বিতর্ক এবং অনিয়মের অভিযোগ ঝেড়ে ফেলে পুলিশ পদককে পরিশুদ্ধ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অভিযোগ যাতে না ওঠে সেজন্য নতুন করে তৈরি হচ্ছে তালিকা। এতে বিতর্কিতদের নাম না রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ‘বিতর্কের জেরে’ দুই মাস আগে পুলিশ সপ্তাহে আকস্মিকভাবে মেডেল প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়। তবে সব ঠিক থাকলে শিগগিরই সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী পদক প্রদান করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির দেশে আসার পর পদকের সংশোধিত তালিকাটি যাচাই-বাছাই শেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে পুলিশ সদর দপ্তর। ২০ থেকে ২৫ জুলাইয়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া শেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা দেখা করবেন। এরপর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা আগামী মাসের যেকোনো দিন পদক বিতরণ অনুষ্ঠানটি করতে চাচ্ছে পুলিশ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স অডিটরিয়াম বা শিরুমিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো কারণে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে থাকতে না পারলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুরস্কৃত কর্মকর্তাদের পদক ব্যাজ পরিয়ে দেবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবারের তালিকায় কোনো সিন্ডিকেট সদস্য থাকবেন না। পদক কমিটি তালিকার কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। বিতর্ক ওঠায় এ বছরের পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধনের আগের রাতে নজিরবিহীনভাবে সরকার পুলিশ পদক বিতরণ স্থগিত করে। ওই তালিকায় ১০৯ জনের নাম ছিল। সংশোধিত তালিকায় অসীম সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ ও ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১০৫ জনের নাম থাকতে পারে। আবার এর চেয়েও কিছুটা কমতে পারে। আইজিপি দেশে আসার পর অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তালিকাটি পাঠানো হবে। পরে মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করবে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পদকব্যাজ অনুষ্ঠানটি করার চেষ্টা করছি।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ মে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে চার দিনব্যাপী পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধন করেন। ওই দিনই পুলিশের বিভিন্ন পদবির কর্মকর্তা ও সদস্যদের ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’, ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’ এবং ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’ পদক দেওয়ার কথা ছিল। তবে একেবারের শেষ মুহূর্তে এই অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।
পুলিশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, বাংলাদেশ পুলিশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও কাক্সিক্ষত স্বীকৃতি পদক হলো বিপিএম এবং পিপিএম। পুলিশের পদক বাহিনীর সদস্যদের জন্য সাহসিকতা ও সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের স্বীকৃতি। বিতর্কিত বা কলঙ্কিত কেউ যেন এই পদক পেয়ে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে না পারে, সে ব্যাপারে এবার শূন্য সহনশীলতার নীতি নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেকে তদবির ও রাজনৈতিক কানেকশনের সুযোগে এই পদক পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই দৃশ্য দেখা গেছে। ভালো কাজ করা অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও মাঠ পর্যায়ের সদস্য আবেদন করেও পদক পেতে ব্যর্থ হন। এবারের পুলিশ সপ্তাহেও একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। তদবির করতে না পারায় যোগ্য অনেকের নাম তালিকায় জায়গা পেতে ব্যর্থ হয়। অভিযোগ ওঠে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও আগের মতোই সবকিছু চলছে। তালিকায় থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ও পদকপ্রাপ্ত বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের গোচরীভূত হলে পদক প্রদান অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর তখন জানায়, তালিকাটি যাচাই-বাছাই করে পরে পদক বিতরণ করা হবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তালিকাটি পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে নাম চূড়ান্ত করে। প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পদক প্রদান করবেন বলে বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা আশা করছেন। তারা মনে করছেন, সরকারপ্রধান উপস্থিত থেকে পদক বিতরণ করলে পুলিশ সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। সাম্প্রতিক সময়ে নানা সংকটে পুলিশের যে ক্ষতি হয়েছে তা এই আয়োজনের মাধ্যমে অনেকটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, আগের তালিকার কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে ইতিমধ্যে পদক পেয়েছেন। তারা হলেন, ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. সরওয়ার, ডিএমপির ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম, সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি, র্যাব ১২-এর অ্যাডিশনাল ডিআইজি আতিকুর রহমান মিয়া, ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এলআইসি) মো. আতিকুজ্জামান, ডিএমপির গোয়েন্দা-গুলশান বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. জেহাদ হোসেন, ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের এসআই গোলাম মূর্তজা, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানার এসআই মো. রফিক, ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের কনস্টেবল মো. রিমন হোসেনসহ আরও কয়েকজন। সংশোধিত তালিকায় তাদের মধ্যে কয়েকজনের বাদ পড়ার কথা রয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতীতে পুলিশের মেধা ও ত্যাগের চেয়ে আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের ওপর ভরসার জায়গাটি নড়বড়ে হয়ে যায়। এবার সত্যি সত্যি বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে প্রকৃত বীরত্ব দেখানো কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা গেলে সেটি হবে পুলিশ সংস্কারের প্রথম এবং দৃশ্যমান বড় পদক্ষেপ।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যেও দিনরাত কাজ করেছি। অনেক ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটন করেছি। একটা মামলার সঙ্গে আটটি খুনের রহস্যও উদঘাটন করেছি। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। পিপিএম পদকের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু চোখের সামনে অনেকেই রাজনৈতিক তদবিরে বিপিএম ও পিপিএম পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। তদবির করার লোক না থাকায় আমিসহ টিমের কোনো সদস্যই পদকের জন্য বিবেচিত হইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার পদকের তালিকায় যাদের নাম ছিল তাদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের আস্থাভাজন ছিলেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাদের কেউ জেলা কোটায়, আবার কেউ বিএনপি পরিবারের সদস্য কোটায় দাপটের সঙ্গে বহাল তবিয়তে আছেন।’
ডিএমপির একটি থানার ওসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার থানাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন করেছি। গ্রেপ্তার করেছি অনেককে। আমার থানায় অনেকেই সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু কাউকে পদক দেওয়া হয়নি।’ চট্টগ্রাম রেঞ্জের একটি আলোচিত ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আলোচিত ওই মামলার তদন্ত করে সফল হলেও পদকের জন্য বিবেচিত হইনি। তবে শুনেছি নতুন তালিকায় আমার নাম এসেছে। দেখি সামনে কী হয়!’