নির্বাচন, তাই আটকে আছে সাগরে ও পাহাড়ে জ্বালানি অনুসন্ধান। তবে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে সরকারের চুক্তি হচ্ছে একের পর এক।
গত নভেম্বরে সরকার নতুন করে এলএনজি আমদানি, আমদানিকৃত এলএনজি রূপান্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পৃথক তিনটি চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে।
চলতি মাসে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মহেশখালীতে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের খসড়া চুক্তি অনুমোদন করেছে যেটির কাজ পেয়েছে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ। দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য গত ৯ আগস্ট সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তির যে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটির নির্বাচনের আগেই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি ওমান ও কাতার থেকে আরও এলএনজি আমদানির পৃথক দুটি চুক্তিও হয়েছে। তবে গত সেপ্টেম্বরে সাগরে অনুসন্ধান কাজের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে নির্বাচনের কথা বলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান কার্যক্রম পিছিয়ে রেখে এলএনজি আমদানির নতুন চুক্তি দেশকে আরও আমদানিনির্ভর করবে এবং ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। জ্বালানি খাতে আরও বড় সংকট তৈরি হবে।
২০১৪ সালে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি হলেও বঙ্গোপসাগরে এখনো কোনো অনুসন্ধান শুরু করতে পারেনি বাংলাদেশ। অথচ ভারত ও মিয়ানমার তাদের ব্লক থেকে গ্যাস তুলতে শুরু করেছে। অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর কম দেওয়ায় দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি এ সংকট প্রকট হয়েছে। দৈনিক প্রায় ৪৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০০ থেকে ২৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের অংশে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য হাইড্রোকার্বনের বিশাল মজুদের সম্ভাবনার পরও অলাভজনকতার কথা বলে বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করেও চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অনুসন্ধানে গতি আনতে গত ২৬ জুলাই উৎপাদন ও বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) অনুমোদন করেছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অনুমোদনের পর জ্বালানি ও খনিজ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছিলেন, ‘অফশোর হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধানের জন্য এক মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।’
জ্বালানি বিভাগ আশা করেছিল, চলতি বছরের মধ্যেই বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে। সেজন্য তৎপরতাও ছিল। কিন্তু নির্বাচনের কারণে সব প্রক্রিয়া থমকে আছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন নির্বাচনের সময়। দৈনন্দিন কাজ ছাড়া এখন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। নির্বাচনের পর আবার কাজ শুরু হবে।’
গত ১৬ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদকে এক চিঠিতে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে অন্তত ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানি এক্সন মোবিল। নভেম্বরেই দ্বিমাত্রিক জরিপ শুরু করার আগ্রহ ছিল প্রতিষ্ঠানটির। প্রক্রিয়াটি সফল হলে বাংলাদেশের প্রতি বছর ৩ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু সবকিছু থমকে আছে নির্বাচনের কারণে।
বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি পাহাড়ে অনুসন্ধানের জন্য বাপেক্সের সঙ্গে যৌথ কোম্পানি গঠন করতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আগ্রহপত্র চাওয়ার পর বেশ কয়েকটি কোম্পানি আগ্রহপত্র (ইওআই) জমা দেয়। যাচাই শেষে সাতটি কোম্পানির সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরির পর রাশিয়ার গাজপ্রম, ভারতের ওএনজিসি এবং চীনের একটি কোম্পানিকে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এ প্রক্রিয়াও আপাতত বন্ধ।
গত সেপ্টেম্বরে সাগরে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়া থেমে গেলেও গত মাসের শুরুর দিকে এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া কক্সবাজারের মশেখালীতে বর্তমানে এক্সিলারেটের যে ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে, তার ধারণক্ষমতা বাড়ানোর একটি চুক্তি হয়েছে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের টার্মশিট চুক্তি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিটির সঙ্গে।
গত ৬ ডিসেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় মহেশখালীতে দেশের তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের খসড়া চুক্তি অনুমোদন করা হয়েছে। কাজটি পেয়েছে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সামিট অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি লিমিটেড (এসওএসসিএল)। চুক্তি অনুযায়ী, টার্মিনাল চালুর পর ১৫ বছর মেয়াদে দৈনিক ৩ লাখ ডলার রিগ্যাসিফিকেশন (গ্যাসে রূপান্তর) চার্জ পাবে সামিট।
এক হিসেবে দেখা গেছে, দৈনিক ৩ লাখ ডলার হিসাবে (কর ও মূসক বাদে) রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ বাবদ সামিটের মোট আয় হবে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। চুক্তি অনুযায়ী সামিটকে এ অর্থ ডলারে দেবে সরকার। মুদ্রাটির বিনিময় হার বাড়লে সরকারের ব্যয়ও বাড়বে। আর ডলার সংকট হলে নতুন জটিলতা তৈরি হবে।
টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তির আগে গত ৯ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২৬ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৫ লাখ টন করে ১৫ বছর ধরে এলএনজি সরবরাহ করবে তারা। চুক্তির বিষয়টি নির্বাচনের আগেই চূড়ান্ত করার কথা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, এলএনজি সরবরাহ নিয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে আলোচনা চলছে। নির্বাচনের আগেই চুক্তি সই হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
২০১৮ সাল থেকে সরকার এলএনজি আমদানি শুরু করেছে। বর্তমানে ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ওকিউটি বাংলাদেশে ১ থেকে ১.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করছে। আরও ১ মিলিয়ন টন এলএনজি আনতে গত জুনে ওকিউটির সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছে পেট্রোবাংলা। প্রাথমিকভাবে ১০ বছরের চুক্তি। ২০২৬ সালে তারা এলএনজি সরবরাহ শুরু করবে।
এর আগে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, সেটিরও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরেকটি চুক্তি করা হয়েছে, কাতারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাস লাফান লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে। চুক্তির আওতায় ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য বছরে অতিরিক্ত ১৫ লাখ টন এলএনজি আমদানি করবে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে সই করা চুক্তির আওতায় ২০১৮ সাল থেকে বছরে ১.৮২ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করছে কাতারের ওই কোম্পানি।
ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা চরম নেতিবাচক একটা বিষয়। সাগরে ও পাহাড়ে তেল-গ্যাসের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে অনুসন্ধান পিছিয়ে যাচ্ছে। অথচ এলএনজি আমদানির কার্যক্রম তড়িৎ গতিতে চলে। আমার মনে হয় অনুসন্ধানে উৎসাহ কম। এর কারণ হতে পারে অনুসন্ধানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী লাভবান হয় না। কিন্তু আমদানি করলে তাদের লাভ। এ ছাড়া তো অনুসন্ধানে অবহেলার কোনো কারণ দেখি না। আমাদের দেশে খুবই সামান্য পরিমাণে যতটুকু অনুসন্ধান কার্যক্রম চলে তাতে অনেক সফলতা আছে। আমাদের দেশে তেল-গ্যাসের ভালো মজুদ আছে।’
নানা অজুহাতে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে উল্লেখ করে এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘যে যুক্তিতে সাগর ও পাহাড়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই একই কারণে এলএনজি আমদানির কার্যক্রমও পিছিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। আসলে দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে অন্য স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’