১৬-তে পা রেখেছে কোক স্টুডিও। ২০০৭ সালে ব্রাজিলে শুরু হয় এই বিশেষ আয়োজন। মূলত ফিউশনই এর প্রাণ। পরের বছর কোকা-কোলার তখনকার বিপণন প্রধান নাদিম জামান পাকিস্তানে এই ভার্সন শিফট করার চিন্তা করেন। তিনি যোগাযোগ করেন পাকিস্তানি সুপার গ্রুপ ভাইটাল সাইনের কি-বোর্ডিস্ট, কম্পোজার ও রেকর্ড প্রোডিউসার রোহাইল হায়াতের সঙ্গে। আর এ জুটির হাত ধরেই উপমহাদেশে পা রাখে কোক স্টুডিও। ২০০৮ সালের জুনে প্রথম সেশনের প্রচারের মাধ্যমে এ উপমহাদেশে চর্চা শুরু হয় কোক ফিউশনের।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আসে কোক স্টুডিও। সে বছরই একটা সিজন গেছে। আর এর দ্বিতীয় সিজনটি যাচ্ছে এ বছর-২০২৩ সালে। এ বছরের ভালোবাসা দিবসে অবমুক্ত হয় নতুন সিজনের প্রথম গান ‘মুড়ির টিন’। দারুণ সাড়া ফেলে গানটি। তিন বিভাগের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে করা এই গানটি মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।
এরপর এসেছে শিবু কুমার শীল ও মেঘদলের সমন্বিত উদ্যোগ ‘বনবিবি’। গানটি প্রযোজনা ও সংগীত আয়োজন করে ব্যান্ড মেঘদল। গীত রচনায় ছিলেন শিবু ও মেঘদল-সুপ্রিমো মেজবাউর রহমান সুমন। এর সঙ্গে ছিল খনার বচন এবং আরও ছিল ঘাসফড়িং কয়্যার। এই গানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য- এর স্টেজটি তৈরি করা হয়েছিল এস এম সুলতানের একটি পেইন্টিং অবলম্বনে। গানটিতে একটু ঝুঁকি নিয়েছিল মেঘদল, এবং তারা তাতে সফলও হয়।
‘বনবিবি’ প্রকাশের ১৫ দিনের মাথায় কোক স্টুডিও অবমুক্ত করে তাদের নতুন গান ‘নাহুবো’। ফের আলোচনায় আসেন অনিমেশ রায়। এই গানের র্যাপ অংশটি করেন ডটার অব কোস্টাল। তবে কেন যেন কোকে করা অনিমেশের প্রথম গানটির মতো এটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। অনেকে এর জন্য এই গানের প্রচণ্ড নয়েজকেই দুষেছেন। তবে গানটি একটা আলাদা ধারা তৈরি করতে পেরেছে বলে অনেকেই মনে করেন।
এরপর এলো এ বছরে কোক স্টুডিওর সবচেয়ে শ্রতিমধুর গান ‘দাঁড়ালে দুয়ারে’। অনন্য এই নজরুলগীতিকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেন নন্দিতা ও ঈষাণ। আর এর চমৎকার সংগীত আয়োজন করেন শুভেন্দু দাশ শুভ, সঙ্গে ছিলেন শায়ান চৌধুরী অর্ণব। এ গান নিয়ে খুব বেশি কিছু বলার নেই তবে এটুকু অনেকেই বলেন- গানটির মিষ্টি সংগীত মানুষের গানে লেগে থাকবে বহুকাল।
‘দেওরা’ এলো এর পর। করিমগঞ্জ এক্সপ্রেস ইসলাম উদ্দিন পালাকার যেন বিস্ফোরিত হলেন এই গানে। দুর্দান্ত ইনট্রো দিলেন প্রীতম হাসান, সঙ্গে ছিল ঘাসফড়িং কয়্যার। গানটির লেখা ও সংগীত প্রীতমের, সঙ্গে ছিলেন ফজলু মাঝি। গানটি কোক স্টুডিওর অন্যতম আলোচিত গান হিসেবে ধরা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি শ্রোতা গানটি শুনেছেন বলে মনে করা হয়।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের লেখা ও সুর করা গান ‘নদীর কূল নাই’ নিয়ে আসে কোক স্টুডিও। শায়ান চৌধুরী অর্ণবের অসাধারণ সংগীত আয়োজনে গানটি গেয়ে শোনান রিপন কুমার সুরকার। গানটি শোনার সময় আপনার মনে হবে- আপনি গানটি নদীর কূলে বসেই শুনছেন। অসাধারণ এই গানটি সবচেয়ে বেশি শ্রোতা-প্রশংসিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
১০ জুন ঘটল আরেক বিস্ফোরণ। ‘কথা কইও না’ শিরোনামে জনপ্রকাশ্যে আসা গানটি শ্রোতামহলে আলোড়ন তুলল। বাউলমাতা আলেয়া বেগম আর শিবলুর গাওয়া গানটি কোক স্টুডিওর এ বছরের অন্যতম ম্যাসিভ হিট। ‘দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইও না’ গানটির গীতিকার ‘সাদা সাদা কালা কালা’ খ্যাত হাশিম আহমেদ। সুর ও সংগীত আয়োজন করেন সেই একই ব্যক্তি- ইমন চৌধুরী। এই গানের একটি অংশ ‘বারো মাসে বারো ফুল’ ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে নেওয়া। গানটির অসাধারণ সংগীত আয়োজন মানুষের মনে থাকবে বহুদিন।
এরপর একে একে দিওয়ানা, সন্ধ্যাতারা, ঘুম ঘুম, আনন্দধারা ও দিলারাম গানগুলো প্রকাশিত হলেও সেগুলো খুব একটা শ্রোতানন্দিত হয়নি। এর জন্য অনেকেই ‘দেওরা’ ও ‘কথা কইও না’ গান দুটিকে দায়ী করেন। তাদের ভাষ্য- বছরব্যাপী এই দুটি গানের সাফল্যের ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে কোক স্টুডিওর অন্য গানগুলো। তবে যাই হোক- বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল কোক স্টুডিও, আলোচনায় ছিলেন এর শিল্পীরা। আলোচনায় ছিল এর স্টেজ এবং মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। সেই সঙ্গে সামান্য যা সমালোচনা তা এই আলোচনার থাকার আড়ালে ম্লান হয়ে যায়।
