেআইনি বলেছিলেন। ২০১০ সালে তুরস্কে সফরে যান ক্যামেরন। তখন বলেন, গাজা কখনোই একটি বন্দিশিবির হতে পারে না। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা দেখা গেছে। ওই ঘটনার পর ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ এক নিবন্ধে ক্যামেরনকে ইসরায়েলের প্রতি সবচেয়ে সহানুভূতিশীল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে। নিবন্ধে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ক্যামেরনের চিন্তাভাবনা অনেকটা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো। নেতানিয়াহু ২০০৯ সাল থেকে ইসরায়েলে ক্ষমতায় আছেন। তার নেতৃত্বে গাজায় নির্বিচার হামলা ও প্রাণহানি চলছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক চাপ একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। এর আগে ২০১৪ সালের আগস্টে ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার ২৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। গাজার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের অবস্থানের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন ক্যামেরন সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী সাঈদা ওয়ারসি। তিনি যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মন্ত্রী ছিলেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ক্যামেরনের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে ২০১৯ সালে ‘দাভোস ইন দ্য ডেজার্ট’ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে দেশটি সফর করেছিলেন তিনি। এ সময় ক্যামেরনের সঙ্গে ছিলেন ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জেরার্ড কুশনার প্রমুখ।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক তার রাজনৈতিক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা বলেন, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম একটি স্তম্ভ মধ্যপ্রাচ্য। ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের মতো ইউরোপের বাইরের একটি বিদেশি কৌশলগত মিত্র লন্ডনের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা যুক্তরাজ্যের কাছে সবকিছুর ওপরে। এ কাজে ক্যামেরন একজন যোগ্য ব্যক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যও হামাসের মতো মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন বিবেচনা করে। ক্যামেরন এসব সংগঠনকে দমাতে যুক্তরাজ্যের সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষে ছিলেন। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বড় অংশজুড়ে ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যপূরণে নেমেছিল আইএস। তখন ক্যামেরন বলেছিলেন, আইএসের লক্ষ্য পূরণ হলে ভূমধ্যসাগরের পশ্চিম তীরে একটি ‘উগ্রবাদী’ রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ইরাক ও সিরিয়ায় বোমা হামলা জোরালো করতে ক্যামেরনের সরকার অনুমোদন দিয়েছিল। ব্রেক্সিট ভোটের পর ২০১৬ সালে পদত্যাগ করেন ক্যামেরন। এরপর তার মধ্যপ্রাচ্য নীতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব নীতি অঞ্চলটির সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব রেখেছে।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ২০১১ সালে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। ওই সময় ক্যামেরন যুক্তি দেখান যে এর মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসক গাদ্দাফির হাত থেকে দেশটির সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা হবে। পরবর্তী সময় যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিটি এই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে জানায়, ক্যামেরনের এই নীতি সঠিক ছিল না। ক্যামেরন দেখিয়েছেন যে তিনি এই অঞ্চলে সামরিক হস্তক্ষেপে বেশ আগ্রহী। যা-ই হোক এখন গাজা ও হামাস ইস্যুতে ইসরায়েলের সঙ্গে সুর মেলাতে পারেন ক্যামেরন।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক