আকামায় সর্বস্বান্ত শ্রমিকরা, বাড়তি অর্থ নিচ্ছে দালালরা

  • প্রতি বছর নবায়ন করতে গুনতে হচ্ছে ৮ লাখ টাকা
  • কোম্পানির করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা হয় না
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ১২:০৭ পিএম

বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। সেখানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন। অল্পসংখ্যক শ্রমিক ভালো থাকলেও বেশির ভাগ শ্রমিকই আছেন মহা সমস্যায়। দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকে চাকরিও পাচ্ছেন না। তা ছাড়া আকামার কারণে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন শ্রমিকরা। প্রতি বছরই আকামা নবায়ন করতে একেকজন শ্রমিককে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার দালাল চক্রও আকামার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে বাড়তি অর্থ। এ নিয়ে শ্রমিকরা দূতাবাসের প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছেন।

সম্প্রতি সৌদি আরবের জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় সরেজমিনে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। 

দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, শ্রমিকদের যেকোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। আকামার অর্থ আরও কমানো যায় কি না, সে জন্য চেষ্টা করেও সফল হচ্ছেন না তারা। তবে বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সরকার আলোচনা চালাচ্ছে।

বিদেশি শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবে রেসিডেন্স পারমিট কার্ডই আরবিতে আকামা হিসেবে পরিচিত। আকামায় নাম, জন্মতারিখ, মেয়াদকাল, রক্তের গ্রুপ এবং নিয়োগদাতার নাম-ঠিকানা লেখা থাকে; যা ব্যাংকসহ অন্যান্য কাজে আকামার ব্যবহার অপরিহার্য।

সৌদি আরবে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে জানান, রিয়াদ, দাম্মাম, মক্কা, মদিনাসহ আরও কয়েকটি স্থানে অন্তত ৩০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগের অবস্থা খারাপ। অনেকে আবার না খেয়েও দিন পার করছেন। নিয়োগদাতা কোম্পানির লোকজন বেশিরভাগ শ্রমিকের সঙ্গেই প্রতারণা করে আসছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের দালালরাও ওই দেশে সক্রিয় আছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠায় হয়রানি বেশি হচ্ছে।

হেরেম শরিফে কাজ করেন কুমিল্লার বাসিন্দা বশির আহমেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে এসেছি এক বছর আগে। বেতন মাত্র ৫০০ রিয়াল, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬ হাজার টাকা। ওমরাহ করতে আসা হাজিরা মাঝেমধ্যে খুশি হয়ে কিছু টাকা দেন। এই বেতনে চলছে না।’

তিনি বলেন, এ দেশে আসার পর আদম ব্যাপারী বলেছিল, মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি দেওয়া হবে। কিন্তু আসার পর দেখা গেছে বেতন অনেক কম। তা ছাড়া বছর শেষ না হতেই আকামার বিষয়টি সামনে চলে আসছে। প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করে আকামা করতে হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে আকামা না করলে সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী আমাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।’

বশির আক্ষেপ করে বলেন, ‘আকামার টাকা কমানোর জন্য আমাদের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কোনো গরজ নেই। তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলতে পারি না। আকামার বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সরকার যদি সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে তাহলে শ্রমিকরা অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাবে। অনেকে দেশে ফেরত যাবে।’

একই কথা বলেছেন রাজশাহীর আফজাল হোসেন, ফেনীর রুহুল আমিন, কুষ্টিয়ার রহিম উদ্দিন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে এসেছেন। এখানে আসার পর কোনো ভালো কাজও পাওয়া যাচ্ছে না। যারাই আসছেন, তাদের নতুন করে আকামা করতে হচ্ছে। অথচ এই আকামা করার কথা কোম্পানিগুলোর। কিন্তু তারা তা করছে না।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সৌদি আরবের পরিস্থিতি এখন খুবই নাজুক দাবি করে তারা বলেন, হাজার হাজার শ্রমিক বিপদের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আকামা না করলে চাকরিও মিলছে না।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। কোনো শ্রমিক সমস্যায় থাকার বিষয়ে দূতাবাস জানতে পারলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কোনো শ্রমিক দূতাবাসে যাওয়ার পর কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ এলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দূতাবাসের অপর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আকামার বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। শ্রমিকরা আকামার অর্থ দিতে দিতে কাহিল হয়ে পড়েছে, তা সত্য। রাষ্ট্রদূত বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের সহায়তা ছাড়া আকামার টাকা কমানো যাবে না।’

আকামার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আকামা না করায় অনেক শ্রমিক কাজ পাচ্ছেন না বলে দূতাবাস তথ্য পাচ্ছে। সৌদি আরবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক বদল এসেছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় শ্রমিকরা বেকায়দায় আছেন। দূতাবাস চেষ্টা করছে, শ্রমিকরা যাতে ভালো থাকেন।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আকামা না থাকলে সৌদি আরবের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেকোনো সময় যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। ২০০৯ সাল থেকে সৌদিতে বাংলাদেশিদের জন্য আকামা বন্ধ ছিল। ওই সময় যাদের আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তারা বিপাকে পড়েন। পাঁচ বছর পর আকামা করার কাজ শুরু হয়। আকামার মেয়াদ আগে এক বছর থাকলেও পাঁচ বছর করা হয়। কিন্তু বছর চারেক আগে আকামা সংশোধন করে আবারও এক বছর অন্তর নবায়নের নিয়ম চালু করা হয়। অবশ্য শ্রমিকদেরই আকামা করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কোম্পানিকেও করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো কোম্পানি তা করছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত